Monday, March 30, 2026

ইউক্যালিপটাস গাছ ও আমরা

 বাগানের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ১৯২১ সালে সিলেটে প্রথম ইউক্যালিপটাস গাছ নিয়ে আসা হয় অস্ট্রেলিয়া থেকে। ৭০ এর দশকের শেষ দিকে আসে আকাশমণিও। তখন বাংলাদেশ ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট পরীক্ষামূলকভাবে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, হাটহাজারী, মধুপুর ও দিনাজপুরের বিভিন্ন জায়গায় এর উপযোগিতা পরীক্ষা করে। দেশের উত্তরাঞ্চলে এই গাছ ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান হওয়ার কারণ এক সময় বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি - বিশেষ করে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় ইউক্যালিপটাস গাছ ঐ অঞ্চলে রোপণ করা হয়েছে। ইউক্যালিপটাসের প্রায় ৭০০ টি প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশে সাধারণত ক্যামালডোলেনসিস, সাইট্রিওডোরা ও টেরেটিকরনিস — এই তিন ধরনের ইউক্যালিপটাস দেখা যায়।‌

গ্রোথ বেশি হওয়ার কারণে প্রতিদিন একটি ইউক্যালিপটাস গাছ প্রাপ্যতা অনুযায়ী দৈনিক ৫০-৯০ লিটার পানি শোষণ করে মাটিকে নিরস ও শুষ্ক করে ফেলে, যা উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ অঞ্চলের মাটির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এরা খনিজ লবণ শোষণ ছাড়াও মাটির গভীর থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করে ডালে জমা রাখে বলে এর আশেপাশে অন্যান্য ফলদ গাছের ফলন ভালো হয় না।
ইউক্যালিপটাস যেখানে লাগানো হয়, সেখানে প্রচুর বীজ ছড়ায় বলে অন্যান্য প্রজাতির গাছ জন্ম নেওয়ার সুযোগ পায় না। এই গাছের পাতা যেখানে পড়ে, সেখানকার মাটি কালো হয়ে যায় এবং ছয় ইঞ্চি পর্যন্ত মাটির স্তর বিষাক্ত করে ফেলে। এতে ঐ স্থানে ঘাস ও লতাপাতা জন্মাতে পারে না। এছাড়া এদের পাতা ও তেলে থাকা ইউক্যালিপটোল নামক টক্সিন মাটির উর্বরতা নষ্ট করে ফেলে। গাছের আশেপাশে মধ্যস্তর ও নিম্নস্তরে কোনো গাছপালা বা ঘাস না থাকায় মাটি সহজে আলগা হয়ে যায় এবং বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যায়, ফলে ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পায়। এর মূলতন্ত্র অগভীর হওয়ায় আলগা মাটিযুক্ত অঞ্চলে বা প্রবল ঝড়-বাতাসে গাছ উপড়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
পোকামাকড় ও পাখি এই গাছ থেকে খাদ্য-বাসস্থানের মতো তেমন কোনো উপকার পায় না বলে জীববৈচিত্র্যের উপরও বিরূপ প্রভাব পড়ে। ইউক্যালিপটাসের রেণু নিঃশ্বাসের সঙ্গে দেহে প্রবেশ করলে অ্যাজমার মত শ্বসনতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ হয়। এর পাতায় পেট্রলিয়াম জাতীয় পদার্থ আছে। দাবানলের সময় ইউক্যালিপটাস প্রচুর দাহ্য গ্যাস নির্গত করে, যা বাতাসের সাথে মিশে বিস্ফোরিত হতে পারে। অস্ট্রেলিয়ায় ২০২০ সালের দাবানলটি এত ভয়াবহ হওয়ার পেছনে এই গাছের ভূমিকা রয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন।
উত্তরবঙ্গে কৃষি জমির আইল বরাবর প্রচুর ইউক্যালিপটাস গাছ দেখা যায়। সেখানকার মানুষের যুক্তিতে ইউক্যালিপটাসের বেশি যত্ন লাগে না আর ছাগলেও খায় না — তাই তারা এভাবে গাছ লাগান। মূলত দরিদ্র কৃষক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী গাছ চাষ করে নগদ টাকার জন্য, ফলে তাদের সবচেয়ে পছন্দের তালিকায় থাকে ইউক্যালিপটাস। এর চারার দাম কম, দ্রুত বর্ধনশীল, কাঠের মান ভালো এবং ডালপালা কম থাকায় অন্যান্য ফসলে ছায়াজনীত সমস্যার সৃষ্টি করে না। আবার সেগুন, মেহগনি সহ অন্যান্য কাষ্ঠল গাছ থেকে ভালো মানের কাঠ পেতে ন্যূনতম ১৫-২০ বছর অপেক্ষা করা লাগে, যেখানে ইউক্যালিপটাস থেকে কাঠ পেতে প্রয়োজন মাত্র ৫-৮ বছর। ইউক্যালিপটাস গাছ থেকে দ্রুত নগদ টাকা পেয়ে পুনরায় ওই জমিতে অন্যান্য ফসল অথবা ইউক্যালিপটাস চাষ করেন তারা।‌
২০০৮ সালের এক প্রজ্ঞাপনে ইউক্যালিপটাসের চারা উৎপাদন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। কিন্তু, অল্প সময়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ার কারণে শুরু হয় ব্যক্তি উদ্যোগে ব্যাপক হারে ইউক্যালিপটাস রোপন। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিষিদ্ধ করা হলেও উত্তরবঙ্গের নার্সারিগুলোতে কোনো রকম বাধা-বিপত্তি ছাড়াই বিভিন্ন দেশীয় ফলজ গাছের চেয়েও কম দামে বিক্রি হয়েছে ইউক্যালিপটাস, এমনকি বন কর্মকর্তারাও জানতেন না এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে এই গাছের ব্যাপারে নানান শর্ত আরোপিত হলেও গত বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো কোনো দেশের সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে আগ্রাসী ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছের চারা তৈরি, রোপণ এবং বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এদের পরিবর্তে দেশীয় ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ রোপণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।‌তবে ইউক্যালিপটাস কেবল ক্ষতিকর নয়, এর কিছু উপকারী দিকও আছে। এর পাতার নির্যাস থেকে একটি অ্যান্টিসেপটিক তেল পাওয়া যায়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে সিনেওল (Cineole) নামে পরিচিত এবং এর বাজার মূল্য যথেষ্ট বেশি। এই তেল হাঁটু এবং অন্যান্য অস্থিসন্ধির ব্যথা উপশমে সহায়ক। ভারতের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ইউক্যালিপটাস তেল ব্যবহার করা হয়। এর অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই তেল সামান্য গরম করলে যে বাষ্প উৎপন্ন হয়, তা শ্বাসনালী পরিষ্কার করতে এবং শ্লেষ্মা (mucus) কমাতে সাহায্য করে। এছাড়াও, এটি শুষ্ক ত্বককে সতেজ করে এবং মশা ও অন্যান্য কীটপতঙ্গ তাড়ানোর একটি প্রাকৃতিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। তবে বিশুদ্ধ ও কাঁচা ইউক্যালিপটাস তেল (ইউক্যালিপটোল) অত্যন্ত বিষাক্ত, বিশেষ করে শিশুদের জন্য।
ইউক্যালিপটাসের চা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে, তবে এ বিষয়ে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এটি শক্তিশালী anti-inflammatory গুণসম্পন্ন। যা শরীরের প্রদাহ কমাতে, ব্যথা উপশম করতে এবং হৃৎপিণ্ডের সুরক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এটি Escherichia coli এবং Candida albicans-এর মতো ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ থেকেও রক্ষা করতে পারে।
ইউক্যালিপটাসকে নাইট্রোজেন ফিক্সিং আকাশমনি অথবা সাদা/কালো কড়ই গাছের সঙ্গে পরিকল্পিত ভাবে লাগালে মাটির উর্বরতা ও ফলন বাড়তে পারে — ২০১৮ সালে এমনটা উঠে এসেছে গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনসারভেশন জার্নালে। তবে, ইউক্যালিপটাস গাছ থেকে যে উপকারি পণ্যগুলো পাওয়া যায় তা যথেষ্ট বিষাক্ত এবং এর যথাযথ ব্যবহার বা বাণিজ্যিকীকরণ আমরা এখনো রপ্ত করতে পারি নি। ফলে, আপাত দৃষ্টিতে ইউক্যালিপটাস চাষে লাভের চেয়ে ক্ষতিই অনেক বেশি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যায়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক কামাল হোসেন বলেন, ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির অবক্ষয়িত ও অনুর্বর মাটিতে টিকে থাকার ক্ষমতা বেশ ভালো এবং সেরকম জায়গায় এদের লাগানো যায় কি না, তা নিয়ে সরকার ভাবতে পারে।‌
Nazir Tiham
Team Science Bee

No comments:

Post a Comment