Saturday, February 14, 2026

মেধা

 একজন সুলতান শুনলেন যে বাজারে এমন এক দাসী আছে, যার দাম শতজন দাসীর দামের চেয়েও বেশি।

তিনি তাকে ডেকে পাঠালেন, দেখতে চাইলেন—কী কারণে সে এত অসাধারণ।
দাসীটি তাঁর সামনে এমন এক মর্যাদা ও আত্মসম্মান নিয়ে দাঁড়াল, যা তিনি আগে কোনো দাসীর মধ্যে দেখেননি।
তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমার দাম এত বেশি কেন, তরুণী?”
সে উত্তর দিল,
“কারণ আমি আমার বুদ্ধিমত্তার জন্য আলাদা।”
কৌতূহলী হয়ে সুলতান বললেন,
“আমি তোমাকে একটি প্রশ্ন করব। যদি তুমি সঠিক উত্তর দিতে পারো, আমি তোমাকে মুক্ত করে দেব। আর যদি না পারো, তবে তোমাকে হত্যা করা হবে।”
তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
“সবচেয়ে সুন্দর পোশাক কোনটি, সবচেয়ে মনোরম সুগন্ধ কোনটি, সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার কোনটি, সবচেয়ে নরম বিছানা কোনটি, আর সবচেয়ে সুন্দর দেশ কোনটি?”
দাসীটি উপস্থিত লোকদের দিকে ফিরে বলল,
“আমার জিনিসপত্র আর আমার ঘোড়া প্রস্তুত করো—কারণ আমি এই প্রাসাদ ছাড়ছি একজন মুক্ত নারী হিসেবে।”
তারপর সে বলল—
“সবচেয়ে সুন্দর পোশাক হলো সেই গরিব মানুষের একমাত্র জামাটি, কারণ সেটিই তার কাছে শীত ও গ্রীষ্ম—উভয় ঋতুর জন্য উপযুক্ত।”
“সবচেয়ে মনোরম সুগন্ধ হলো মায়ের গন্ধ—তিনি যদি সাধারণ কোনো গণস্নানঘরে আগুন ফুঁকিয়ে কাজ করা নারীও হন তবুও।”
“সবচেয়ে সুস্বাদু খাবার হলো সেটি, যা ক্ষুধার সময় খাওয়া হয়—কারণ ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে বাসি রুটিও সুস্বাদু মনে হয়।”
“সবচেয়ে নরম বিছানা হলো সেটি, যেখানে তুমি শান্ত মন নিয়ে ঘুমাতে পারো। তুমি যদি অন্যায় করো, তবে সোনার বিছানাও তোমার কাছে কাঁটায় ভরা মনে হবে।”
সে দরজার দিকে এগোতে লাগল। তখন সুলতান তাকে ডাকলেন,
“তুমি এখনও আমার শেষ প্রশ্নের উত্তর দাওনি…”
সে ফিরে তাকিয়ে বলল,
“সবচেয়ে সুন্দর দেশ হলো সেই দেশ, যা স্বাধীন এবং অজ্ঞদের দ্বারা শাসিত নয়।”
সে সঠিক উত্তর দিয়েছিল, এবং এভাবেই সে তার স্বাধীনতা অর্জন করল।
হ্যাঁ, সে ঠিকই বলেছিল—সবচেয়ে সুন্দর দেশ হলো সেই দেশ, যা অজ্ঞদের দ্বারা শাসিত নয়।

মুমিনদের জন্যে এটা একটা লোভনীয় হাদিস!

 আল্লাহকে খুশি করার জন্যে নিজের চরিত্রকে শুধরানো অনেক জরুরি। এটা চিন্তা করেই কত ভালো লাগে যে, আমি যদি কোনোভাবে আমার চরিত্রটাকে সুন্দর করতে পারি, কিয়ামতের দিন আমার পাল্লা সবচেয়ে ভারী হবে! (আল্লাহ কবুল করুক! আমিন।) কিয়ামতের দিন দাঁড়িপাল্লায় সবচেয়ে ভারী হবে সুন্দর চরিত্র!" (তিরমিজী)।

.
চরিত্রকে কিভাবে সুন্দর করা যায় - এটার হয়তো বাঁধা-ধরা কোনো সিলেবাস নেই. রাসূল (সা:) কে নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে তাঁর চরিত্রের এমন কিছু দিক আমার সামনে এলো - যেটা নিয়ে সচরাচর আলোচনা শুনিনা।
.
যেমন, রসূল (সা:) কখনো উচ্চ স্বরে কথা বলতেন না, খুব অল্প শব্দে গভীর জ্ঞানপূর্ণ কথা বলতেন। তিনি সবসময় হাসি খুশি থাকতেন। কখনো বদমেজাজী হয়ে থাকতেন না! ছোট বাচ্চাদের কোলে নিয়ে নামাজ পড়তেন। তাঁর চরিত্রই হচ্ছে কুরআন।
.
আল্লাহর জন্যে নিজের ভিতরটাকে সুন্দর করার কিছু চর্চা এমন হতে পারে --
.
🔘 ১. সবসময় সবাইকে নিয়ে ভালো চিন্তা করা. উপযুক্ত প্রমান ছাড়া কাউকে খারাপ ভেবে না বসা. সাহাবীদের সময় একবার এক সাহাবী যখন দেখলেন আরেকজন সাহাবীর দাড়ি থেকে মদের ফোঁটা বেয়ে বেয়ে পড়ছে, সে তাকে প্রথমেই দোষ না দিয়ে ভাবলেন, হয়তো তার সাথে কারো ঝগড়া হয়েছে, এর ফলে রাগ করে কেউ তার দিকে মদের গ্লাস ছুড়ে মেরেছে। সেখান থেকেই ফোঁটা বেয়ে বেয়ে পড়ছে।
.
🔘 ২. নিয়তেই বরকত! প্রতিনিয়ত নিজের নিয়তকে চেক করা. আমি এই কাজটা কেন করছি? কাকে খুশি করার জন্যে করছি? কেউ যদি সত্যি কোনো কাজ আন্তরিক ভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে করে - তাহলে সেই কাজে খুব উঁচু মানের কোয়ালিটি থাকবে! একটা সিম্পল নিয়ত করলে যে কোনো কাজ বরকতপূর্ণ হয়ে যায়।
.
যেমন কেউ যদি ঘুমানোর আগে এই নিয়ত করে ঘুমায় যে, "হে আল্লাহ! আমি এই ঘুমের মাধ্যমে যে কর্মশক্তি আর তেজ পাবো, সেটা দিয়ে যেন ঘুম থেকে উঠে যেন আরো ভালোভাবে তোমার ইবাদাত করতে পারি।" তাহলে পুরা ঘুমটাই তার জন্যে ইবাদাত হবে এবং সে যতটা সময় ঘুমাযে তার জন্যে নেকী পেতে থাকবে! সুবহানাল্লাহ ঘুমানোর জন্যেও পুরস্কার!
.
🔘 ৩. অপ্রয়োজনীয় কথা-আলাপে মশগুল না হওয়া। কেউ কথা বলার সময় তাকে কথার মাঝে cut-off না করা (বিঘ্ন না ঘটানো)! শেইখ বলেন, "কেউ কথা বলতে থাকলে কখনো তাকে মাঝখানে কাট করে দিয়ে নিজের কথা বলা শুরু করে দিও না. কারণ, যে কথা বলছে সে যদি জ্ঞানী হয়, তাকে শুনতে থাকো, তোমার জ্ঞান বাড়বে!
.
আর যে কথা বলছে, সে যদি মূর্খ হয় তাকে শুনতে থাকো - তোমার ধৈর্য্য বাড়বে! নিশ্চয়ই তোমার ধৈর্য্য অর্জন করা জ্ঞান অর্জন করার থেকে বেশি জরুরি!"
.
🔘 ৪. নিজের সমালোচনা শুনলে ক্ষুব্ধ না হওয়া! আসলেই চিন্তা করে দেখা - আমার মাঝে কি আসলেই এই ভুল আছে? ইমাম শাফি'ই (রা:) একবার ভরা সমাবেশে ক্লাস করাচ্ছিলেন। তখন এক লোক হুড়মুড় করে তার ক্লাসে ঢুকে গেলেন।
.
তার দিকে আঙ্গুল তুলে বললেন, "তুমি কি ইমাম শাফি'ই?". ইমাম বললেন, "জ্বী, আমি শাফি'." তখন লোকটি সবার সামনে চেঁচিয়ে ইমামকে বললেন, "তুমি একটা ফাসিক, কাফির এবং জঘন্য প্রকৃতির লোক!"
.
ইমাম চুপ করে শুনলেন। শুধু সমালোচনা না, তাকে সবার সামনে খুব খারাপ ভাবে অপমান করা হয়েছে! তিনি অফেন্ডেড তো হলেনই না, বরং এর উত্তরে তৎক্ষনাৎ দুই হাত তুলে সবার সামনে দুআ করলেন,
.
"হে আল্লাহ! এই ব্যক্তি যদি সত্য বলে থাকেন, তাহলে তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও, আমার উপর দয়া করো এবং আমার তাওবা কবুল করে নাও! আর যদি এই ব্যক্তি যা বললেন, সেটা যদি সত্য না হয়, তাহলে তার এ আচরণের জন্যে তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও, তার উপর দয়া করো এবং তার তাওবা কবুল করে নাও!"
.
🔘 ৫. প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাবার আগে সবাইকে মাফ করে দিয়ে অন্তর পরিষ্কার করে ঘুমানো
.
🔘 ৬. কোনো ব্যাপারে অন্তরে অহংকার ঢুকে যাচ্ছে কি না চেক করা. যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমান অহংকার থাকবে, সে জান্নাতের ঘ্রাণ-ও পাবে না (সহীহ হাদিস)
.
🔘 ৭. যদি কারো উপর হিংসা হতে থাকে, সেই ব্যক্তির নাম ধরে তার সাফল্যের জন্যে বেশি বেশি দুয়া করা. এটাকে অনেক স্কলার হিংসার সর্বোত্তম চিকিৎসা বলেছেন। একটা উদাহরণ দেই, ধরেন ক্লাসে আব্দুল্লাহ অনেক ভালো রেজাল্ট করলো, এতে উমরের হিংসা হচ্ছে। উমর কন্ট্রোল করতে পারছে না।
.
তার মনে এটা নিয়ে কষ্ট লেগেই আছে যে, তার বন্ধু তার থেকে এতো ভালো অবস্থানে আছে, অথচ সেও তো অনেক পরিশ্রম করে যাচ্ছে, তার কেন উন্নতি হচ্ছে না? উমর সেই দিন থেকে বেশি বেশি আব্দুল্লাহর জন্যে দুয়া করতে থাকলো, আল্লাহ যেন আব্দুল্লাহকে আরো বেশি সাফল্য দেন, রহমত এবং বরকত দেন!
.
আলহামদুলিল্লাহ দুয়া করতে করতে কয় মাসের মধ্যেই উমরের অন্তর থেকে হিংসা দূর হয়ে গেলো। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা উমর এবং আব্দুল্লাহ দুইজনকেই সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে অনেক ভালো অবস্থানে যাবার তাওফিক দিলেন।
.
🔘 ৮. নিজের ভুল/গুনাহ -র একটা লিস্ট বানানো। নিজের ভুল নিয়ে বেশি ব্যতিব্যস্ত থাকা, যেন অন্যের ভুল নিয়ে গল্প/গীবত করার কোনো সুযোগ না থাকে।
.
🔘 ৯. এমন কোনো কথা কারো পিছনে কখনো না বলা, যেটা সে যদি সামনে থাকতো, তাহলে তার সামনে কখনোই বলা যেত না. এটাই গীবতের ক্লাসিক সংজ্ঞা! গীবত মৃত ভাইয়ের মাংস খাবার মতন জঘন্য গুনাহ (কুরআন: সুরাহ হুজুরাত)
.
.
🔘 ১০. বড় - ছোট সবাইকে নিয়ে ভালো চিন্তা করা. যারা আমাদের থেকে বয়সে বড়, তারা আমাদের থেকে বেশি বছর ধরে বেঁচে আছেন, কাজেই তারা আমার থেকে বেশি নেক কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। আবার যারা আমাদের থেকে বয়সে ছোট, তারা আমাদের থেকে কম গুনাহ করার সুযোগ পেয়েছে। কাজেই বড় হোক, ছোট হোক - সবাই আমার থেকে ভালো। কারো সাথে তুলনা করে যেন আমার নিজের মধ্যে অহংকার না আসে।
.
আল্লাহ সুবহানুতায়ালা আমাদের ভিতর-বাহির সব সুন্দর রাখুক।আমাদেরকে উত্তম চরিত্রের হবার তাওফিক দিন। আমিন!

এসো মুসলিম হই।

 খলিফা উমর (রাঃ) মৃত্যুদন্ডের আসামী কে ছেড়ে দিলেন, জামিনদার আবু যর গিফারীর কারণে তারপর।

দোষী এক ব্যক্তিকে টেনে-হিঁচড়ে খলীফার দরবারে নিয়ে এসেছেন দুই যুবক। তারা তাদের পিতার হত্যার বিচার চান।
"এই যুবক আমাদের পিতাকে হত্যা করেছে। আমরা এর বিচার চাই।"
খলীফা হযরত উমর (রা) সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন যে তার বিপক্ষে করা অভিযোগ সত্য কিনা। অভিযোগ স্বীকার করল সে। তারপর সেই ঘটনার বর্ণনা দিলঃ
"অনেক পরিশ্রমের কাজ করে আমি বিশ্রামের জন্য একটি খেজুর গাছের ছায়ায় বসলাম। ক্লান্ত শরীরে অল্প সময়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার একমাত্র বাহন উটটি পাশে নেই। খুঁজতে খুঁজতে কিছু দূর গিয়ে পেলাম, তবে তা ছিল মৃত।
অভিযোগকারী এই দুই যুবকের বাবাকে আমার মৃত উটের পাশে পেলাম। সে আমার উটকে তার বাগানে প্রবেশের অপরাধে পাথর মেরে হত্যা করেছে। এই কারণে আমি হঠাৎ করে রাগান্বিত হয়ে পড়ি এবং তার সাথে তর্কাতর্কি করতে করতে এক পর্যায়ে মাথায় পাথর দিয়ে আঘাত করে ফেলি। ফলে সে সেইখানেই মারা যায়। যা একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ঘটে গেছে। এর জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।"
বাদী’রা জানালেন- "আমরা এর মৃত্যুদণ্ড চাই।"
সব শুনে হযরত উমর (রা) অপরাধী যুবককে বললেন, "উট হত্যার বদলে তুমি একটা উট দাবি করতে পারতে, কিন্তু তুমি বৃদ্ধকে হত্যা করেছ। হত্যার বদলে হত্যা। এখন তোমাকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে। তোমার কোন শেষ ইচ্ছা থাকলে বলতে পারো।"
ঐ ব্যক্তি বললো, "আমার কাছে কিছু ঋণ ও অন্যের রাখা কিছু আমানত আছে। আমাকে যদি কিছু দিন সময় দিতেন, আমি বাড়ি গিয়ে আমানত ও ঋণগুলি পরিশোধ করে আসতাম।"
খলিফা হযরত উমর (রা) বললেন, "তোমাকে এভাবে একা ছেড়ে দিতে পারি না। যদি তোমার পক্ষ থেকে কাউকে জিম্মাদার রেখে যেতে পারো তবে তোমায় সাময়িক সময়ের জন্য যেতে দিতে পারি।“
"এখানে আমার কেউ নেই যে আমার জিম্মাদার হবে।" নিরুপায় হয়ে ঐ ব্যক্তি জানালো।
এই সময় হঠাৎ মজলিসে উপস্থিত একজন সাহাবী হযরত আবু যর গিফারী (রা) দাঁড়িয়ে বললেন, "আমি হবো ঐ ব্যক্তির জামিনদার। তাকে যেতে দিন।"
আবু যর গিফারীর (রা)র এই উত্তরে সভায় উপস্থিত সবাই হতবাক। একে তো অপরিচিত ব্যক্তি, তার উপর হত্যার দন্ডপ্রাপ্ত আসামী! তার জামিনদার কেন হচ্ছেন আবু যর
খলিফা বললেন, "আগামি শুক্রবার জুম্মা পর্যন্ত এই ব্যক্তিকে মুক্তি দেয়া হলো। জুম্মার আগে সে মদীনায় ফেরত না আসলে তার বদলে আবু যরকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হবে।"
মুক্তি পেয়ে ঐ ব্যক্তি ছুটলো মাইলের পর মাইল দূরে তার বাড়ির দিকে। আবু যর গিফারী (রা) চলে গেলেন নিজ বাড়িতে।
দেখতে দেখতে জুম্মাবার এসে গেল। ঐ ব্যক্তির আসার কোনো খবর নেই। হযরত উমর (রা) রাষ্ট্রীয় পত্রবাহক পাঠিয়ে দিলেন আবু যর গিফারির (রা) কাছে। পত্রে লিখা, আজ শুক্রবার বাদ জুমা সেই ব্যক্তি যদি না আসে, আইন মোতাবেক আবু যর গিফারির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হবে। আবু যর যেন সময় মত জুম্মার প্রস্তুতি নিয়ে মসজিদে নববীতে হাজির হন। খবর শুনে সারা মদীনায় থমথমে অবস্থা। একজন নিষ্পাপ সাহাবী আবু যর গিফারী আজ বিনা দোষে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হবেন।
জুমার পর মদীনার সবাই মসজিদে নববীর সামনে হাজির। সবার চোখে পানি। কারণ দন্ডপ্রাপ্ত যুবক এখনো ফিরে আসেনি। জল্লাদ প্রস্তুত। এই জল্লাদ জীবনে কত জনের মৃত্যুদন্ড দিয়েছে তার হিসেব নেই। কিন্তু আজ কিছুতেই চোখের পানি আটকাতে পারছে না সে। আবু যরের মত একজন সাহাবী সম্পূর্ণ বিনা দোষে আজ মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হবেন, এটা মদীনার কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
এমনকি মৃত্যুদন্ডের আদেশ প্রদানকারী খলিফা উমর (রা) নিজেও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। হৃদয় তাঁর ভারাক্রান্ত। তবু আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কারো পরিবর্তনের হাত নেই। আবু যর (রা) তখনও নিশ্চিন্ত মনে হাঁসি মুখে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। জল্লাদ ধীর পায়ে আবু যর (রা) এর দিকে এগুচ্ছেন আর কাঁদছেন। আজ যেন জল্লাদের পা চলে না। পায়ে যেন কেউ পাথর বেঁধে রেখেছে।
এমন সময় এক সাহাবী উচ্চ স্বরে জল্লাদকে বলে উঠলেন, "হে জল্লাদ একটু থামো। মরুভুমির ধুলার ঝড় উঠিয়ে ঐ দেখ কে যেন আসছে। হতে পারে ঐটা সেই ব্যক্তির ঘোড়ার পদধুলি। একটু দেখে নাও।"
ঘোড়াটি কাছে আসলে দেখা যায় সত্যিই এ সেই ব্যক্তি। সে দ্রুত খলিফার সামনে এসে বললো, "আমীরুল মুমিনীন, মাফ করবেন। রাস্তায় যদি আমার ঘোড়া পায়ে ব্যথা না পেত, তবে যথা সময়েই আসতে পারতাম। বাড়িতে গিয়ে আমি একটুও দেরি করিনি। বাড়ি পৌঁছে গচ্ছিত আমানত ও ঋণ পরিশোধ করি। তারপর বাবা, মা এবং নববধুর কাছে সব খুলে বলে চিরবিদায় নিয়ে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে মদীনার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। এখন আমার জামিনদার ভাইকে ছেড়ে দিন আর আমাকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে পবিত্র করুন। কেননা কেয়ামতের দিন আমি খুনি হিসেবে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে চাই না।"
আশেপাশের সবাই একেবারেই নীরব। চারিদিকে একদম থমথমে অবস্থা। সবাই হতবাক, কী হতে চলেছে! ঐ ব্যক্তির পুনরায় ফিরে আসাটা অবাক করে দিলো সবাইকে।
খলিফা হযরত উমর (রা) যুবককে বললেন, "তুমি জানো তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, তারপরেও কেন ফিরে এলে?"
উত্তরে সেই ব্যক্তি বলল, "আমি ফিরে এসেছি, কেউ যাতে বলতে না পারে, এক মুসলমানের বিপদে আরেক মুসলামান সাহায্য করতে এগিয়ে এসে নিজেই বিপদে পড়ে গেছিলো।"
এবার হযরত উমর (রা) হযরত আবু যর গিফারী (রা) কে জিজ্ঞেস করলেন, "আপনি কেন না চেনার সত্বেও ওই ব্যক্তির জামিনদার হলেন?"
উত্তরে হযরত আবু যর গিফারী (রা) বললেন, "পরবর্তিতে কেউ যেন বলতে না পারে, এক মুসলমান বিপদে পড়েছিলো, অথচ অন্য কোন মুসলমান তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি।"
এমন কথা শুনে, হঠাৎ বৃদ্ধের দুই সন্তানের মাঝে একজন বলে উঠল, "হে খলীফা, আপনি তাকে মুক্ত করে দিন। আমরা তার উপর করা অভিযোগ তুলে নিলাম।"
হযরত উমর (রা) বললেন, “কেন তাকে ক্ষমা করে দিচ্ছ?”
তখন সেই যুবক বলে উঠলো, "কেউ যেন বলতে না পারে, এক মুসলমান অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল করে নিজেই স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়ার পরেও অন্য মুসলমান তাকে ক্ষমা করেনি"।।
[হায়াতুস সাহাবা-৮৪৪]

Saturday, January 24, 2026

গভীর এবং যৌক্তিক পর্যবেক্ষণ যে পরিবারে কর্তা, গিন্নী, ছেলে মেয়ে চাকরদের কাজের ওপর নিরভরশীল, সে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কাজের নান্দনিক সৌন্দর্য কম!

 যখন একটি পরিবারের সদস্যরা তাদের দৈনন্দিন ও ব্যক্তিগত কাজের জন্য সম্পূর্ণভাবে গৃহকর্মীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন সেখানে ‘কাজের নান্দনিকতা’ বা কাজের প্রতি মমত্ববোধ কমে যাওয়ার কয়েকটি বিশেষ কারণ থাকে:

১. সৃজনশীলতার অভাব: নিজের ঘর গোছানো, রান্না করা বা বাগান করার মধ্যে এক ধরনের শিল্পবোধ থাকে। যখন কেউ নিজের কাজ নিজে করেন, তখন তাতে তার রুচি ও ব্যক্তিত্বের প্রতিফলন ঘটে। অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা এই সৃজনশীল প্রকাশের সুযোগ কেড়ে নেয়।
২. শৃঙ্খলার অভাব: নিজে কাজ করলে সময়ের মূল্য এবং জিনিসের যত্ন বোঝা যায়। চাকরদের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা পরিবারের সদস্যদের অলস করে তোলে, যা জীবনযাত্রার স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ও নান্দনিকতাকে নষ্ট করে।
৩. মমত্বহীন পরিবেশ: নিজের হাতে তৈরি জিনিসের প্রতি বা নিজের গোছানো ঘরের প্রতি যে মায়া থাকে, অন্যের করে দেওয়া কাজে তা পাওয়া যায় না। এর ফলে ঘরটি কেবল একটি থাকার জায়গা হয়ে ওঠে, সেখানে প্রাণের ছোঁয়া বা শিল্পের ছোঁয়া কম থাকে।
৪. পরনির্ভরশীল মানসিকতা: ছেলে-মেয়েরা যখন ছোটবেলা থেকেই দেখে যে তাদের সব কাজ অন্য কেউ করে দিচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে স্বাবলম্বী হওয়ার ইচ্ছা বা কাজের নিখুঁত সৌন্দর্য বোঝার ক্ষমতা তৈরি হয় না।
উপসংহার:
পরিশ্রমের মাধ্যমেই কাজের প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা মহাত্মা গান্ধীর মতো মনীষীরাও নিজের কাজ নিজে করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন, কারণ এতে মানুষের মনের বিকাশ ঘটে এবং জীবন আরও সুন্দর ও সুসংহত হয়। যে পরিবারে সবাই মিলে কাজ ভাগ করে নেয়, সেই পরিবারেই কাজের নান্দনিক সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে।
আসলে জীবনকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলার জন্য স্বনির্ভরতা এবং কর্মতৎপরতার কোনো বিকল্প নেই।



Friday, January 23, 2026

প্রয়োজনের চেয়ে জীবনের উদ্দেশ্যই বেশী গুরুত্বপূর্ণ

 Purpose of Life is more important than need

জীবন ও বেঁচে থাকার তাগিদে আমাদের মৌলিক প্রয়োজনগুলো (অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান) মেটানো জরুরি, তবে জীবনের উদ্দেশ্য সেই বেঁচে থাকাকে অর্থবহ করে তোলে। প্রয়োজনীয়তা আমাদের দেহকে বাঁচিয়ে রাখে, কিন্তু উদ্দেশ্য বাঁচিয়ে রাখে আমাদের সত্তাকে।
জীবনের উদ্দেশ্য কেন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তার কিছু কারণ নিচে দেওয়া হলো:
দিকনির্দেশনা প্রদান: প্রয়োজন মেটানো অনেকটা পথ চলার মতো, আর উদ্দেশ্য হলো সেই পথের গন্তব্য। গন্তব্য জানা থাকলে প্রতিকূলতা জয় করা সহজ হয়।
সহনশীলতা বৃদ্ধি: ভিক্টর ফ্রাঙ্কলের মতে, যার জীবনে একটি 'কেন' (উদ্দেশ্য) আছে, সে যেকোনো 'কিভাবে' (কষ্ট) সহ্য করতে পারে। উদ্দেশ্য মানুষকে কঠিন সময়েও ভেঙে পড়তে দেয় না।
মানসিক তৃপ্তি: সব প্রয়োজন মিটে যাওয়ার পরও মানুষ অনেক সময় বিষণ্নতায় ভোগে যদি তার জীবনের কোনো বৃহত্তর লক্ষ্য না থাকে। উদ্দেশ্য মানুষকে আত্মিক শান্তি দেয়।
উত্তরাধিকার সৃষ্টি: মানুষের শারীরিক প্রয়োজনগুলো তার মৃত্যুর সাথেই শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মহান কোনো উদ্দেশ্য বা কর্ম তাকে মৃত্যুর পরেও বাঁচিয়ে রাখে।
পরিশেষে, প্রয়োজন হলো জীবন ধারণের মাধ্যম, আর উদ্দেশ্য হলো জীবনের সার্থকতা।



কিছু মানুষ তাদের সুবিধামত তোমাকে ভালোবাসবে, তোমার স্তুতি গাইবে।

 কিছু মানুষ তাদের সুবিধামত তোমাকে ভালোবাসবে, তোমার স্তুতি গাইবে। এদের প্রশ্রয় দিওনা কোনোমতেই।

যারা কেবল প্রয়োজনে বা নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ভালোবাসা বা প্রশংসা প্রদর্শন করে, তারা মূলত সুযোগসন্ধানী। এদের চিনে রাখা এবং সঠিক দূরত্ব বজায় রাখা জরুরি।
এই ধরনের মানুষদের প্রশ্রয় না দেওয়ার কিছু কারণ:
মানসিক শান্তি: স্বার্থপর মানুষদের অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে তাদের আচরণ আপনাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিতে পারে।
ব্যক্তিত্ব রক্ষা: যারা কেবল তোষামোদ করে, তারা আপনার ভুলগুলো কখনো ধরিয়ে দেবে না। এতে আপনার ব্যক্তিগত উন্নতির পথ বাধাগ্রস্ত হয়।
প্রকৃত বন্ধু চেনা: তোষামোদকারীদের ভিড়ে আসল শুভাকাঙ্ক্ষীদের চেনা কঠিন হয়ে পড়ে।
তাই বিনয়ের সাথে এদের এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। আত্মমর্যাদা বজায় রেখে যারা নিঃস্বার্থভাবে পাশে থাকে, তাদেরই মূল্যায়ন করা উচিত।

"ইন্টেলিজেন্ট ইগনোরেন্স"

 স্মার্ট হওয়ার চূড়ান্ত স্তর হলো এমন ভান করা যে “আমি কিছুই জানি না।” এতে জীবন সহজ হয়!

এই উপলব্ধিতে গভীর প্রজ্ঞা লুকিয়ে আছে। একে প্রায়ই "ইন্টেলিজেন্ট ইগনোরেন্স" (Intelligent Ignorance) বলা হয়। স্মার্ট হওয়ার এই স্তরে পৌঁছানোর কিছু বিশেষ সুবিধা নিচে দেওয়া হলো:
১. অহেতুক তৰ্ক থেকে মুক্তি: আপনি যখন ভান করেন যে আপনি কিছু জানেন না, তখন মানুষ আপনাকে নিয়ে তর্কে জড়াতে পারে না। এতে আপনার মানসিক শান্তি বজায় থাকে এবং মূল্যবান সময় বাঁচে।
২. শেখার সুযোগ বৃদ্ধি: "আমি সব জানি" ভাবলে শেখার পথ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু "আমি জানি না" বললে অন্যরা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে, ফলে অনেক নতুন তথ্য বা দৃষ্টিভঙ্গি জানা যায় যা হয়তো আগে জানা ছিল না। সক্রেটিসের এই দর্শনটি আজও প্রাসঙ্গিক।
৩. মানুষের আসল রূপ চেনা: আপনি যখন চুপ থাকেন বা কম জানেন বলে ভান করেন, তখন চারপাশের মানুষরা নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে গিয়ে তাদের আসল স্বভাব ও চিন্তাধারা প্রকাশ করে ফেলে।
৪. অপ্রয়োজনীয় দায়িত্ব এড়ানো: অনেক সময় সবজান্তা ভাব ধরলে মানুষ বাড়তি কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। "জানি না" বললে জীবন অনেক বেশি ভারমুক্ত থাকে।
৫. বিনয় ও ব্যক্তিত্ব: যারা প্রকৃত জ্ঞানী, তারা সাধারণত নিরহঙ্কার হন। এই আচরণ আপনাকে অন্যদের কাছে আরও গ্রহণযোগ্য ও রহস্যময় করে তোলে।
প্রকৃতপক্ষে, সব জেনেও না জানার ভান করা এক ধরণের উচ্চতর বুদ্ধিমত্তা, যা কেবল আত্মবিশ্বাসী মানুষেরাই করতে পারে। জীবনকে সহজ ও সুন্দর করার জন্য এটি একটি চমৎকার কৌশল।