Thursday, May 11, 2017

কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ ও ব্যক্তিজীবনে স্থায়ী বিষণ্নতা

মায়ের পেট থেকে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ায় বাছুর। কিষানের গোয়ালঘরে বা আঙিনায় বাছুরের ওই টলমল প্রথম পা (staggering gait) ফেলা, হাঁটতে গিয়ে ঝাঁপাঝাঁপি করা, মাকে ঘিরে এবড়োখেবড়ো দৌড় যারা দেখেছেন, তাঁরাই জানেন জন্মের সে কী আনন্দ! কিন্তু ঠিক ওই সময়ই গাভির কাছ থেকে সদ্যোজাত বাছুরকে সরিয়ে নেন কিষান। মায়ের কাছ থেকে শিশুকে এভাবে বিচ্ছিন্ন করার অনেক যুক্তিসংগত কারণের কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু যুগ যুগ ধরে চলা এই চর্চার নেতিবাচক দিকের কথা জানিয়েছেন আধুনিক গবেষকেরা। পেশাগত ক্ষেত্রে কর্মীদের আবেগ অনুভূতি মূল্যায়ন প্রসঙ্গে এক প্রতিবেদনে সে সম্পর্কে জানিয়েছে বিবিসি।

গাভির কাছ থেকে সদ্যোজাত বাছুরকে সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কিষানের সবচেয়ে বড় যুক্তি—গৃহপালিত গাভি অনেক ক্ষেত্রেই সদ্যোজাত বাছুরের প্রতি রুষ্ট হয়ে ওঠে, এমনকি বাছুরকে আহতও করে ফেলতে পারে। তবে, সে যা-ই হোক, মায়ের কাছ থেকে শিশুর এই বিচ্ছিন্নতার একটা অনাকাঙ্ক্ষিত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আছে বলে বিশ্বাস করেন প্রায়োগিক জীববিদ্যার গবেষক ড্যানিয়েল উয়েরি।

গাভির কাছ থেকে এভাবে আলাদা করে ফেলায় তা বাছুরের মধ্যে একটা হতাশা সৃষ্টি করতে পারে। জন্মানোর পরপরই এই আঘাত গভীর ছাপ ফেলতে পারে এবং কালক্রমে এই ক্ষত বেড়ে গিয়ে একটা স্থায়ী নেতিবাচকতা সৃষ্টি করতে পারে, যাকে অনেকটা মানুষের ‘বিষাদগ্রস্ততা’ বা মনমরা হয়ে থাকার সঙ্গে তুলনা করা যায়। ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায়োগিক জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক উয়েরি বলেন, ‘প্রাণীদের আবেগী প্রতিক্রিয়া আছে, তাই তাকে আহত না করে বিষয়টিকে অন্যভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে তা লাভজনক।’ আর এটা কেবল একটা নৈতিক সমস্যাই নয়, বিষাদগ্রস্ত গাভি বেশি দুধ দেয় না। ফলে এখানে কিষানের লাভ-লোকসানের প্রশ্নও জড়িত।

উত্পাদনশীলতা এবং আবেগের মধ্যকার এই সম্পর্ক ইদানীং বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই আলোচিত হচ্ছে ব্যবসার ক্ষেত্রেও। আবেগ-কাজে মনোযোগ-উত্পাদনশীলতার এই ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। পাশাপাশি দিন দিন অনেক বড় বড় কোম্পানিই চাচ্ছে যে তাদের ব্যবস্থাপকেরা কর্মীদের আবেগ-অনুভূতির খোঁজখবর রাখবেন, কর্মীদের আবেগের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেবেন।

নিষিদ্ধ থেকে স্বাগত
১৯৮০-র দশক বা তার আগে পেশা জীবনে যোগ দেওয়া মানুষদের কাছে এসব কথা খুবই উদ্ভট মনে হতে পারে। অফিসে কোনো বিষয়ে আবেগী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা কর্মীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই ছিল সেই যুগের ব্যবস্থাপকের কাজ। হার্ভার্ড মেডিকেল কলেজের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং ক্যামব্রিজ হেলথ অ্যালায়েন্সের প্রধান মনোবিজ্ঞানী কিম্বারলিন লিয়ারি এভাবেই সে যুগে কোম্পানি ব্যবস্থাপকদের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করলেন।

এখনকার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। বড় কোম্পানিগুলো আশা করে চৌকস ব্যবস্থাপকেরা কর্মীদের আবেগ-অনুভূতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখবেন এবং যাকে বলে অফিসে ‘আবেগী গোয়েন্দাবৃত্তি’ চালাতে সক্ষম হবেন। কর্মীদের অনুভূতি কী এবং কেন ওই রকম? কর্মীদের কেউ কেউ কি ভাবছেন যে বাকি কর্মীরা তাঁদের চিন্তাভাবনায় গুরুত্ব দেন না এবং তাঁদের সম্মান করেন না? অফিস মিটিংয়ে তাঁর কথা শুনতে না চাওয়ায় কি কোনো কর্মী ক্ষুব্ধ হয়ে আছেন? মূল্যায়নসংক্রান্ত জটিলতা নিয়ে কি কোনো কর্মী আহত বোধ করছেন বা কর্মস্পৃহা হারিয়ে ফেলছেন?

আর এ ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপকদের ভূমিকাই মুখ্য বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেনভারের ডা ভিটার সদর দপ্তরের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভ হোরমান। তিনি বলেন, ‘ব্যবস্থাপনার এই বিষয়টিকে আমরা যেভাবে দেখি তা হলো, আমরা সব সময়ই হিসাবটা নিজেকে দিয়ে শুরু করতে বলি। ব্যবস্থাপকেরা যত বেশি নিজেদের সম্পর্কে সচেতন হবেন, নিজেরা স্বাস্থ্যবান এবং সুখী হবেন, তাঁদের কর্মিবাহিনীও ততটাই তেমন হবে।’

কানাডীয় বংশোদ্ভূত জীববিজ্ঞানী ড্যানিয়েল উয়েরি বলেন, গল্পটা ওই কিষান এবং তাঁর গাভি আর বাছুরের মতই। এমন কেউ কেউ আছেন যাঁরা প্রাণীর আবেগটাই বোঝেন না, কেউ কেউ তা জানেন বা বোঝেন বটে কিন্তু সে বিষয়ে কিছুই করেন না। আর কেউ কেউ বিষয়টা বুঝবেন এবং তা সমাধানে কাজও করবেন। তিনি বলেন, ‘গাভির কাছ থেকে ভালোভাবে দুধ দুইয়ে নিতে হলে তাকে যথাযথ খানা-খাদ্য আর আদর-ভালোবাসা দিয়েই তা নিতে হবে।’-
Adapted

Tuesday, May 9, 2017

অতীন্দ্রিয় আনন্দে জেগে ওঠো

ধর্ম ঐতিহাসিক সত্য। মানুষের বাইরে এর বিকাশ। শিকড় মানবাত্মার গভীরে। এই বিশ্বব্যবস্থা পৃথিবী থেকে এবং মানবজাতির অন্তর থেকে কোনো দিন লুপ্ত হয়ে যাবে না।
বস্তুজগতের ঊর্ধ্বে এমন কিছু আছে, অনুভূতি দিয়ে যার স্বাদ পাওয়া যায়। অনুভূতির এই অভিজ্ঞতা বাস্তবতার ঊর্ধ্বে সত্যি সত্যিই অন্য এক বাস্তবতাকে শনাক্ত করতে পারে। সেই বাস্তবতার বৈশিষ্ট্য পবিত্রতা। পবিত্রতার আবহ আমাদের পরিচিত বস্তুজগৎ এবং বিশুদ্ধ নিত্যজগৎ বা স্বর্গীয় পরিমণ্ডলের মধ্যে যোগসূত্র রচনা করে। সেই সুপবিত্র তৃষিত স্বর্গের উদ্বোধন ঘটিয়েছেন যুগে যুগে ওলি, কামেল তথা ঋষি ও মনীষীরা। বৈদগ্ধের উচ্চতম স্তরে রয়েছে সেসব তত্ত্ব ও তাত্ত্বিকতা।
বলাবাহুল্য আজ আমাদের জীবন নানা চাপে ও মানসিক অস্থিরতায় ভরা। দুঃখের সমূহ গান ভেসে ওঠে কণ্ঠে কণ্ঠে- ‘শান্তির পারাবত যা উড়ে আকাশে, যেখানে অবাধ প্রাণ মুক্ত বাতাসে। যেখানে বিরোধ নেই, নেই বিদ্বেষ- স্বার্থের হানাহানি নেই কোন ক্লেশ, যেখানে দরদী মন শুধু ভালোবাসে। এখানে মানুষ নামে অমানুষ যারা, পৃথিবীটা কলুষিত করে দিল তারা। দূষণের বিষ আজ প্রতি নিঃশ্বাসে। সৃষ্টির সেরা জীব হলো নরাধম, মানুষ হয়েছে মানুষের যম। নিখিল ধরণী আজ কাঁপে সন্ত্রাসে। শান্তির পারাবত যা উড়ে আকাশে।’
বস্তুত মানুষের মনে শান্তি নেই স্বস্তি নেই। সমাজ-জীবনও সহজ-সরল নেই। ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলোও নানাভাবে বিপর্যস্ত। দৈনন্দিন যাপনের মাধ্যমে প্রাত্যহিকতার চাপে আমরা দীর্ণ। আসলে জীবনটা কেমন যেন তালকানা হয়ে গিয়েছে। বাজার অর্থনীতির ডমরুধ্বনিতে চলমান পৃথিবীর বুকে আমরা যেন হঠাৎ আটকে গেছি। বিশ্বায়নের এ যুগে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, রেষারেষি তো রয়েছে। তার বাইরে বিশ্ব অর্থনীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে স্বাভাবিক জীবনধারণ প্রায় অসম্ভব। ব্যক্তি মানুষ বিপর্যস্ত। এক অনিশ্চয়তার মধ্যেই জীবন কাটানো। অথচ এক দিকে থরে থরে সহজলভ্য বিলাসী ভোগ্যপণ্য, অন্য দিকে দারিদ্র্যের সর্বগ্রাসী থাবায় বিপন্ন সমাজ। দারিদ্র্য ও অভাব এ দেশের আধুনিকতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সমষ্টির স্বার্থে তাই ব্যক্তির আত্মত্যাগ জরুরি। কেননা সৎ ও সচেতন জনমানসই সুস্থির সুনিয়ন্ত্রিত সমাজ গঠন করতে পারে।
বস্তুত দ্রুত বদলে যাচ্ছে সময়। বদলে যাচ্ছে মানবিক মূল্যবোধ। সবাই ছুটছে আর ছুটছে, কিন্তু কোথাও পৌঁছতে পারছে না। বিষয়-আশয়ে আশ্রয় নিতে গিয়েও দেখছে সব শূন্য।
আসলে আমরা ভুলে গেছি ধর্মের অমোঘ বাণী : অন্তরের অনুসন্ধানে ভোগ কমাও, ভোগ্যপণ্য সংযত করো। যদি শেষ অবধি বাঁচতে চাও, যদি সন্তানসন্ততির বেঁচে থাকা চাও, অল্প নিয়ে থাকো। কেবল ইন্দ্রিয় সুখ নয়, অতীন্দ্রিয় আনন্দে জেগে ওঠো।
Adapted

তারাও মানুষ

শহরবাসী শোন-
তোমরা যাদের মানুষ বল না
বিধিও যাদের কান্না শোনে না
তারাও মানুষ কাঁদে তাদের প্রাণ
আমি চোখের জলে শোনাই তাদের গান।

তাদের বুকের রিক্ত হাহাকার
কেউ বোঝে না, ওগো কেউ শোনে না
সর্বহারার মর্মবেদনা
দুঃখে যাদের জীবন গড়া মানুষ যাদের নাম
আমি চোখের জলে শোনাই তাদের গান।

জীবন তাদের নিত্য পরিহাস
কেউ দেখে না, ওগো কেউ লেখে না
এ সংসারে তাদের ইতিহাস
পথের মলিন ধুলায় যাদের ঝরে মাথার ঘাম
আমি চোখের জলে শোনাই তাদের গান।