Thursday, April 5, 2018

মুখের কথার ব্যবহার ও অপব্যবহার বিষয়ে আল কুরআন কি বলে?


আল কুরআন বার বার বলেছে যে, মানুষের কথা বলবার ক্ষমতা আল্লাহ পাকের এক সুমহান নিয়ামাত। তাই এর সঠিক ব্যবহার হওয়া উচিত। কথা বলার যোগ্যতা মানুষকে অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা করে এক বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। আল কুরআন স্পষ্টভাবেই বলেছে যে প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে ভদ্র, সুন্দর এবং অর্থপূর্ণ কথা বলা আর সেই সাথে কথার অপব্যবহার না করা। আর কুরআন একটি উপমা দিয়ে বলেছে যে ভাল কথা এমন এক বৃক্ষের মত যার শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত আর খারাপ এমন এক বৃক্ষের মত যার নেই কোনই ভিত্তিমূল। আর কুরআন আরো বলেছে যে আল্লাহর দেয়া কথা বলবার ক্ষমতা আর অন্যের সাথে ভাব বিনিময়ের যোগ্যতা প্রতিটি মানুষ যেন সচেতনভাবে আর দায়িত্বের সাথে ব্যবহার করে।
রেফারেন্স ০১. আল কুরআন থেকে: এবং তাকে কথা শিখিয়েছেন 'Allamahul bayaan (সূরা আর রাহমান, আয়াত ০৪) ৷
ক. এর একটি অর্থ হচ্ছে মনের ভাব প্রকাশ করা ৷ অর্থাত কোন কিছু বলা এবং নিজের উদ্দেশ্যে ও অভিপ্রায় ব্যক্ত করা৷ দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে পার্থক্য ও বৈশিষ্ট স্পষ্ট করে তোলা৷ এখানে এর অর্থ হচ্ছে ভাল মন্দ ও কল্যাণ-অকল্যাণের মধ্যকার পার্থক্য৷ এ দুটি অর্থ অনুসারে ক্ষুদ্র এ আয়াতাংশটি ওপরে বর্ণিত যুক্তি প্রমাণকে পূর্ণতা দান করে৷ বাকশক্তি এমন একটি বিশিষ্ট গুণ যা মানুষকে জীবজন্তু ও পৃথিবীর অন্যান্য সৃষ্টিকূল থেকে পৃথক করে দেয়৷ এটা শুধু বাকশক্তিই নয়৷ এর পেছনে জ্ঞান ও বুদ্ধি, ধারণা ও অনুভূতি, বিবেক ও সংকল্প এবং অন্যান্য মানসিক শক্তি কার্যকর থাকে যেগুলো ছাড়া মানুষের বাকশক্তি কাজ করতে পারে না৷ এজন্য বাকশক্তি প্রকৃতপক্ষে মানুষের জ্ঞানী ও স্বাধীন সৃষ্টজীব হওয়ার স্পষ্ট প্রমাণ৷ আর আল্লাহ তা'আলা এ বিশেষ গুণটি যখন মানুষকে দান করেছেন তখন এটাও স্পষ্ট যে, জ্ঞান ও অনুভূতি এবং ইখতিয়ারবিহীন সৃষ্টিকূলের পথ প্রদর্শনের জন্য শিক্ষার যে প্রকৃতি ও পদ্ধতি উপযুক্ত হতে পারে মানুষের শিক্ষার প্রকৃতি ও পদ্ধতি তা হতে পারে না৷ একইভাবে মানুষের আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ গুণ হলো আল্লাহ তায়ালা তার মধ্যে একটি নৈতিক অনুভূতি (Moral sense) সৃষ্টি করে দিয়েছেন যার কারণে সে প্রকৃতিগতভাবেই ভাল ও মন্দ, ন্যায়, ও অন্যায়, জুলুম ও ইনসাফ এবং উচিত ও অনুচিতের মধ্যে পার্থক্য করে এবং চরম গোমরাহী ও অজ্ঞতার মধ্যেও তার ভিতরের এ আত্মজ্ঞান ও অনুভূতি লোপ পায় না৷ এ দুটি বিশেষ বৈশিষ্টের অনিবার্য দাবী হচ্ছে মানুষের জ্ঞানলোক সমৃদ্ধ ও স্বাধীন জীনের জন্য শিক্ষাদানের পন্থা ও পদ্ধতি জন্মগতভাবে লব্ধ শিক্ষা পদ্ধতি-যার সাহায্য মাছকে সাঁতার কাটা, পাখীকে উড়ে বেড়ানো এবং মানুষের নিজ দেহের মধ্যে চোখের পাতাকে পলক ফেলা, চোখকে দেখা, কানকে শোনা এবং পাকস্থলীকে হজম করা শেখানো হয়েছে-থেকে ভিন্ন হতে হবে৷ জীবনের এ ক্ষেত্রে মানুষ নিজেও শিক্ষক, বই পুস্তক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রচার -প্রোপাগাণ্ডা ও ধর্মীয় শিক্ষা, লেখা, বক্তৃতা, বিতর্ক ও যুক্তি প্রমাণের মত উপায় উপকরণকেই শিক্ষা মাধ্যম হিসেবে স্বীকার করে এবং শুধু জন্মগতভাবে লব্ধ জ্ঞানকে যথেষ্ট মনে করে না৷ তাহলে মানুষের স্রষ্টার ওপরে তাদের পথ প্রদর্শনের যে দায়িত্ব বর্তায় তা সম্পাদন করার জন্য যখন তিনি রসূল ও কিতাবকে শিক্ষাদানের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন তখন তা বিস্ময়ের ব্যাপার হবে কেন? সৃষ্টি যেমন হবে তার শিক্ষাও তেমন হবে এটা একটা সহজ যুক্তিগ্রাহ্য কথা৷  যে সৃষ্টিকে শেখানো হয়েছে তার জন্য 'কুরআন'ই হতে পারে শিক্ষার উপযুক্ত মাধ্যম৷ যেসব সৃষ্টকে 'বায়ান' শেখানো হয়নি তাদের উপযোগী শিক্ষা মাধ্যম 'বায়ান' শেখানো হয়েছে এমন সৃষ্টির জন্য উপযোগী হতে পারে না৷ 
খ. তুমি কি দেখছো না আল্লাহ কালেমা তাইয়েবার উপমা দিয়েছেন কোন্‌ জিনিসের সাহায্যে? এর উপমা হচ্ছে যেমন একটি ভালো জাতের গাছ, যার শিকড় মাটির গভীরে প্রোথিত এবং শাখা-প্রশাখা আকাশে পৌঁছে গেছে৷ Alam tara kaifa darabal laahu masalan kalimatan taiyibatan kashajaratin taiyibatin asluhaa saabitunw wa far'uhaa fis samaaa' (সূরা ইব্রাহিম আয়াত ২৪)
"কালেমা তাইয়েবা"র শাব্দিক অর্থ "পবিত্র কথা" কিন্তু এ শব্দের মাধ্যমে যে তাতপর্য গ্রহণ করা হয়েছে তা হচ্ছে, এমন সত্য কথা এবং এমন পরিচ্ছন্ন বিশ্বাস যা পুরোপুরি সত্য ও সরলতার ওপর প্রতিষ্ঠিত এ উক্তি ও আকীদা কুরআন মজীদের দৃষ্টিতে অপরিহার্যভাবে এমন একটি কথা ও বিশ্বাস হতে পারে যার মধ্যে রয়েছে তাওহীদের স্বীকৃতি, নবীগণ ও আসমানী কিতাবসমূহের স্বীকৃতি এবং আখেরাতের স্বীকৃতি৷ কারণ কুরআন এ বিষয়গুলোকেই মৌলিক সত্য হিসেবে পেশ করে৷
অন্য কথায় এর অর্থ হলো, পৃথিবী থেকে আকাশ পর্যন্ত সমগ্র বিশ্ব ব্যবস্থা যেহেতু এমন একটি সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত যার স্বীকৃতি একজন মুমিন তার কালেমা তাইয়েবার মধ্যে দিয়ে থাকে, তাই কোন স্থানের প্রাকৃতির আইন এর সাথে সংঘর্ষ বাধায় না, কোন বস্তুর আসল, স্বভাব ও প্রাকৃতিক গঠন একে অস্বীকার করে না এবং কোথাও কোন প্রকৃত সত্য ও সততা এর সাথে বিরোধ করে না৷ তাই পৃথিবী ও তার সমগ্র ব্যবস্থা তার সাথে সহযোগিতা করে এবং আকাশ তথা সমগ্র মহাশূন্য জগত তাকে স্বাগত জানায়৷

অন্যদিকে অসত বাক্যের উপমা হচ্ছে, একটি মন্দ গাছ, যাকে ভূপৃষ্ঠ থেকে উপড়ে দূরে নিক্ষেপ করা হয়, যার কোন স্থায়িত্ব নেই৷ Wa masalu kalimatin khabeesatin kashajaratin khabee satinij tussat min fawqil ardi maa lahaa min qaraar (সূরা ইব্রাহিম আয়াত ২৬)
এটি কালেমা তাইয়েবার বিপরীত শব্দ৷ যদিও প্রতিটি সত্য বিরোধী ও মিথ্যা কথার ওপর এটি প্রযুক্ত হতে পারে তবুও এখানে এ থেকে এমন প্রতিটি বাতিল আকীদা বুঝায়, যার ভিত্তিতে মানুষ নিজের জীবন ব্যবস্থা গড়ে তোলে৷ এ বাতিল আকীদা নাস্তিক্যবাদ, নিরীশ্বরবাদ, ধর্মদ্রোহিতা, অবিশ্বাস শিরক, পৌত্তলিকতা অথবা এমন কোন চিন্তাধারাও হতে পারে যা নবীদের মাধ্যমে আসেনি৷
৩৮. অন্য কথায় এর অর্থ হলো, বাতিল আকীদা যেহেতু সত্য বিরোধী তাই প্রাকৃতিক আইন কোথাও তার সাথে সহযোগিতা করে না৷ বিশ্ব জগতের প্রতিটি অণুকণিকা তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে৷ পৃথিবী ও আকাশের প্রতিটি বস্তু তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়৷ জমিতে তার বীজ বপন করার চেষ্টা করলে জমি সবসময় তাকে উদগীরণ করার জন্য তৈরী থাকে৷ আকাশের দিকে তার শাখা প্রশাখা বেড়ে উঠতে থাকলে আকাশ তাদেরকে নিচের দিকে ঠেলে দেয়৷ পরীক্ষার খাতিরে মানুষকে যদি নির্বাচন করার স্বাধীনতা ও কর্মের অবকাশ না দেয়া হতো তাহলে এ অসতজাতের গাছটি কোথাও গজিয়ে উঠতে পারতো না৷ কিন্তু যেহেতু মহান আল্লাহ আদম সন্তানকে নিজের স্বাধীন ইচ্ছা ও প্রবণতা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দান করেছেন, তাই যেসব নির্বোধ লোক প্রাকৃতিক আইনের বিরুদ্ধে লড়ে এ গাছ লাগাবার চেষ্টা করে তাদের শক্তি প্রয়োগের ফলে জমি একে সামান্য কিছু জায়গা দিয়েও দেয়, বাতাস ও পানি থেকে সে কিছু না কিছু খাদ্য পেয়েই যায় এবং শূন্যও তার ডালপালা ছড়াবার জন্য অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু জায়গা তাকে দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়৷ কিন্তু যতদিন এ গাছ বেঁচে থাকে ততদিন তিতা, বিস্বাদ ও বিষাক্ত ফল দিতে থাকে এবং অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথেই আকস্মিক ঘটনাবলীর এক ধাক্কাই তাকে সমূলে উতপাটিত করে৷
পৃথিবীর ধর্মীয়, নৈতিক, চিন্তাগত ও তামাদ্দুনিক ইতিহাস অধ্যয়নকারী প্রত্যেক ব্যক্তিই কালেমায়ে তাইয়েবা তথা ভালো কথা এবং মন্দ কথার এ পার্থক্য সহজে অনুভব করতে পারে৷ সে দেখবে ইতিহাসের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত ভালো কথা একই থেকেছে৷ কিন্তু মন্দ কথা সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য৷ ভালো কথাকে কখনো শিকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলা যায়নি৷ কিন্তু মন্দ কথার তালিকা হাজারো মৃত কথার নামে ভরে আছে৷ এমনকি তাদের অনেকের অবস্থা হচ্ছে এই যে, আজ ইতিহাসের পাতা ছাড়া আর কোথাও তাদের নাম নিশানাও পাওয়া যায় না৷ স্ব স্ব যুগে যেসব কথার প্রচণ্ড দাপট ছিল আজ সে সব কথা উচ্চারিত হলে মানুষ এই ভেবে অবাক হয়ে যায় যে, একদিন এমন পর্যায়ের নির্বুদ্ধিতাও মানুষ করেছিল৷
তারপর ভালো কথাকে যখনই যে জাতি বা ব্যক্তি যেখানেই গ্রহণ করে সঠিক অর্থে প্রয়োগ করেছে সেখানেই তার সমগ্র পরিবেশ তার সুবাসে আমোদিত হয়েছে৷ তার বরকতে শুধুমাত্র সেই ব্যক্তি বা জাতিই সমৃদ্ধ হয়নি বরং তার আশপাশের জগতও সমৃদ্ধ হয়েছে৷ কিন্তু কোন মন্দ কথা যেখানেই ব্যক্তি বা সমাজ জীবনে শিকড় গেড়েছে সেখানেই তার দুর্গদ্ধে সমগ্র পরিবেশ পুতিগন্ধময় হয়ে উঠেছে এবং তার কাঁটার আঘাত থেকে তার মান্যকারীরা নিরাপদ থাকেনি এবং এমন কোন ব্যক্তিও নিরাপদ থাকতে পারেনি যে তার মুখোমুখি হয়েছে৷

রেফারেন্স ০২. ইসলামী শিক্ষা সিরিজ থেকেঃ ড. জামাল আল বাদাবী: পৃষ্ঠা ২৫৫

যৌন বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী কি ভারসাম্যপূরণ ও বাস্তব?


যৌন বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী কি ভারসাম্যপূরণ ও বাস্তব? 
যৌন বিষয়ে ইসলামী দৃষ্ভিঙ্গীর শ্রেষ্ঠত্ব অনুধাবন করতে গিয়ে এ বিষয়ে যে সব বাড়াবাড়ি করা হয়েছে তা লক্ষ্য করা উচিত। এর এক দিকে রয়েছে সেই দর্শনভিত্তিক নৈতিক ধ্বস যাতে বলা হয়েছে যা কিছু আনন্দদায়ক তাই নৈতিক। এই দর্শন যৌন বিষয়ে সকল বাধা ও রাখ-ঢাক বর্জন করতে বলে। ইসলাম এধরনের অবাধ যৌনাচারকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করে। অন্যান্য প্রত্যাদিষ্ট ধর্মগুলোও অবাধ যৌন স্বাধীনতার বিপক্ষে। অন্যদিকে আর একদল আছে যারা যে কোন যৌন আকাঙ্খাকেই অপবিত্র, নোংরা, মন্দ আর শয়তানী মনে করে। এরা বৈরাগ্য বা চির-কৌমার্য অবলম্বন করে। ইসলাম এদুটো চরম পন্থার বাইরে ভারসাম্যপূর্ণ বিধান দেয়। ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক যৌনাকাঙ্খাকে স্বীকৃতি দিয়ে তা পূরণের এমন ব্যবস্থা করে যাতে ব্যক্তির মধ্যে কোন অপরাধবোধ আসেনা। সাথে সাথে ইসলাম এমনভাবে মানুষের যৌনবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রন করে যাতে কোথাও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় না। যৌন অনাচার রোধে ও স্বাভাবিক পন্থায় যৌনাকাঙ্খা পূরণের লক্ষ্যে ইসলামে গৃহীত পদক্ষেপগুলো হলোঃ
১. বিবাহ বহির্ভূত সকল যৌনসম্পর্ক নিষিদ্ধ।
২. ব্যভিচার ও অবাধ যৌনাচার-এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
৩. আল্লাহ মানুষকে স্বাভাবিক যৌনাকাঙ্খা, সন্তান ও সম্পদ লাভের আকাঙ্খা দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। ইসলাম বৈধভাবে এসব আকাঙ্খা পূরণকে দূষণীয় বলে না। ইসলাম সব সময় পৃথিবীর জীবনের সাথে আখেরাতের প্রস্তুতিকে সংযুক্ত করতে বলে।
৪. আল কুরআন বলে যে মানুষের বিয়ে করার আকাঙ্খা বৈধ আর বাঞ্ছিত আকাঙ্খা ও উত্তম স্ত্রী পাওয়া হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে এক নিয়ামত।
৫. ইসলামে বৈরাগ্য আর চিরকৌমার্যের কোন স্বীকৃতি নেই।

রেফারেন্স: আল কুরআন থেকেঃ
১. যিনার কাছেও যেয়ো না, ওটা অত্যন্ত খারাপ কাজ এবং খুবই জঘন্য পথ৷ Wa laa taqrabuz zinaaa innahoo kaana faahishatanw wa saaa'a sabeelaa. –সূরা বণী ইসরাঈল আয়াত ৩২
এ হুকুম ব্যক্তির জন্য এবং সামগ্রিকভাবে সমগ্র সমাজের জন্যও ৷ ব্যক্তির জন্য এ হুকুমের মানে হচ্ছে, সে নিছক যিনার কাজ থেকে দূরে থেকেই ক্ষান্ত হবে না বরং এ পথের দিকে টেনে নিয়ে যায় যিনার এমন সব সূচনাকারী এবং প্রাথমিক উদ্যোগ ও আকর্ষণ সৃষ্টিকারী বিষয় থেকেও দূরে থাকবে ৷ আর সমাজের ব্যাপারে বলা যায়, এ হুকুমের প্রেক্ষিতে সমাজ জীবনে যিনা, যিনার উদ্যোগ আকর্ষণ এবং তার কারণসমূহের পথ বন্ধ করে দেয়া সমাজের জন্য ফরয় হয়ে যাবে৷ এ উদ্দেশ্যে সে আইন প্রণয়ন, শিক্ষা ও অনুশীলনদান, সামাজিক পরিবেশের সংস্কার সাধন, সমাজ জীবনের যথাযোগ্য বিন্যাস এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যবস্থা অবলম্বন করবে ৷

২. তারা আল্লাহ ছাড়া আর কোন উপাস্যকে ডাকে না, আল্লাহ যে প্রানকে হারাম করেছেন কোন সংগত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না৷ এসব যে-ই করে সে তার গোনাহের শাস্তি ভোগ করবে৷ Wallazeena laa yad'oona ma'al laahi ilaahan aakhara wa laa yaqtuloonan nafsal latee harramal laahu illaa bilhaqqi wa laa yaznoon; wa mai yaf'al zaalika yalqa asaamaa. -সূরা আল ফুরক্কান আয়াত ৬৮
সে সময়কার আরববাসীরা যে তিনটি বড় গোনাহের সাথে বেশী করে জড়িত থাকতো সেগুলো থেকে তারা দূরে থাকে৷ একটি হলো শির্ক, দ্বিতীয়টি অন্যায়ভাবে হত্যা করা এবং তৃতীয়টি যিনা৷ এ বিষয়বস্তুটিই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিপুল সংখ্যক হাদীসে বর্ণনা করেছেন৷ যেমন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণিত হাদীস৷ তাতে বলা হয়েছেঃ একবার নবীকে (সা) জিজ্ঞেস করা হলো, সবচেয়ে বড় গোনাহ কি? তিনি বললেন: "তুমি যদি কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দী দাঁড় করাও৷ অথচ আল্লাহই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন৷" জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর? বললেন: তুমি যদি তোমার সন্তানকে হত্যা কর এই ভয়ে যে সে তোমার সাথে আহারে অংশ নেবে৷" জিজ্ঞেস করা হলো, তারপর? বললেন: "তুমি যদি তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে যিনা কর৷" (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী, নাসাঈ, আহমদ) যদিও আরো অনেক কবীরা গোনাহ আছে কিন্তু সেকালের আরব সমাজে এ তিনটি গোনাহই সবচেয়ে বেশী জেঁকে বসেছিল৷ 

৩. কিয়ামতের দিন তাকে উপর্যুপরি শাস্তি দেয়া হবে এবং সেখানেই সে পড়ে থাকবে চিরকাল লাঞ্ছিত অবস্থায়৷  Yudaa'af lahul 'azaabu Yawmal Qiyaamati wa yakhlud feehee muhaanaa. -সূরা আল ফুরক্কান আয়াত ৬৯
৪. তবে তারা ছাড়া যারা (ঐসব গোনাহের পর) তাওবা করেছে এবং ইমান এনে সতকাজ করতে থেকেছে৷ এ ধরনের লোকদের মন্দ কাজগুলোকে আল্লাহ ভালো কাজের দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন এবং আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল ও মেহেরবান৷ Illaa man taaba wa 'aamana wa 'amila 'amalan saalihan fa ulaaa'ika yubad dilul laahu saiyi aatihim hasanaat; wa kaanal laahu Ghafoorar Raheemaa.  -সূরা আল ফুরক্কান আয়াত ৭০
৫.  মানুষের জন্য নারী, সন্তান, সোনারুপার স্তূপ, সেরা ঘোড়া, গবাদী পশু ও কৃষি ক্ষেতের প্রতি আসক্তিকে বড়ই সুসজ্জিত ও সুশোভিত করা হয়েছে৷ কিন্তু এগুলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামগ্রী মাত্র৷ প্রকৃতপক্ষে উত্তম আবাস তো রয়েছে আল্লাহর কাছে৷ Zuyyina linnaasi hubbush shahawaati minannisaaa'i wal baneena walqanaateeril muqantarati minaz zahabi walfiddati walkhailil musawwamati wal an'aami walhars; zaalika mataa'ul hayaatid dunyaa wallaahu 'indahoo husnul ma-aab. –সূরা আলে ইমরান আয়াত ১৪

বলো, আমি কি তোমাদের জানিয়ে দেবো, ওগুলোর চাইতে ভালো জিনিস কি? যারা তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করে তাদের জন্য তাদের রবের কাছে রয়েছে বাগান, তার নিম্নদেশে ঝরণাধারা প্রবাহিত হয়৷ সেখানে তারা চিরন্তন জীবন লাভ করবে৷ পবিত্র স্ত্রীরা হবে তাদের সংগিনী এবং তারা লাভ করবে আল্লাহর সন্তুষ্টি ৷ আল্লাহ তার বান্দাদের কর্মনীতির ওপর গভীর ও প্রখর দৃষ্টি রাখেন ৷ Qul a'unabbi 'ukum bikhairim min zaalikum; lillazeenat taqaw 'inda Rabbihim jannaatun tajree min tahtihal anhaaru khaalideena feehaa wa azwaajum mutahharatunw wa ridwaanum minal laah; wallaahu baseerum bil'ibaad. –সূরা আলে ইমরান আয়াত ১৪

৬. আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই জাতি থেকে সৃষ্টি করেছেন স্ত্রীগণকে, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন৷ অবশ্যই এর মধ্যে বহু নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য যারা চিন্তা-ভাবনা করে৷ Wa min Aayaatiheee an khalaqa lakum min anfusikum azwaajal litaskunooo ilaihaa wa ja'ala bainakum mawad datanw wa rahmah; inna fee zaalika la Aayaatil liqawminy yatafakkaroon. সূরা আর রুম আয়াত ২১
স্রষ্টার প্রজ্ঞার পূর্ণতা হচ্ছে এই যে, তিনি মানুষকে শুধুমাত্র একটি জাতি (sexes) সৃষ্টি করেননি বরং তাকে দুটি জাতির আকারে সৃষ্টি করেছেন৷ মানবিকতাঁর দিক দিয়ে তারা একই পর্যায়ভুক্ত৷ তাদের সৃষ্টির মূল ফর্মুলাও এক৷ কিন্তু তারা উভয়ই পরস্পর থেকে ভিন্ন শারীরিক আকৃতি, মানসিক ও আত্মিক গুণাবলী এবং আবেগ- অনুভূতি ও উদ্যোগ নিয়ে জন্মলাভ করে৷ আবার তাদের মধ্যে এমন বিস্ময়কর সম্বন্ধ ও সামঞ্জস্য সৃষ্টি করে দেয়া হয়েছে যার ফলে তারা প্রত্যেকে পুরোপুরি অন্যের জোড়ায় পরিণত হয়েছে৷ প্রত্যেকের শরীর এবং প্রবৃত্তি ও উদ্যোগসমূহ অন্যের শারীরিক ও প্রবৃত্তির দাবীসমূহের পরিপূর্ণ জবাব৷ এ ছাড়াও সেই প্রাজ্ঞ স্রষ্টা ও উভয় জাতির লোকদেরকে সৃষ্টির সূচনা থেকেই বরাবর ও আনুপাতিক হারে সৃষ্টি করে চলবেন৷ আজ পর্যন্ত কখনো দুনিয়ার কোন জাতির মধ্যে বা কোন এলাকায় কেবলমাত্র পুত্র সন্তানই জন্মলাভ করে চলছে এমন কথাও শোনা যায় নি৷ এটা এমন একটা জিনিস যার মধ্যে কোন মানুষের হস্তক্ষেপ বা বুদ্ধি- কৌশল প্রয়োগের সামান্যতম অবকাশই নেই৷ মানুষ এ ব্যাপারে সামান্যতমও প্রভাব বিস্তার করতে পারে না যে, মেয়েরা অনবরত এমনি মেয়েলী বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মলাভ করতে থাকবে এবং ছেলেরা অনবরত এমন পুরুষালী বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্মলাভ করতে থাকবে যা তাদের পরস্পরকে যথার্থ জোড়ায় পরিণত করবে৷ আর নারী ও পুরুষের জন্ম এমনি ধারাবাহিকভাবে একটি আনুপাতিক হারে হয়ে যেতে থাকবে, এ ব্যাপারে প্রভাব বিস্তার করার কোন মাধ্যম তাঁর নেই৷ হাজার হাজার বছর থেকে কোটি কোটি মানুষের জন্মলাভ এ কৌশল ও ব্যবস্থার এমনই সুসামঞ্জস্য পদ্ধতিতে কার্যকর থাকা কখনো নিছক আকস্মিক ঘটনা হতে পারে না আবার বহু ইলাহর সম্মিলিত ব্যবস্থাপনার ফলও এটা নয়৷ এ জিনিসটি সুস্পষ্টভাবে একথা প্রমাণ করে যে, একজন বিজ্ঞানী আর শুধুমাত্র একজন মহা বিজ্ঞানী স্রষ্টাই তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞান ও শক্তির মাধ্যমে শুরুতে পুরুষ ও নারীর একটি সর্বাধিক উপযোগী ডিজাইন তৈরি করেন৷ তাঁরপর তিনি এ ডিজাইন অনুযায়ী অসংখ্য পুরুষ ও অসংখ্য নারীর তাদের পৃথক ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য সহকারে সারা দুনিয়ায় একটি আনুপাতিক হারে জন্মলাভ করার ব্যবস্থা করেন৷ 
এটা কোন অপরিকল্পিত ব্যবস্থা নয়৷ বরং স্রষ্টা নিজেই পরিকল্পিতভাবে এ ব্যবস্থা করেছেন যার ফলে পুরুষ তাঁর প্রাকৃতিক দাবী নারীর কাছে এবং নারী তাঁর প্রাকৃতিক চাহিদা পুরুষের কাছে লাভ করবে এবং তারা উভয়ে পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত থেকেই প্রশান্তি ও সুখ লাভ করবে৷ এ বিজ্ঞানময় ব্যবস্থাপনাকে স্রষ্টা একদিকে মানব বংশধারা অব্যাহত থাকার এবং অন্যদিকে মানবিক সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে অস্তিত্ব দান করার মাধ্যমে পরিণত করেছেন৷ যদি এ দুটি জাতিকে নিছক দুটি পৃথক ডিজাইনে তৈরি করা হতো এবং তাদের মধ্যে এমন অস্থিরতা সৃষ্টি না করা হতো, যা তাদের পারস্পরিক সংযোগ ও সম্পর্ক ছাড়া প্রশান্তিতে পরিণত হতে পারতো না, তাহলে সম্ভবত ছাগল ভেড়ার মতো মানুষের বংশধারাও এগিয়ে যেতো কিন্তু তাদের সাহায্যে কোন সভ্যতা ও সংস্কৃতির অস্তিত্ব লাভ করার কোন সম্ভাবনাই থাকতো না৷ স্রষ্টা নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সাহায্যে পুরুষ ও নারীর জন্য এমন পরস্পরের চাহিদা, তৃষ্ণা ও অস্থিরতাঁর অবস্থা সৃষ্টি করে রেখেছেন যার ফলে তারা উভয়ে মিলে একসাথে না থাকলে শান্তি ও সুখ লাভ করতে পারে না৷ সমগ্র প্রাণীজগতের বিপরীতে মানব জাতির মধ্যে এটিই হচ্ছে সভ্যতা ও সংস্কৃতির উন্মেষ ও বিকাশ লাভের মৌলিক কারণ৷ এ শান্তির অন্বেষায় তাদেরকে একত্রে ঘর বাঁধতে বাধ্য করে৷ এরি বদৌলতে পরিবার ও গোত্র অস্তিত্ব লাভ করে৷ এর ফলে মানুষের জীবনে সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটে৷ এ বিকাশে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা অবশ্যই সহায়ক হয়েছে৷কিন্তু তা তাঁর আসল উদ্যোক্তা নয়৷ আসল উদ্যোক্তা হচ্ছে এ অস্থিরতা, যাকে পুরুষ ও নারীর অস্তিত্বের মধ্যে সংস্থাপিত করে তাদেরকে 'ঘর' বাঁধতে বাধ্য করা হয়েছে৷ কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি এ কথা ভাবতে পারেন যে, এ বিপুল প্রজ্ঞা প্রকৃতির অন্ধ শক্তিসমূহ থেকে হঠাত এমনিই সৃষ্টি হয়ে গেছে ? অথবা বহু সংখ্যক ইলাহ কি এমনি ধরনের একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারতো, যার ফলে তারা এ গভীর জ্ঞানময় উদ্দেশ্য সামনে রেখে হাজার হাজার বছর থেকে অনবরত অসংখ্য পুরুষ ও নারীকে এ বিশেষ অস্থিরতা সহকারে সৃষ্টি করে যেতে থাকতো? এ তো একজন জ্ঞানীর এবং মাত্র একজন জ্ঞানীরই প্রজ্ঞার সুস্পষ্ট নিদর্শন৷ কেবলমাত্র বুদ্ধিভ্রষ্ট ব্যক্তিই এটি দেখতে অস্বীকার করতে পারে৷ 
ভালোবাসা বলতে এখানে কামশক্তি ভালোবাসার (sexual love) কথা বলা হয়েছে ৷ নারী ও পুরুষের মধ্যে এটি আকর্ষণের প্রাথমিক উদ্যোক্তায় পরিণত হয়৷ তাঁরপর তাদেরকে পরস্পরের সাথে সংলগ্ন করে রাখে৷ আর 'রহমত' তথা দয়া মানে হচ্ছে এমন একটি আত্মিক সম্পর্ক, যা স্বামী- স্ত্রীর জীবনে পর্যায়ক্রমে বিকাশ লাভ করে৷ এর বদৌলতে তারা দু'জনে দু'জনার কল্যাণকাংখী, দু'জনের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং উভয়ের সুখে দুঃখে শরীক হয়ে যায়৷ এমনকি এমন এক সময় আসে যখন কামসিক্ত ভালোবাসা পিছনে পড়ে থাকে এবং বার্ধক্যে এ জীবনসাথী যৌবনকালের চাইতে অনেক বেশি অগ্রসর হয়ে পরস্পরের জন্য দয়া, স্নেহ ও মমতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে থাকে৷ মানুষের মধ্যে শুরুতেই যে অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল তাকে সাহায্য করার জন্য স্রষ্টা মানুষের মধ্যে এ দুটি ইতিবাচক শক্তি সৃষ্টি করে দেন৷ এ অস্থিরতা তো শুধুমাত্র শান্তির প্রত্যাশী এবং এর সন্ধানে সে নারী ও পুরুষকে পরস্পরের দিকে নিয়ে যায়৷ এরপর এ দুটি শক্তি অগ্রসর হয়ে তাদের মধ্যে স্থায়ী বন্ধুত্বের এমন একটি সম্পর্ক জুড়ে দেয় যা দুটি পৃথক পরিবেশে লালিত আগন্তুকদেরকে একসাথে মিলিয়ে গভীরভাবে সংযুক্ত করে দেয়৷ এ সংযোগের ফলে সারা জীবনে তারা মাঝ দরিয়ায় নিজেদের নৌকা একসাথে চালাতে থাকে৷ একথা সুস্পষ্ট, কোটি কোটি মানুষ তাদের জীবনে এই যে ভালোবাসা ও দয়ার অভিজ্ঞতা লাভ করছে এগুলো কোন নিরেট বস্তু নয়৷ এগুলোকে ওজন ও পরিমাপ করা যেতে পারে না৷ মানুষের শারীরিক গঠনে যেসব উপাদানের সমাবেশ ঘটানো হয়েছে তাদের মধ্যে কোথাও এদের উতস চিহ্নিত করা যেতে পারে না৷ কোন ল্যাবরেটরীতেও এদের জন্ম ও বিকাশ সাধনের কারণসমূহ অনুসন্ধান করা যেতে পারে না৷ এ ছাড়া এর আর কোন ব্যাখ্যাই করা যেতে পারে না যে, একজন প্রাজ্ঞ স্রষ্টা স্বেচ্ছাকৃতভাবে একটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে পূর্ণ সামঞ্জস্য সহকারে মানুষের মধ্যে তা সংস্থাপন করে দিয়েছেন৷ 

রেফারেন্স: আল হাদীস থেকেঃ
একটি হাদসে রাসুল (সা.) বলেন, যখন স্বামী-স্ত্রী দাম্পত্য মিলন করে তখন উভয়ই আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কৃত হয়ে থাকে। একথা শুনে সাহাবারা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন যে, কিভাবে মানুষ এমন কাজ থেকে পুরস্কৃত হতে পারে যা তারা নিজেরা নেহায়েত নিজেদের আনন্দের জন্যই করেছে। উত্তরে রাসুল (সা.) বলেন একই কাজ তারা যদি বিবাহ বন্ধন ছাড়া করতো তবে তারা শাস্তি পেত। আর এখন আল্লাহর বিধান মেনে আনন্দ করার জন্য তারা পুরস্কৃত হবে।
যখন একদল সাহাবী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তারা বিয়ে করবে না এবং আজীবন নামায ও রোজা করে কাটাবে। রাসুল (সা.) এখবর পাবার পর সাহাবীর দলকে কঠোরভাবে তিরষ্কার করেন। তিনি বলেন, তোমাদের চাইতেও আমি আল্লাহর কাছে। আর তবুও আমি রাতে নামায পড়ি আবার বিশ্রামও করি। আমি রোজা রাখি আবার খাই। আমি বিবাহিত। তোমাদের মাঝে যে কেউ আমার পথ থেকে বিচ্যুত হবে সে আমার কেউ নয়!                

রেফারেন্স: ইসলামী শিক্ষা সিরিজ থেকেঃ ড. জামাল আল বাদাবী: পৃষ্ঠা ২০৩

Friday, March 9, 2018

আল কুরআনের আলোকে রোগ-ব্যাধি ও নিরাময়


আল কুরআনের আলোকে রোগ-ব্যাধি ও নিরাময়
১. হে লোকেরা! তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে নসীহত এসে গেছে৷ এটি এমন জিনিস যা অন্তরের রোগের নিরাময় এবং যে তা গ্রহণ করে নেয় তার জন্য পথনির্দেশনা ও রহমত৷(সূরা ইউনূস আয়াত ৫৭) 
Yaaa aiyuhan naasu qad jaaa'atkum maw 'izatum mir Rabbikum wa shifaaa'ul limaa fis sudoori wa hudanw wa rahmatul lilmu'mineen

২. আমি এ কুরআনের অবতরণ প্রক্রিয়ায় এমন সব বিষয় অবতীর্ণ করছি যা মুমিনদের জন্য নিরাময় ও রহমত এবং জালেমদের জন্য ক্ষতি ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করে না৷(সূরা বণী ইসরাঈল আয়াত ৮২)
অর্থাত যারা এ কুরআনকে নিজেদের পথপ্রদর্শক এবং নিজেদের জন্য আইনের কিতাব বলে মেনে নেয়, তাদের জন্য তো এটি আল্লাহর রহমত এবং তাদের যাবতীয় মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক নৈতিক ও তামাদ্দুনিক রোগের নিরাময় ৷ কিন্তু যেসব জালেম একে প্রত্যাখ্যান করে এবং এর পথনির্দেশনা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করে এ কুরআন তাদেরকে এর নাযিল হবার বা একে জানার আগে তারা যে অবস্থায় ছিল তার ওপরও টিকে থাকতে দেয় না ৷ বরং তাদেরকে আরো বেশী ক্ষতির মধ্যে ঠেলে দেয় ৷ এর কারণ, যতদিন কুরআন আসেনি অথবা যতদিন তারা কুরআনের সাথে পরিচিত হয়নি ততদিন তাদের ক্ষতি ছিল নিছক মূর্খতা ও অজ্ঞতার ক্ষতি ৷
কিন্তু যখন কুরআন তাদের সামনে এসে গেলো এবং সে হক ও বাতিলের পার্থক্য সুস্পষ্ট করে দেখিয়ে দিল তখন তাদের ওপর আল্লাহর দাবী অকাট্যভাবে সঠিক প্রমাণিত হয়ে গেলো ৷ এখন যদি তারা তাকে প্রত্যাখ্যান করে গোমরাহীর ওপর অবিচল থাকার জন্য জোর দেয় ৷ তাহলে এর অর্থ হয় তারা অজ্ঞ নয় বরং জালেম ও বাতিল পন্থী এবং সত্যের প্রতি বিরূপ ৷ এখন তাদের অবস্থা হবে এমন ব্যক্তির মতো যে বিষ ও বিষের প্রতিশেধক উভয়টি দেখে বিষকে বেছে নেয় ৷ নিজেদের গোমরাহী ও ভ্রষ্টতার জন্য এখন তারা নিজেরাই হয় পুরোপুরি দায়ী এবং এরপর তারা যে কোন পাপ করে তার পূর্ণ শাস্তির অধিকারীও তারাই হয় ৷ এটি অজ্ঞতার নয় বরং জেনে শুনে দুষ্টামি ও দুষ্কৃতিতে লিপ্ত হওয়ার ক্ষতি এবং অজ্ঞতার ক্ষতির চাইতে এর পরিমাণ বেশী হওয়া উচিত ৷ একথাটিই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি ছোট তাতপর্যবহ বাক্যের মধ্যে বর্ণনা করেছেন ৷
Wa nunazzilu minal quraani maa huwa shifaaa'unw wa rahmatul lilmu;mineena wa laa yazeeduz zaalimeena illaa khasaaraa

৩. এবং রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে রোগমুক্ত করেন৷(সূরা আশ শুয়ারা আয়াত ৮০)
একমাত্র আল্লাহর বন্দেগী করার স্বপক্ষে এটি হচ্ছে দ্বিতীয় যুক্তি(প্রথম যুক্তি হলো যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তিনিই আমাকে পথ দেখিয়েছেন৷)৷ যদি তিনি মানুষকে কেবল সৃষ্টি করেই ছেড়ে দিতেন এবং সামনের দিকে তার দুনিয়ার জীবন যাপনের সাথে কোন প্রকার সম্পর্ক না রাখতেন তাহলেও মানুষের তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কারো সহায়তা চাওয়ার কোন যুক্তিসংগত কারণ থাকতো৷ কিন্তু তিনি তো সৃষ্টি করার সাথে সাথে পথনির্দেশনা, প্রতিপালন, দেখাশুনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজন পূর্ণ করার দায়িত্ব নিজেই নিয়েছেন৷ যে মুহূর্তে মানুষ দুনিয়ায় পদার্পণ করে তখনই তার মায়ের বুকে দুধের ধারা সৃষ্টি হয়৷ অন্যদিকে কোন অদৃশ্য শক্তি তাকে স্তন চোষার ও গলা দিয়ে দুধ নিচের দিকে নামিয়ে নেবার কায়দা শিখিয়ে দেয়৷ তারপর এ প্রতিপালন, প্রশিক্ষণ ও পথ প্রদর্শনের কাজ প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বরাবর চালু থাকে৷ জীবনের প্রতি পর্যায়ে মানুষের নিজের অস্তিত্ব, বিকাশ , উন্নয়ন ও স্থায়ীত্বের জন্য যেসব ধরনের সাজ-সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় তা সবই তার স্রষ্ট পৃথিবী থেকে আকাশ পর্যন্ত সর্বত্রই সঠিকভাবে যোগান দিয়ে রেখেছেন৷ এ সাজ-সরঞ্জাম থেকে লাভবান হবার এবং একে কাজে লাগাবার জন্য তার যে ধরনের শক্তি ও যোগ্যতার প্রয়োজন তা সবও তার আপন সত্তায় সমাহিত রাখা হয়েছে৷ জীবনের প্রতিটি বিভাগে তার যে ধরনের পথনির্দেশনার প্রয়োজন হয় তা দেবার পূর্ণ ব্যবস্থাও তিনি করে রেখেছেন৷ এর সংগে তিনি মানবিক অস্তিত্বের সংরক্ষণের এবং তাকে বিপদ-আপদ, রোগ-শোক , ধ্বংসকর জীবাণু ও বিষাক্ত প্রভাব থেকে রক্ষা করার জন্য তার নিজের শরীরের মধ্যে এমন শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন মানুষের জ্ঞান এখনো যার পুরোপুরি সন্ধান লাভ করতে পারেনি৷ আল্লাহর এ শক্তিশালী প্রাকৃতিক ব্যবস্থা যদি না থাকতো, তাহলে সামান্য একটি কাঁটা শরীরের কোন অংশে ফুটে যাওয়াও মানুষের জন্য ধ্বংসকর প্রমাণিত হতো এবং নিজের চিকিতসার জন্য মানুষের কোন প্রচেষ্টাই সফল হতো না৷ স্রষ্টার এ সর্বব্যাপী অনুগ্রহ ও প্রতিপালন কর্মকাণ্ড যখন প্রতি মুহূর্তে সকল দিক থেকে মানুষকে সাহায্য করছে তখন মানুষ তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোন সত্তার সামনে মাথা নত করবে এবং প্রয়োজন পূরণ ও সংকট উত্তরণের জন্য অন্য কারো আশ্রয় গ্রহণ করবে, এর চেয়ে বড় মূর্খতা ও বোকামী এবং এর চেয়ে বড় অকৃতজ্ঞতা আর কি হতে পারে ?
Wa izaa mardtu fahuwa yashfeen

৪. এদের বলো, এ কুরআন মু’মিনদের জন্য হিদায়াত ও রোগ মুক্তি বটে৷ কিন্তু যারা ঈমান আনে না এটা তাদের জন্য পর্দা ও চোখের আবরণ৷ তাদের অবস্থা হচ্ছে এমন যেন দূর থেকে তাদেরকে ডাকা হচ্ছে৷ (সূরা হামীম আস্ সাজদা আয়াত ৪৪)

অর্থাত দূর থেকে যখন কাউকে ডাকা হয় তখন তার কানে একটা আওয়াজ প্রবেশ করে ঠিকই তবে আওয়াজ দাতা কি বলছে তা সে বুঝতে পারে না৷ এটা এমন একটা নজির বিহীন উপমা যার মাধ্যমে হঠকারী বিরোধীদের পুরো মনস্তাত্ত্বিক চিত্র চোখের সামনে ফুটে ওঠে৷ বিদ্বেষ বা পক্ষপাত দোষ মুক্ত লোকের সামনে যদি আপনি কথা বলেন, তাহলে সে তা শোনে, বুঝার চেষ্ট করে এবং যুক্তিসংগত কথা হলে খোলা মনে তা গ্রহণ করে৷ এটাই স্বভাবিক৷ পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আপনার বিরুদ্ধে শুধু বিদ্বেষই পোষণ করেনা, বরং শত্রুতাও পোষণ করে তাকে আপনি আপনার কথা যতই বুঝাতে চেষ্টা করবেন সে আদৌ সে কথার প্রতি মনোযোগী হবে না৷ আপনার সব কথা শোনার পরও এত সময় ধরে আপনি তাকে কি বললেন তা সে বুঝবে না৷ আপনিও মনে করবেন যেন আপনার কথা তার কানের পর্দায় ধাক্কা খেয়ে বাইরে দিয়েই চলে গেছে, মন ও মগজে প্রবেশ করার মত কোন রাস্তাই খুঁজে পায়নি৷ 
qul huwa lillazeena aamanoo hudanw wa shifaaa'unw wallazeena la yu'minoona feee aazaanihim waqrunw wa huwa 'alaihim 'amaa; ulaaa'ika yunaadawna mim maakaanim ba'eed

৫. আমরা রোগাক্রান্ত হই। আমরা রোগের চিকিতসার জন্য চিকিতসকের দ্বারস্থ হই ও চিকিতসা করি। আল্লাহর রহমতে আমরা রোগমুক্ত হই। মূলত: আল্লাহ পাক হচ্ছেন আমাদের রোগনিরাময়কারী। মহান আল্লাহপাক সকল রোগ নিরাময়ের ব্যবস্থা করে রেখেছেন।
‘তিনি মুমিনদের অন্তরের রোগ নিরাময়কারী’ (সূরা তওবা: আয়াত ১৪) ।
Qaatiloohum yu'az zibhumul laahu bi aideekum wa yukhzihim wa yansurkum 'alaihim wa yashfi sudoora qawmim mu 'mineen

৬. ‘উহার উদর হতে নির্গত হয় বিবিধ বর্ণের পানীয় যাতে মানুষের জন্য রয়েছে আরোগ্য’ (সূরা নাহল: আয়াত ৬৯) ।
yakhruju mim butoonihaa sharaabum mukh talifun alwaanuhoo feehi shifaaa'ul linnaas,
৭. রোগ মুমিনের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিভিন্ন প্রকার রোগের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। আল্লাহ বলেন: “আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব ভয়-ভীতি, ক্ষুধা, জান-মাল ও ফসলের স্বল্পতা দ্বারা, (হে রাসূল!) তুমি ধৈর্য্যশীলদের সুসংবাদ দাও।” (সূরা আল-বাকারাহ: ১৫৫)
Wa lanablu wannakum bishai'im minal khawfi waljoo'i wa naqsim minal amwaali wal anfusi was samaraat; wa bashshiris saabireen

০৮.  আর (এ একই বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞান) আমি আইয়ুবকে দিয়েছিলাম৷  স্মরণ করো, যখন সে তার রবকে ডাকলো, “আমি রোগগ্রস্ত হয়ে গেছি এবং তুমি করুণাকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ করুণাকারী৷” (সূরা আল আম্বিয়া আয়াত ৮৩)
Rabbahooo annee massaniyad durru wa Anta arhamur raahimeen
দোয়ার ধরন অত্যন্ত পবিত্র, সূক্ষ্ম ও নমনীয়! সংক্ষিপ্ত বাক্যের সাধ্যমে নিজের কষ্টের কথা বলে যাচ্ছেন এবং এরপর একথা বলেই থেমে যাচ্ছেন- "তুমি করুণাকারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ৷" পরে কেন অভিযোগ ও নালিশ নেই, কোন জিনিসের দাবী নেই৷ দোয়ার এই ভংগিমা যে উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন চিত্রটি তুলে ধরে তা হচ্ছে এই যে, কোন পরম ধৈর্যশীল, অল্পে তুষ্ট, ভদ্র ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি দিনের পর দিন অনাহার ক্লিষ্টতার দুঃসহ জ্বালায় ব্যাকুল হয়ে কোন পরমদাতা ও দয়ালু ব্যক্তির সামনে কেবলমাত্র এতটুকু বলেই ক্ষান্ত হয়ে যায়, "আমি অনাহারে আছি এবং আপনি বড়ই দানশীল৷" এরপর সে আর মুখে কিছুই উচ্চারণ করতে পারে না৷
০৯. আমি তার দোয়া কবুল করেছিলাম, তার যে কষ্ট ছিল তার দূর করে দিয়েছিলাম।-(সূরা আল আম্বিয়া আয়াত ৮৪)
Fastajabnaa lahoo fakashaf naa maa bihee min durrinw wa aatainaahu ahlahoo wa mislahum ma'ahum rahmatam min 'indinaa wa zikraa lil'aabideen

সম্ভবত: হযরত আইয়ূব কোন কঠিন চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বাইবেলও একথাই বলে যে, তাঁর সারা শরীর ফোঁড়ায় ভরে গিয়েছিল। এ রোগে আক্রান্ত হবার পর হযরত আইয়ূবের স্ত্রী ছাড়া আর সবাই তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করেছিল, এমন কি সন্তানরাও তাঁর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
রোগের প্রচণ্ডতা, ধন-সম্পদের বিনাশ এবং আত্মীয়-স্বজনদের মুখ ফিরিয়ে নেবার কারণে তিনি যে কষ্ট ও যন্ত্রণার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন তার চেয়ে বড় কষ্ট ও যন্ত্রণা ছিল এই জন্য এই যে, শয়তান তার প্ররোচনার মাধ্যমে তাঁকে বিপদগ্রস্ত করছে। এ অবস্থায় শয়তান, আইয়ূব (আ.)কে মহান রব থেকে হতাশ করার চেষ্টা করে, মহান রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ করাতে চায় এবং তিনি যাতে অধৈর্য্য হয়ে উঠেন সে প্রচেষ্টায় রত থাকে। কিন্তু আইয়ূব আ. শয়তানের প্ররোচনার ফাঁদে পা দেন নি। তিনি নিজের শারীরিক কষ্টের কোন অভিযোগ করেন নি। অবৈধ বা শির্কের পথে পা বাড়াননি।
এখনও শয়তান আমাদের অনেকের জীবনের অসুস্থতা বা বিপদের সুযোগ নিয়ে শির্কের পথে (মাজার, অবৈধ পীর বা তাবিজ, শরীয়ত বিরোধী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে) সহজে নিয়ে যেতে প্রচেষ্টা চালায়। অনেক মুসলিম ভাই বোনেরা অজ্ঞতার কারনে বা অধৈর্যের বশবর্তী হয়ে শয়তানের ফাঁদে পা বাড়িয়ে ফেলেন। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।