Monday, October 1, 2018

যাদের ওপর গযব পড়েনি এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়নি


যাদের ওপর গযব পড়েনি এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়নি ৷
-সূরা ফাতিহা, আয়াত ০৭
ghayril-maghdoobi 'alaihim wa lad-daaalleen
'অনুগ্রহ' লাভকারী হিসাবে আমরা এমন সব লোককে চিহ্নিত করিনি যারা আপাতদৃষ্টিতে সাময়িকভাবে তোমার পার্থিব অনুগ্রহ লাভ করে থাকে ঠিকই কিন্তু আসলে তারা হয় তোমার গযব ও শাস্তির অধিকারী এবং এভাবে তারা নিজেদের সাফল্য ও সৌভাগ্যের পথ হারিয়ে ফেলে৷ এ নেতিবাচক ব্যাখ্যায় একথা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, 'অনুগ্রহ' বলতে আমরা যথার্থ ও স্থায়ী অনুগ্রহ বুঝাচ্ছি, যা আসলে সঠিক পথে চলা ও আল্লাহর সন্তোষ লাভের ফলে অর্জিত হয়৷ এমন কোন সাময়িক ও লোক দেখানো অনুগ্রহ নয়, যা ইতিপূর্বে ফেরাউন, নমরূদ ও কারূনরা লাভ করেছিল এবং আজো আমাদের চোখের সামনে বড় বড় যালেম, দুস্কৃতিকারী ও পথভ্রষ্টরা যেগুলো লাভ করে চলেছে ৷ 

তাদের পথ যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ


তাদের পথ যাদের প্রতি তুমি অনুগ্রহ করেছ
-সূরা ফাতিহা, আয়াত ০৬
Siraatal-lazeena an'amta 'alaihim
মহান আল্লাহর কাছ থেকে আমরা যে সোজা পথটির জ্ঞান লাভ করতে চাচ্ছি এটা হচ্ছে তার পরিচয় ৷অর্থাত এমন পথ যার ওপর সবসময় তোমার প্রিয়জনেরা চলেছেন৷ সেই নির্ভুল রাজপথটি অতি প্রাচীনকাল থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত যে ব্যক্তি ও যে দলটিই তার ওপর চলেছে সে তোমার অনুগ্রহ লাভ করেছে এবং তোমার দানে তার জীবন পাত্র পরিপূর্ণ হয়েছে৷

তুমি আমাদের সোজা পথ দেখাও


তুমি আমাদের সোজা পথ দেখাও
-সূরা ফাতিহা, আয়াত ০৫
Ihdinas-Siraatal-Mustaqeem
অর্থাত জীবনের প্রত্যেকটি শাখা প্রশাখায় এবং প্রত্যেকটি বিভাগে, চিন্তা, কর্ম ও আচরণের এমন বিধি-ব্যবস্থা আমাদের শেখাও, যা হবে একেবারেই নির্ভুল, যেখানে ভুল দেখা, ভুল কাজ করা ও অশুভ পরিণামের আশংকা নেই, যে পথে চলে আমরা সাফল্য ও সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারি৷ কুরআন অধ্যয়নের প্রাক্কালে বান্দা তার প্রভু, মালিক, আল্লাহর কাছে এই আবেদনটি পেশ করে ৷ বান্দা আর্জি পেশ করে, হে আল্লাহ! তুমি আমাদের পথ দেখাও৷ কল্পিত দর্শনের গোলকধাঁধার মধ্য থেকে যথার্থ সত্যকে উন্মুক্ত করে আমাদের সামনে তুলে ধর৷ বিভিন্ন নৈতিক চিন্তা-দর্শনের মধ্য থেকে যথার্থ ও নির্ভুল নৈতিক চিন্তা-দর্শন আমাদের সামনে উপস্থাপিত কর৷ জীবনের অসংখ্য পথের মধ্য থেকে চিন্তা ও কর্মের, সরল ও সুস্পষ্ট রাজপথটি আমাদের দেখাও৷ 

আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদাত করি এবং একমাত্র তোমারই কাছে সাহায্য চাই


আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদাত করি এবং একমাত্র তোমারই কাছে সাহায্য চাই -সূরা ফাতিহা, আয়াত ০৪
Iyyaaka na'budu wa lyyaaka nasta'een

ইবাদাত শব্দটিও আরবী ভাষায় তিনটি অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে৷
(১) পূজা ও উপাসনা করা,
(২)আনুগত্য ও হুকুম মেনে চলা এবং
৩) বন্দেগী ও দাসত্ব করা৷
এখানে একই সাথে এই তিনটি অর্থই প্রকাশিত হয়েছে৷
অর্থাত আমরা তোমার পূজা-উপাসনা করি, তোমার আনুগত্য করি এবং তোমার বন্দেগী ও দাসত্বও করি৷ আর আমরা তোমার সাথে এ সম্পর্কগুলো রাখি কেবল এখানেই কথা শেষ নয় বরং এ সম্পর্কগুলো আমরা একমাত্র তোমারই সাথে রাখি৷ এই তিনটি অর্থের মধ্যে কোন একটি অর্থেও অন্য কেউ আমাদের মাবুদ নয়৷ 

যিনি পরম দয়ালু ও করুণাময়


যিনি পরম দয়ালু ও করুণাময় -সূরা ফাতিহা, আয়াত ০২
Ar-Rahmaanir-Raheem
মানুষের দৃষ্টিতে কোন জিনিস খুব বেশী বলে প্রতীয়মান হলে সেজন্য সে এমন শব্দ ব্যবহার করে যার মাধ্যমে আধিক্যের প্রকাশ ঘটে৷ আর একটি আধিক্যবোধক শব্দ বলার পর যখন সে অনুভব করে যে ঐ শব্দটির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট জিনিসটির আধিক্যের প্রকাশ করা সন্ভব হয়নি তখন সে সেই একই অর্থে আর একটি শব্দ ব্যবহার করে৷ এভাবে শব্দটির অন্তর্নিহিত গুণের আধিক্য প্রকাশের ব্যাপারে যে কমতি রয়েছে বলে সে মনে করছে তা পূরণ করে৷ আল্লাহর প্রশংসায় 'রহমান' শব্দের পরে আবার 'রহীম' বলার মধ্যেও এই একই নিগূঢ় তত্ত্ব নিহিত রয়েছে৷ আরবী ভাষায় 'রহমান' একটি বিপুল আধিক্যবোধক শব্দ৷ কিন্তু সৃষ্টির প্রতি আল্লাহর রহমত ও মেহেরবানী এত বেশী ও ব্যাপক এবং এত সীমাসংখ্যাহীন যে, তা বয়ান করার জন্য সবচেয়ে বেশী ও বড় আধিক্যবোধক শব্দ ব্যবহার করার পরও মন ভরে না৷ তাই তার আধিক্য প্রকাশের হক আদায় করার জন্য আবার 'রহীম' শব্দটিও বলা হয়েছে৷ এর দৃষ্টান্ত এভাবে দেয়া যেতে পারে, যেমন আমরা কোন ব্যক্তির দানশীলতার গুণ বর্ণনা করার জন্য 'দাতা' বলার পরও যখন অতৃপ্তি অনুভব করি তখন এর সাথে 'দানবীর' শব্দটিও লাগিয়ে দেই৷ রঙের প্রশংসায় 'সাদা' শব্দটি বলার পর আবার 'দুধের মতো সাদা' বলে থাকি৷ 

আল‘হামদুলিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন


আল‘হামদুলিল্লাহি রব্বিল ‘আলামীন
Alhamdu lillaahi Rabbil 'aalameen-সূরা ফাতিহা, আয়াত ০১
ইসলাম মানুষকে একটি বিশেষ সভ্যতা ও সংস্কৃতি শিক্ষা দিয়েছে৷ প্রত্যেকটি কাজ শুরু করার আগে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটি রীতি৷ সচেতনতা ও আন্তরিকতার সাথে এ রীতির অনুসারী হলে অনিবার্যভাবে তিনটি সুফল লাভ করা যাবে৷

একঃ মানুষ অনেক খারাপ কাজ করা থেকে নিষ্কৃতি পাবে৷ কারণ, আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা অভ্যাস তাকে প্রত্যেকটি কাজ শুরু করার আগে একথা চিন্তা করতে বাধ্য করবে যে যথার্থই এ কাজে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করার কোন ন্যায়সংগত অধিকার তার আছে কি না?

দুইঃ বৈধ সঠিক ও সতকাজ শুরু করতে গিয়ে আল্লাহর নাম নেয়ার কারণে মানুষের মনোভাব ও মানসিকতা সঠিক দিকে মোড় নেবে৷ সে সবসময় সবচেয়ে নির্ভুল বিন্দু থেকে তার কাজ শুরু করবে৷

তিনঃ এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুফল হচ্ছে এই যে, আল্লাহর নামে যখন সে কাজ শুরু করবে তখন আল্লাহর সাহায্য, সমর্থন ও সহায়তা তার সহযোগী হবে৷ তার প্রচেষ্টায় বরকত হবে৷ শয়তানের বিপর্যয় ও ধ্বংসকারিতা থেকে তাকে সংরক্ষিত রাখা হবে৷ বান্দা যখন আল্লাহর দিকে ফেরে তখন আল্লাহও বান্দার দিকে ফেরেন, এটাই আল্লাহর রীতি৷ 

বিসমিল্লাহ বা তাসমিয়া আমল করলেই বরকত


বিসমিল্লাহ ছোট একটি শব্দ। বিসমিল্লাহ আমলে অসংখ্য উপকার পাওয়া যায়। বিসমিল্লাহ বলে কোনো কাজ শুরু করলে ওই কাজে বরকত হয়। কাজটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর কাছ থেকে রহমত আসতে থাকে। বিসমিল্লাহ পড়ার উদ্দেশ্যই হলো আমি কাজটি আল্লাহর নামে শুরু করছি এবং আমার কাজটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি আল্লাহর ওপর নির্ভর করছি। যে কাজ আল্লাহর নাম স্মরণের মাধ্যমে শুরু হয়। সেই কাজটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আল্লাহর হেফাজতে থাকে। সমগ্র কর্মটির জিম্মাদারি আল্লাহর হাতে থাকে। বিসমিল্লাহ এমন একটি আমল যার ফজিলত লিখে শেষ করা যাবে না। কুরআনের প্রত্যেকটি সূরার শুরুতে বিসমিল্লাহ রয়েছে। শুধু একটি সূরা ব্যতীত। তবে অন্য একটি সূরাতে বিসমিল্লাহ শব্দটি দুইবার এসেছে।
বিসমিল্লাহকে তাসমিয়াও বলা হয়। তাসমিয়া শুয়ে, বসে ও হাঁটাহাঁটি করার সময় হরদম পাঠ করা যায়। বিসমিল্লাহ শব্দটিকে তাসবিহ হিসেবেও পাঠ করা যেতে পারে। তবে কোনো হারাম কিংবা নিষিদ্ধ কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পড়া জায়েজ নেই। তাফসিরে কবিরে উল্লেখ করা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি জীবনে চার হাজারবার বিসমিল্লাহ শরিফ পাঠ করেছে এমন সাক্ষ্য তার আমলনামায় উল্লেখ থাকলে কেয়ামতের ময়দানে সে আল্লাহর আরশের নিচে স্থান পাবে। আমালিয়াতে কুরআন কিতাবে হাদিস শরিফের উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, হজরত আবু বকর রা: কর্তৃক বর্ণিত। হজরত রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, যে ব্যক্তি ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ পাঠ করে, আল্লাহ পাক তার জন্য দশ হাজার নেকি লিখেন এবং আমলনামা থেকে দশ হাজার গুণাহ মাফ করেন এবং দশ হাজার উচ্চ মর্যাদা দান করেন। তিনি আরো বলেন, ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠকারী কেয়ামতের দিন আল্লাহর রহমতের মধ্যে ডুবে যাবে। হজরত উমর ফারুক রা: থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘যদি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম, না হতো তবে সমস্ত সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যেত।’ হজরত ওসমান রা: থেকে বর্ণিত হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি জীবনে একবার বিসমিল্লাহ পাঠ করে, তার এক বিন্ধু পরিমাণ গুণাহ থাকতে পারে না। এছাড়া আল্লাহর খাস দয়া সূচক নাম রহমান ও রহিম তাসমিয়া যোগে প্রথম প্রচারিত হয়।
বিসমিল্লাহর উপকারিতা অনেক। হাদিস শরিফে এসেছে, যখন কোনো ব্যক্তি ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ পাঠ করে, তখন শয়তান এমনভাবে গলে যায়, যেভাবে শিসা আগুনে পুড়ে গলে যায়। জাহান্নামের দায়িত্বে নিয়োজিত হজরত মালেক ফেরেশেতাকে আল্লাহ যখন দোজখের বিভিন্ন কক্ষে প্রেরণ করবেন। হযরত মালেক ফেরেশতার কপালে তখন ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লিখে দেবেন। যার ফলে হযরত মালেক ফেরেশতা দোজখের প্রত্যেকটি কক্ষে আরামের সাথে চলাফেরা করতে পারবেন। ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ এর বরকতে হজরত মালেক ফেরেশতার গায়ে আগুন কোন কাজ করবে না। 
আমালিয়াতের ওপর লেখা সব ক’টিতে কিতাবে বিসমিল্লাহ আমলের ওপর খুব গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। উল্লেখ রয়েছে, যে ব্যক্তি প্রতিদিন সকাল বেলা একচল্লিশ বার বিসমিল্লাহ পড়ে গায়ে ফুঁক দেয় ওই ব্যক্তি আল্লাহর রহমতে সারাদিন নিরাপদ থাকবে। একইভাবে সন্ধ্যায় যদি একচল্লিশ বার বিসমিল্লাহ পড়ে গায়ে ফুঁক দেয়, তবে ওই ব্যক্তি সারারাত নিরাপদ থাকবে। দুষ্ট জিন, পরী, ভূত, হিংস্র প্রাণী ও শক্র বিসমিল্লাহ আমলকারীর কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।
তবে মনে রাখতে হবে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ আমলকারী এর পরিপূর্ণ ফজিলত পেতে হলে অবশ্যই হালাল খেতে হবে। বিশুদ্ধ নিয়তে বিসমিল্লাহ পাঠ করতে হবে। সব ধরনের শিরক ও বেদায়াত সম্পৃক্ত নিষিদ্ধ কাজ কিংবা হারাম কাজ-কর্ম থেকে সম্পূর্ন দূরে থাকতে হবে।