Wednesday, June 24, 2020

যেসব কাজে অন্যের মুখে হাসি ফোটে

ইসলাম সাম্য ও সামাজিকতার ধর্ম। ব্যক্তিগত ইবাদতের চেয়েও সামাজিক ইবাদতের পরিধি অনেক বিস্তৃত। কোরআন ও হাদিসের বেশির ভাগ অংশজুড়েই রয়েছে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করার তাগিদ। মানবতা, মানবিকতা ও মানবকল্যাণ এ ধর্মের প্রাণ।
প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘উত্তম আমল হলো, তোমার মুসলিম ভাইকে খুশি করা। তার ঋণ আদায় করে দেওয়া। তার প্রয়োজন পূরণ করা এবং তার বিপদ দূর করা।’ (শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৭২৭৪)
ইসলামে অন্যকে আনন্দিত ও খুশি করার জন্য অনেক ইবাদতের প্রবর্তন করা হয়েছে। যেমন—
► মৃতের পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া। মৃতকে জীবিত করতে পারব না, কিন্তু তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে পারি। যেন আল্লাহ তাআলা তাদের দুঃখ-যন্ত্রণা লাঘব করেন।
► রোগীর সেবা-শুশ্রূষা করা। সম্ভব হলে চিকিৎসা খরচ মিটিয়ে দেওয়া।
► প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া ইত্যাদি।
► হাদিয়া দেওয়া। হাদিয়া অনেক দামি হতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। আপনি যদি কোনো বন্ধুর বাসায় যান, আর তার সন্তানাদি থাকে, তাহলে কিছু খাবার, খেলনা নিয়ে যান। এটা তাদের আনন্দিত করবে।
► মানুষের সঙ্গে মুচকি হাসা।
► অন্য ভাইয়ের প্রয়োজন পূর্ণ করা।
► উত্তম কথা সদকাস্বরূপ। তাই উত্তম কথা বলা।
► বন্ধুবান্ধবের খোঁজখবর নেওয়া।
► আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া। তাদের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হওয়া।
► অন্যকে ঋণ দেওয়া। ঋণ পরিশোধে সহায়তা করা। ঋণ আদায়ে অবকাশ দেওয়া।
► ঘরবাড়িহীন মানুষকে ঘরবাড়ি করে দেওয়া।
► অতীতে মুসলিম সমাজে মসজিদের পাশে অনেক আওকাফ তথা সহায়তাকেন্দ্র ছিল। সেখানে অসুস্থ ও গরিবদের জন্য ওয়াক্ফকৃত বিশেষ সেন্টার ছিল। বর্তমানে এমন সহায়তাকেন্দ্রের বড় অভাব।
► বিভিন্ন মাসয়ালা-মাসায়েল, জিকির-আজকার শিক্ষা দিয়ে অন্যকে খুশি করা যায়।
► বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা।

হতাশ হচ্ছেন? নবীদের জীবন থেকে শিক্ষা নিন

যখন রক্তসম্পর্কীয় কেউ আপনার সঙ্গে প্রতারণা করেছে? ভেঙে পড়বেন না। ইউসুফ (আ.) নিজ ভাইদের দ্বারা প্রতারিত ও গভীর কূপে নিক্ষিপ্ত হয়েও জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
জীবন আসলে একটি কাঁটাময়, বিঘ্নবহুল বিছানা, কখনোই সেটা ফুলের বিছানা নয়। সুন্দর এ পৃথিবীতে কেউ চিরসুখী নয়। কারণ দুনিয়া প্রকৃত সুখ ও ভোগের জায়গা নয়।
আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে কষ্টনির্ভররূপে সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা আল-বালাদ, আয়াত: ৪)
কারো আনন্দ-শোক বা হাসি-কান্না তার আয়ত্তাধীন নয়। এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। তিনিই কারণ সৃষ্টি করেন এবং কারণাদিকে ক্রিয়াশক্তি দান করেন। তিনি ইচ্ছা করলে মুহূর্তের মধ্যে ক্রন্দনকারীর মুখে হাসি ফোটাতে পারেন এবং হাস্যরতদের কাঁদিয়ে দিতে পারেন। জীবনের ভাঙা-গড়ার এ দর্শন যে উপলব্ধি করতে পারে, সাময়িক আনন্দকে সে চূড়ান্ত জ্ঞান করে না। সুখ ও ভোগে গা ভাসিয়ে দেয় না। আবার দুঃখের দিনে আশাহত হয় না। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না। আসুন, নবীদের জীবনের সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নিই।
১. আপনি অবরুদ্ধ, ঘর থেকে বের হতে পারছেন না। মন ভীষণ খারাপ? কত দিন ধরে? তিন মাস? চার মাস? এক বছর? আপনি কি জানেন আমাদের প্রিয় নবী (সা.) তিন বছর পর্যন্ত শুআবে আবু তালেবে কাফিরদের দ্বারা অবরুদ্ধ-বেষ্টিত ছিলেন। একসময় খাদ্যের সংকট দেখা দেয়। এমনও হয়েছে, তিনি ক্ষুধার তাড়নায় গাছের পাতা খেয়েছেন। আপনার দুঃখ-কষ্ট কি এর চেয়েও বেশি?
২. যখন রক্তসম্পর্কীয় কেউ আপনার সঙ্গে প্রতারণা করে, ভেঙে পড়বেন না। মনে রাখবেন, ইউসুফ (আ.) নিজ ভাইদের দ্বারা প্রতারিত ও গভীর কূপে নিক্ষিপ্ত হয়েও জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
৩. মাতা-পিতা থেকে কষ্ট পেলে মন খারাপ করবেন না। ইবরাহিম (আ.) নিজ বাপের দ্বারাই আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন।
৪. ঘোর বিপদে চারদিকে অন্ধকার দেখলেও হতাশ হবেন না। ইউনুস (আ.) সাগরে মাছের পেটের অন্ধকার থেকেও উদ্ধার হয়েছিলেন।
৫. আপনার বিরুদ্ধে অপবাদ ও গুজব রটলে ভেঙে পড়বেন না। আয়েশা (রা.)-এর বিরুদ্ধেও অপবাদ আরোপ করা হয়েছিল। আল্লাহ তাঁকে হেফাজত করেছেন।
৬. তীব্র অসুস্থতায় হতাশ হবেন না। আইয়ুব (আ.) আপনার চেয়ে হাজার গুণ বেশি অসুস্থ ছিলেন। পরে তিনি সুস্থ হয়েছেন।
৭. যখন আপনি নির্জন ও একাকিত্বে ভোগেন, ভেঙে পড়বেন না। আদম (আ.)-কে, প্রথমে একাকী সঙ্গীবিহীন সৃষ্টি করা হয়েছিল। অথচ তিনিই এ পৃথিবীকে আবাদ করেছেন।
৮. পরিবার ও সন্তানকে সত পথে আনার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলেও হতাশ হবেন না। চেষ্টা চালিয়ে যান। নুহ (আ.) সাড়ে নয় শ’ বছর দাওয়াত দিয়ে মাত্র ৮০ জনকে হেদায়েতের পথে আনতে পেরেছিলেন। কিন্তু তিনি তো আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবেন।
৯. মানুষ আপনাকে নিয়ে বিদ্রুপ করলে ভেঙে পড়বেন না। আমাদের নবীসহ যুগে যুগে সব নবীকে নিয়ে অজ্ঞ ও অবিশ্বাসীরা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ করেছিল, কিন্তু পরিশেষে নবীরাই সফল হয়েছেন।
বান্দাদের অবস্থার প্রতি আফসোস, যে রসূলই তাদের কাছে এসেছে তাকেই তারা বিদ্রুপ করতে থেকেছে৷ -সূরা আল ঈয়াসীন আয়াত: ৩০)
১০. একের পর এক বিপদে হতাশ হবেন না। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের বেশি বেশি পরীক্ষায় ফেলেন। নবী-রাসুলদের তিনি সর্বাধিক পরীক্ষা করেছেন। পরিশেষে তাঁদের উদ্ধার করেছিলেন।
কাজেই আসুন, আমরা আল্লাহমুখী হই, আল্লাহর ওপর সব ভরসা রাখি, ইনশাআল্লাহ, সব দুঃখ মুছে যাবে।

Wednesday, June 17, 2020

গাধা সমাচার


কৃষণ চন্দরের উপন্যাস “আমি গাধা বলছি” যারা পড়েছেন অন্ততঃ মন দিয়ে তারা মানুষের মনুষ্যত্ব, বিবেক জাগানোর জন্যে লেখকের অভিনব পন্থা নিশ্চয়ই বুঝেছেন। গল্প বলার ধরণ, বিষয় বৈচিত্র্যতা, ঘটনার গভীরে প্রবেশ, উপলব্ধির মর্মমূলে আঘাত, রসালো উপস্থাপন, ভাষার অশেষ দক্ষতা সব মিলিয়ে স্যাটায়ার ধর্মী লেখাগুলোর মধ্যে এই লেখাটি আমার পড়া অন্যতম সেরা উপন্যাস।
গাধা থেকে একটু সরে এসে মাছিদের কথা বলি। “মাছি-মারা-কেরানি নিয়ে যত ঠাট্টা-রসিকতাই করি না কেন, মাছি ধরা যে কত শক্ত সে কথা পর্যবেক্ষণশীল ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করে নিয়েছেন, মাছিকে যেদিক দিয়েই ধরতে যান না কেন, সে ঠিক সময়ে উড়ে যাবেই”- সৈয়দ মুজতবা আলী একথাগুলো সাথে বোধ করি কেউই দ্বিমত করবেন না।
তাচ্ছিল্য অথবা উপহাস করে আমরা মানুষকেই “গাধা” বলে ডাকি। গাধা কিন্তু মূলতঃ একটি নিরীহ প্রাণী। এরা মানুষের অত্যন্ত অনুগত। কারো ক্ষতি করে না। ‘গাধা’ শব্দটা আমরা বেশি ব্যবহার করি নেতিবাচক অর্থে। কিন্তু গাধা কর্মঠ, বুদ্ধিমান এবং উপকারী প্রাণীও বটে। এটা সবাই কি জানি? হয়তো জানি না, হয়তো জানলেও গাধা শব্দটা বলতে, ব্যবহার করতে ভালো লাগে। তাই যদি না হতো, তাহলে ক্লাসে পড়া না পারলে শিক্ষকরা বলতেন না ‘গাধা’, অফিস বা নিজ কর্মক্ষেত্রে বেশি কাজ করলে কেউ বলতেন না ‘গাধা’র মতো খাটছিস কেন, কোনো কথা বুঝতে না পারলে, কোনো কাজ ঠিকমতো না করতে পারলে তাকে বলতো না ‘গাধা’। কিন্তু এ প্রশ্ন করা যেতেই পারে যে গাধারা কতটুকু ‘গাধা’। 
গাধা বিচিত্রিতা:
সংগ্রহ কার কয়েকটি তথ্য “গাধা” বিষয়ে আপনাকে পজিটিভ হতে সাহায্য করবে বলে আশা করি।
গাধা গৃহপালিত প্রাণী হলেও বর্তমানে অনেকে পোষ্য প্রাণী (pet) হিসেবে গাধা পালছেন । এটি খুব আজ্ঞাবহ কিন্তু ঘোড়ার মত যত্ন প্রত্যাশী নয়। ভারবহন নয় ভালো বন্ধু হিসেবে পশুপাখির ফার্মে গাধার চাহিদা বাড়ছে।
১. আমাদের সমাজে ভ্রান্ত ধারণা আছে গাধা একটা বোকা প্রানী । কিন্তু প্রাণিবিজ্ঞানীরা একে বুদ্ধিমান ও স্মার্ট প্রাণী বলেই মনে করেন। মানুষের কণ্ঠের নির্দেশ বোঝে তারা ও পুরনো মনিব ও সঙ্গীসাথীকে ২৫ বছর পরেও চিনতে পারে গাধা এমন রেকর্ডও আছে।
২. এদের ঘ্রাণশক্তি ও শ্রবণ শক্তি প্রবল । দূরের বিপদজনক গন্ধ তারা আগেই বুঝে ফেলে ও সামনে কিছুতেই এগোয় না। পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করতে থাকে। এতে অনেক মনিব না বুঝে গাধাকে একগুঁয়ে প্রাণী মনে করেন।
৩. সামনে বড় বাঁধা থাকলে ভারবাহি গাধা আগেই নিজের গতিপথ বদলে নেয়।
৪. সে তার ওজনের দ্বিগুণেরও বেশি ওজন বইতে পারে। তার ভারসাম্য খুবই উন্নত। যত বন্ধুর পথ হোক সে তার মনিবকে কখনো নীচে ফেলে দেবে না, যা ঘোড়ার নেই ।
৫. গাধার প্ৰকৃত ইংরেজি নাম ছিল Ass ও she-ass কিন্তু সেটা গালিতে বা ভালগার শব্দে পরিনত হওয়ায়, পরে dunkey বলে ইংরেজি তে ডাকা শুরু হয় ।
৬. গাধাদের নিজস্ব চিন্তা ভাবনা আছে। নিজের ও মনিবের নিরাপত্তা সবার আগে চিন্তা করে সে।
৭. ভেড়া ও ছাগলের পাল পাহারা দেয়ার জন্য একটি গাধা যথেষ্ট। খুব মনোযোগ দিয়ে গাধা পাহারা দেয় ভেড়ার পাল।
৮. নেকড়ে বাঘ ও শেয়াল গাধাকে ভয় করে। তারা কোন ভেড়ার খোঁয়াড়ে ঢুকে পাহারায় গাধাকে দেখতে পেলে, দ্রুত সটকে পড়ে।
৯. গাধা তার সঙ্গীনিকে খুব ভালোবাসে। গলা জড়িয়ে ঘুমায়, শরীর পরিস্কারও করে দেয় সারাক্ষন।
১১.গাধা ৫০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। একই বয়সের ঘোড়ার চেয়ে গাধা শক্তিশালী।
১২. গাধার আদি বাসস্থান মরুভূমি। সেজন্য গরম আবহাওয়া পছন্দ তার। শরীরের চামড়া ঘোড়ার চেয়ে পাতলা ও পশম পানিরোধী নয় । তাই সে বৃষ্টিকে ভয় পায় ও ঠান্ডায় কাঁপে।
১৩. গাধা ও ঘোড়ার হাঁটার ভঙ্গি একই। কিন্তু মরুভূমির প্রাণী হওয়ায়, গাধা ঘোড়ার মতো দৌঁড়তে পারেনা, এতে শক্তি বেশি ক্ষয় হবে বলে। সেজন্য বিবর্তনের শুরুতে গাধা যেমন ছিল তেমনি এখনো আছে।
১৪. তারা কখনো চমকায় না। জোরে আওয়াজ হলে কৌতূহলে দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নেয় । অথচ জোরে আওয়াজ হলে ঘোড়া দিগ্বিদিক ছুটতে থাকে।
১৫. মরুভূমিতে ঘাস কম থাকায় গাধা ঘাসের ৯৫% ই শরীরের কাজে লাগায়। তাই এদের গোবরে কোন সারবত্তা থাকে না।
১৬.যারা ঘোড়ায় চড়া শিখতে চান তাদের জন্য গাধা "ভাল শুরু" হতে পারে। সে কখনোই সওয়ারীকে ফেলে দেয় না।
১৭. সংকর প্রাণী উতপাদনে গাধার জিন চমতকার মানিয়ে নেয়। পশ্চিমে ছেলে গাধাকে জ্যাক ও গাধিকে জেনি বলা হয়। এর সাথে ঘোটকির সংকর প্রাণী হল মিউল ও জেব্রার সংকর হল জংকি। গাধীর সাথে ঘোড়ার সংকর হলো হিনী। হিনীর চেয়ে মিউল শক্তিশালী হয়। এরা সব অনুর্বর বা বন্ধ্যা হয়।
১৮. মিশরীয় সভ্যতা ও সিল্ক রোড নির্মাণে গাধার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গাধার পিঠে চড়েই পিরামিড ও ফারাওদের প্রাসাদ তৈরির সরঞ্জাম আসতো। তাই মিশরীয়দের দেয়াল চিত্রে গাধার উল্লেখযোগ্য ছবি আছে।
প্রাচীন সিল্ক রোডে বেশিরভাগ সিল্ক বহন করতো গাধা।
১৯. সব প্রাণীর দুধের মধ্যে একমাত্র গাধার দুধই নন-এলার্জিক। যেসব শিশুদের পেটে সমস্যা থাকে তাদের জন্য এর দুধই সর্বোত্তম।
২০.  পৃথিবীর সবচে বেশি গাধা আছে চীনে। ব্রিটেনে গাধা আমদানি করতে হলে তার (গাধার) পাসপোর্ট প্রয়োজন ।
ওপরের তথ্যগুলো ভাল করে পড়েও বুঝবার পর আমার মনে হলো গাধারা সব সময়ই পজিটিভ আর আমরা মানুষরূপী গাধারা আসলেই “গাধা” গুটিকতক “মানুষ” বাদে।
https://bn.quora.com/
https://www.newsg24.com

Saturday, June 13, 2020

বাবার কাছে শিখি বন্ধুত্বের ১ম পাঠ

উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ার সময় একবার গরমের ছুটিতে বন্ধুর বাড়ীতে বেড়াতে যাবো বলে মা-বাবাকে বলে সকালেই বেরিয়ে পড়ি। বন্ধুর বাড়ীতে গিয়ে ওর দেখা পেলাম। কাটালাম অনেক সময়। যোহরের সালাত আদায়ের পর বন্ধু বল্লো, “চল্ খাওয়া যাক।” ও নিয়ে গেলো এক হোটেলে। খেলাম। কিন্তু মনটা ভরলো না। খাবার পর আনমনা হয়ে গেলাম। বন্ধুকে তেমন কিছু বল্লাম না।
বাড়ী চলে আসি বিকেল বেলা। রাতের খাবারের পর আব্বা জিজ্ঞেস করলেন, “বাবা, সারিাদিনই তো বাইরে ছিলি বন্ধুর বাড়ীতে। তা, বন্ধু কেমন যত্ন-আত্তি করলো। কী ই বা খেলি?”
বল্লাম, “বন্ধুটি ভাল। অনেক কথা বল্লাম ওর সাথে। ওর মা-বাবার সাথে তেমন কথা হয় নি। দুপুরে খেয়েছি হোটেলে।”
আব্বা উপসংহার টেনে বল্লেন, “যে বন্ধু তার বাড়ীতে যা জোটে তাই দিয়ে বন্ধুকে পাশে বসে খাওয়ায় আর নিজেও তাই খায় -সে ই হলো খাঁটি বন্ধু। কারণ, ও সম্পর্ক তৈরী করতে জানে।”
আব্বা আর কিছুই বলেন নি।
সেই যে শিখলাম, “বন্ধুত্ব আর সম্পর্ক” কি -আর ভুলিনি। এখন বন্ধুর কথা মনে হলেই আব্বার প্রিয় মুখটি আমার সামনেই চলে আসে।
আব্বার কথাগুলো ছিল ছোট ছোট। কিন্তু এর অনুরণন আমার কাছে রইবে সারা জীবন।
“ফ্রেন্ডশীপ নৌজ নো রেস, রিলিজিয়ন অ্যান্ড স্ট্যাটাস অব লাইফ!!”
পৃথিবীর সব আব্বাই আমার আব্বার মত।

শব্দসম্ভার বা VOCABULARY, আমার প্রিয় শিক্ষক এবং আমার বাবাঃ আমার অভিজ্ঞতা

৭ম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমাদের প্রতি সপ্তাহে একটি ক্লাশ নির্দিষ্ট ছিল শ্রুতিলিখন বা ডিকটেশনের। ক্লাশটি নিতেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক জনাব আবদুল বাসিত, তুখোড় ইংরেজী জানা ভদ্রলোক। সেই ক্লাশ আমি খুবই মনযোগে করতাম যা আমার ইংরেজী শেখার “ব্যাকবোন” তৈরী করেছিল। ক্লাশটি ১০ম শ্রেণি অব্দি চালু ছিল। প্রধান শিক্ষক নিজেই সেটা নিতেন। তার হাতে থাকতো বেত। তিনি বলতেন, “TO SPARE THE CANE, TO SPOIL THE CHILD” তার মানে “বেত্রাঘাত বন্ধ করা মানে ছাত্রের বা ছেলে-মেয়েদের উচ্ছন্নে যাওয়া।”
একবার উনি ক্লাশে এসে যা বল্লেন আমরা তা শুনলাম ও লিখলামঃ
“One lamp lights up another,
Nor grows less!
So the Nobleness,
Enkindle nobleness.”
সরল বাংলায়ঃ
একটি বাতি আরেকটিকে আলোকিত করে
কিন্তু আগেরটির আলোর কমতি হয় না।
মহানুভবতা ঠিক তেমনি!
স্যারের ব্যাখ্যা শুনে আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল।
আমরা যারা ফ্রন্ট বিরিঞ্চিতে বসতাম তারা Enkindle শব্দটি সাথে পরিচিত ছিলাম না। অন্য সারির স্টুডেন্টদের তো কথাই নেই। Enkindle শব্দটিকে তিনি ভেঙ্গে দিয়ে বল্লেন এর মানে হলো “প্রদীপ্ত করা।”
পরে তিনি আরো ব্যাখ্যা করলেন। বল্লেন, মোমবাতির মূলতঃ ২ অংশ। ২টোই ইংরেজীর W দিয়ে। আমরা পরস্পরে চোখাচোখি করলাম যে স্যার কী বুঝাতে চাইছেন W দিয়ে। আমাদের অবস্থা দেখে পরে তিনি ব্যাখ্যা করলেনঃ
১ম W হলো WAX বা মোম
২য় W হলো WICK (a strip of porous material up which liquid fuel is drawn by capillary action to the flame in a candle) বা সলতে।
আমার দিকে তাকিয়ে স্যার বল্লেন, তুমি কোনাটা হতে চাও মোমবাতির?
আমি প্রায় স্ফুলিঙ্গের মতই উত্তর দিয়েছিলাম, “স্যার আমি সলতে হতে চাই।
”
কেন? স্যারের প্রশ্ন।
বল্লাম স্যার, “সলতেটা জ্বলে। আর জ্বলনটাই মূখ্য। না জ্বললে আলো আসবে না।”
উত্তরটা শুনে স্যারের মুখখানা হাসিতে “প্রদীপ্ত” হয়েছিল সেদিন।
ভোকাবুলারী VOCABULARY বা শব্দসম্ভার আর NOBLENESS বা ENKINDLE প্রদীপ্ত হওয়ার যে কী স্বাদ তখনই বুঝেছিলাম।
আব্বাও শিক্ষক ছিলেন। তিনি বলতেন যদি ভাল বক্তা হতে চাস তাহলেঃ
VOCABULARY তোর ১ম পাঠ হতে হবে।
এর পর ২য় পাঠ হবে জড়তা কাটানো
৩য় পাঠ হবে ভাল “গল্প বলিয়ে” বা “গল্প কথক” STORYTELLER হতে হবে। বক্তৃতা জীবন্ত করতে হলে সুন্দর সুন্দর “উপমা” টানতে হবে।
৪র্থ পাঠ হবে শ্রোতার চোখে চোখ রেখে কথা বলা
৫ম পাঠ হবে PAUSE দিয়ে বা থেমে থেমে কথা বলা।
উপমা যে কত দরকার তা পরে আর কুরআন পাঠ করতে গিয়ে টের পেলাম যে আল্লাহ কতটা উপমা টেনেছেন আল কুরআনকে জীবন্ত বা LIVELY করার জন্য। আর তা দিয়ে প্রিয় রাসুল(সা.)কে তিনি করেছেন বিপুলভাবে সমৃদ্ধ। রাসুল (সা.)ছিলেন VOCABULARYতে অসম্ভব রকমের এনরীচড আর ছিলেন তুখোড় গল্প কথক।
BEXIMCO PHARMACEUTICALS LIMITED-এর BAYER ডিভিশনে চাকরি করার সময় জড়তা কাটানোর ব্যাপারে Edmund Buckleyর মুখচোরা অবস্থা থেকে দুনিয়ার সেরা বক্তা হওয়ার গল্প শোনা আমাকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিলো।
৭ম শ্রেনী থেকে সেই শুরু আমার VOCABULARY এনরীচ করার।
১৯৭১এর স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে আমাদের বাড়ীতে আশ্রয় নেন আমার বগুড়া আযিযুল হক কলেজের ৩ জন শিক্ষক। সে সময় আমি উচ্চ মাধ্যমিকের ১ম বর্ষের স্টুডেন্ট। তারা বিখ্যাত ম্যাগাজিন “READER’S DIGEST” পড়তেন। সেই ম্যাগাজিন আমি প্রতিদিনই পড়তাম। এক সময় চোখ আটকে গেলো এক পাতায়। লেখা আছেঃ
IT PAYS TO ENRICH YOUR WORD POWER.
সেই শুরু “READER’S DIGEST” পড়া। এখনো চলছে। ইস্যুগুলো হাতে এলেই প্রথমেই পড়ে নিই WORD POWER আর পরে পড়ি QUOTABLE QUOTES আর নিজেকে সমৃদ্ধ করতে চেষ্টা করি নিরন্তর এখন অব্দি।
বিলেতে চাকরী করার সময় ঢাকা কলেজের প্রাক্তন তুখোড় ছাত্র বন্ধুবর তথা কোলিগ জনাব আশরাফ উদ্দিন খানের সাথেও VOCABULARY এনরীচ করার বিষয়ে প্রচুর কথা বলতাম। এখনো তার সাথে ফেসবুকে কথা বলি।
দেশের একটি বড় বানিজ্যিক ব্যাংকে হেড অব ট্রেনিং ও পরে ফ্যাকাল্টি মেম্বার হিসেবে কাজ করার সময় স্টুডেন্টদের প্রায়ই VOCABULARY এনরীচ করার কথা বলতাম। একবার ক্লাশে তাদের বল্লাম “PACHYDERMS ARE BEING ANNIHILATED IN CHITTAGONG HILL TRACTS” বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকার এডিটোরিয়ালে এই লেখাটিতে কী বলা হয়েছে? সত্যি বলতে কি স্টুডেন্টরা বলতে পারেনি। কারণ, তারা PACHYDERM আর ANNIHILATE শব্দ দুটির সাথে পরিচিত ছিলনা। তাদের VOCABULARY সবল ছিলনা। পরে বল্লাম PACHYDERM হলো মোটা চামড়ার প্রাণী আর ANNIHILATE মানে হলো মেরে ফেলা।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিউজ সেকশানে ট্রানশ্লেটর হিসেবে অনেক দিন ধরে কাজ করার ফলে আমি নিজেকে ইংরেজীতে এনরীচ করার সুযোগ পাই। সে সময় বুঝেছিলাম একটি খবর শ্রোতার কাছে হৃদয়গ্রাহী করে পৌছাতে একজন অনুবাদককে কি পরিমাণ ক্লান্তিবিহীন পরিশ্রম করতে হয় আর কী পরিমাণ ইংরেজী বা বাংলা জানতে হয়।
আমার এ লেখা যারা পড়বে তারা এখান থেকে মশলা পেতে পারে।
পুরোনো স্মৃতির জাবর কাটতে ভালই লাগে। তাই এলোমেলো এসব কথা বলে যাই।

বড় বুবর কাছে শিখেছি: “রিপল ইফেক্ট (RIPPLE EFFECT)

“পর ধন নাহি লবে,
চিরদিন সুখে রবে”
আমার সব বড় বোন আবিদা খাতুন। তার কাছে শেখা হয়নি আমার কোন কিছুই। তিনি গত হয়েছেন আমি যখন সিরাজগঞ্জের ভাষায়, “গ্যাদা বাচ্চা।” মানে হলো এক্কেবারে ছোট্ট বাবু। আমার এই বোনটি ছিলেন অনেক গুণী যেটা শুনেছি আব্বার মুখে।
তার পরের বড় বোন বুলবুল। ভাল নাম খাদিজা খাতুন। নামটি আব্বার রাখা। আব্বা জিজ্ঞেস করেছিলাম বুবুর নাম ‘বুলবুল’ কেন রাখলেন? তিনি বল্লেন কবি নজরুলের বুলবুলের নাম আমার কাছে খুবই ভাল লেগেছিল। কবির “বুলবুল” যখন মারা যায় তখন কবি তার নামে করুন এক গান লিখেছিলেন, “ঘুমিয়ে গেছে শান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি।” কাছে থেকে দেখলাম, “বলিতে বলিতে রুমালে চোখ মুছিলেন মোর বাপ।”
বুঝেছিলাম আব্বা আবিদা বুবুর জন্য তথা মেয়েদের জন্য কতটা আবেগি ছিলেন। আব্বাকে কখনো দেখিনি টানাটানির সংসারে ৫ মেয়েকে নিয়ে ভাবতে। বরং মেয়েরাই ছিলো তার আনন্দের মহাসাগর।
বুলবুল বুবু বাপের বাড়ীতে বেড়াতে আসতো আমের সময়। সব বোনেরাই আসতো সে সময়- কেবল আবিদা বুবু ছাড়া। আবিদা বুবুর জন্য মায়ের মনটা খুবই খারাপ হতে দেখেছি। মা বলতো সবাই এলো, “আমার আবিদাটা এলোনা।”
আমি ভাই-বোনদের সবাকার ছোট। আমি সব বোনের কোলে কোলে গিয়ে শেষ করতে পারতাম না। কাড়াকাড়ি লেগে যেতো বোনদের মধ্যে আমাকে নিয়ে।
বুলবুল বুবু বাপের বাড়ীতে এসে যত দিন থাকতো সকাল বেলা শীতল পাটিতে মাটির বারান্দায় বসে আমাকে নিয়ে মদনমোহন তর্কালঙ্কার বাবুর “শিশু শিক্ষা” বই নিয়ে পড়াতে বসতো। আমিও বোনের কোলের মধ্যে বসেই তার সাথে সূর করে পড়তাম-
বার মাস তিথি যত।
একে একে হয় গত ॥
বার মাস সাত বার।
আসে যায় বার বার।।
লেখা পড়া করে যেই।
গাড়ী ঘোড়া চড়ে সেই ॥
লেখা পড়া যেই জানে।
সব লোক তারে মানে ॥
কটু ভাষী নাহি হবে।
মিছা কথা নাহি কবে ॥
পর ধন নাহি লবে।
চিরদিন সুখে রবে ॥
পিতামাতা গুরুজনে।
সেবা কর কায় মনে ॥
পড়া শেষ হলে বোন আঙ্গুল উঁচিয়ে বলতো পয়লাতেই তো ভুল পড়লি? তার দিকে তাকাই আমি। ভুলটা বুঝিনি? বোন বল্লো ওটা হবে “বার” হবে, “বারো” নয় বুঝলি কি না? আমি মাথা নাড়ি। এক লাইন পরে যেটা আছে সেটা হবে “বারো।” তাজ্জব বনে যাই। ভাবি বোনটা খুবই জানে! এর পর আর ভুল হয়নি।
অনুপ্রেরণামূলক কবিতার শেষের দিকে আসি। লেখা আছে-“পর ধন নাহি লবে, চিরদিন সুখে রবে।”
বুবুর দিকে তাকাই। বুবু বুঝতে পারে আমি কি বলতে চাই, কি জানতে চাই। বুবু বলে, অন্য মানুষের ধন সম্পত্তি নেয়া যাবে না। বুঝলি কি না?। বুবুকে আবার বলি। বুবু খোলাসা করে বলেঃ
এই ধর তোর সামনে সোনার দলা পড়ে অছে, তুই সেটা নিবি না। আমি দুষ্টুমি করে বলি সেটা কেউ না কেউ তো নেবে? না হয় আমিই নিলাম? বুবু বলে, ‘যখন থেকে তুই ওটা “তোর” করে নিবে তখন থেকেই তোর খারাপ লাগা শুরু হবে।’ বলি আমি, “কেনো? বুবু বলে সোনার দলা কুড়িয়ে নেয়ার পর তুই সেটা কোথায় রাখবি? চৌকির তলায়, খাটের তলায়, মায়ের ঘরের বাক্সে?। কোনওখানে রেখে শান্তি পাবিনে। মনে হবে আমার জিনিস বোধকরি কেউ নিলো! এই বুঝি চুরি হয়ে গেলো। ঘুমাতেও পারবি না। সব সময় চোখে চোখে রাখতে হবে ওটাকে। মন খারাপ হতে থাকবে। তার চেয়ে যদি না নিস্? তাহলে এই ঝামেলাটা আর হবেনা। নাক ডেকে ঘুমাতে পারবি। খেলতে পারবি, বেড়াতে পারবি। এখানে ওখানে নিশ্চিন্তে যেতে পারবি। আমি বুবুর ব্যাখ্যা শুনে তাজ্জব বনে যাই। ছোট্ট ঘিলুতে বড় বড় সম্পদ ভরছে -ভারী ভারী জিনিস INFUSE হচ্ছে- যা সোনার দলার চেয়েও দামী।
আমি বড় হয়েছি। বুলবুল বুবু নেই, চলে গেছেন ফিরদৌসে। কিন্তু আমাকে সুবিশাল এক সম্পত্তি দিয়ে গেছেন যা আমি যেনো ধারন করতেই পারছিনা। মনে হয় তার কথা, “তোর সামনে সোনার দলা পড়ে অছে, তুই সেটা নিবি না।” এ এক “রিপল ইফেক্ট” (RIPPLE EFFECT) -continuing and spreading results of an event or action.
আমি আরো বড় হয়েছি। বিজ্ঞান নিয়ে পড়ে বড় বড় পাশ দিয়েছি। অন্যের জিনিস অন্যায়ভাবে নেয়ার সাইকোলজিক্যাল ইফেক্ট নিয়ে অনেক পড়েছি। সেই ২ লাইনের ব্যাখ্যা যেনো শেষ হচ্ছেনা।
আল কুরআন পড়েছি। পড়েছি, “অন্যের সম্পদ আত্মসাত করার পরিনাম ভয়াবহ।”
আর তোমরা নিজদের মধ্যে তোমাদের সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়ো না এবং তা বিচারকদেরকে (ঘুষ হিসেবে) প্রদান করো না। যাতে মানুষের সম্পদের কোন অংশ পাপের মাধ্যমে জেনে বুঝে খেয়ে ফেলতে পারো।
আর তোমরা অন্যায় ভাবে পরস্পরের মাল গ্রাস করো না এবং জানা সত্ত্বেও অসত উপায়ে লোকের মাল গ্রাস করার উদ্দেশে তা বিচারকের নিকট নিয়ে যেয়ো না। -সূরা আল বাক্করাহ, ১৮৮ নং আয়াত
এই আয়াতে মানুষের সম্পদে স্বতন্ত্র অধিকার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একজন মানুষ অন্যায়ভাবে যেমন মিথ্যা শপথ, ডাকাতি, চুরি, ঘুষ নিয়ে ও সুদ খেয়ে অন্যের সম্পদ হরণ করবে তা হারাম।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদায় হজ্জে বলেন, একজন মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের মান-সম্মান, রক্ত, সম্পদ সবকিছু হারাম। (সহীহ বুখারী হা: ৬৮, সহীহ মুসলিম হা: ১৬৭৯)
হাফেয ইবনে কাসীর (রহঃ) বলেন: এখানে ঐ সব ব্যক্তিদের আলোচনা করা হচ্ছে, যাদের কাছে অপরের কোন প্রাপ্য থাকে কিন্তু প্রাপকের নিকট তার প্রাপ্য অধিকারের কোন প্রমাণ থাকে না, ফলে এ দুবর্লতার সুযোগ গ্রহণ করে সে আদালতের আশ্রয় নিয়ে বিচারকের মাধ্যমে নিজের পক্ষে ফায়সালা করিয়ে নেয় এবং এভাবে সে প্রাপকের অধিকার হরণ করে। এটা জুলুম ও হারাম। আদালতের ফায়সালা জুলুম ও হারামকে বৈধ ও হালাল করে দিতে পারে না। আদালত কেবল বাহ্যিক দিক অবলোকন করে বিচার করে।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আমি একজন মানুষ। লোকজন আমার নিকট বিবাদ নিয়ে উপস্থিত হয়ে থাকে। স্বভাবত একজন অপরজন অপেক্ষা বেশি যুক্তিতর্কে পারদর্শী হয়ে থাকে। তার যুক্তিপূর্ণ কথা শুনে আমি হয়তো তারই পক্ষে ফায়সালা দিয়ে থাকি (অথচ প্রকৃত ঘটনা এর বিপরীত)। তবে জেনে রাখ: যে ব্যক্তির পক্ষে এরূপ ফায়সালা দেয়ার ফলে কোন মুসলিমের হক আমি তাকে দিয়ে দেই, ওটা হবে তার জন্য জাহান্নামের আগুনের টুকরা। অতএব সেটা সে গ্রহণ করবে বা ছেড়ে দেবে। (সহীহ বুখারী হা: ২৬৮০)
কাতাদাহ (রহঃ) বলেন: হে আদম সন্তান! জেনে রাখ, বিচারকের মীমাংসা তোমার জন্য হারামকে হালাল এবং অন্যায়কে ন্যায় করে দিতে পারে না। বিচারক সাক্ষীদের সাক্ষ্য অনুসারে বাহ্যিক অবস্থা দেখে বিচার করে। তাছাড়া তিনি মানুষ, তার দ্বারা ভুল হওয়াও সম্ভব। (তাফসীর ইবনে কাসীর, অত্র আয়তের তাফসীর)
অতএব এরূপ ধোঁকাবাজী ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে অন্যের সম্পদ ভোগ করলে এর বিনিময়ে তাকে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করতে হবে।
বান্দার হক কে আমরা তুচ্ছ মনে করি, কিন্তু বান্দার হক নষ্ট করা আল্লাহর হক নষ্ট করা হইতেও ভয়াবহ।
আল্লাহর হক নষ্ট করলে আল্লাহ চাইলে শির্ক ব্যতীত অন্য যে কোন গুনাহ ক্ষমা করতে পারেন বলে আমাদের বলেছেন!
নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে! এছাড়া যাকে ইচ্ছা, ক্ষমা করেন! যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়! (সূরা নিসা: ১১৬)
তবে এই আয়াতে উল্লেখিত গুনাহ হচ্ছে নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাত যেগুলো আল্লাহর হক সেগুলো পালন না করার গুনাহ!
বান্দার হক নষ্ট করার গুনাহ ক্ষমা করার এখতিয়ার আল্লাহ নিজ হাতে রাখেন নি! যেমন, আমি যদি একজনকে ধোঁকা দিয়ে ১ টি টাকাও নিয়ে নিই, কোন কথা বা গালির সাহায্যে মনে কষ্ট দেই, তবে একমাত্র সেই লোক (যার হক নষ্ট করলাম) সে বাদে আর কেউ ক্ষমা করতে পারবে না!
প্রকৃত মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার কথা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে! আর মুহাজির সেই ব্যক্তি, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা যে পরিত্যাগ করে! (সহীহুল বুখারী: ৬৪৮৪)
একজন মানুষের মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে তার মুসলিম ভাইকে হেয় মনে করে! এক মুসলিমের রক্ত, সম্পদ ও মান-সম্মান অন্য মুসলিমের জন্য হারাম! (সহিহ মুসলিম: ৬৪৩৫)
মহান আল্লাহ, সুরা হুজুরাত-এর পরপর তিনটি আয়াতে হাক্কুল ইবাদ বা বান্দার হক সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করছেন! ঝগড়া হলে মীমাংসা করে নেওয়াঃ-
নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই, তাই তোমাদের ভাইদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও আর আল্লাহকে ভয় কর যেন তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও! (আল-হুজুরাত, ৪৯/১০)
বুলবুল বুবু আমাকে মাত্র দু’লাইন পড়িয়েছেন। বুবু ব্যাখ্যা কোরে যা বুঝিয়েছেন সেই ব্যাখ্যা যে এত বড় পরিসরের হবে তা বুঝতে পারিনি।
আমি এখনো পড়ছি কেবল পড়ছি।
শেষ হয়না এই “রিপল ইফেক্ট।”

“শীল যায় কিল খায়।”

বাবার কাছে শিখিঃ বিন্দুর মধ্যে সিন্ধুর গভীরতা
মদনমোহন তর্কালঙ্কার বাবুর “শিশু শিক্ষা” বইয়ের কথা ১ম শ্রেণিতেই।
শব্দগুলো কোন দিন শুনিনি, এর আগেও পড়িনি। বাড়ীতে শিল-পাটা দেখি রোজই। বাবাকে প্রশ্ন করি, “বাবা এটা কি শিল-পাটার শিল?”
বাবা ছেলের প্রশ্ন শুনে হাসে। বুকে টেনে নিয়ে বলে, “না রে সোনা, এটা সেই শিল নয় রে।”
আরো খোলাসা করে বাবা বল্লেন, এই শীল খুবই দামী। মহা-মূল্যবান। “শীল” মানে হলো চরিত্র। তুমি যা পড়ছো তা যদি জীবনে কাজে লাগাতে পারো, লোকে তোমায় মাথায় তুলে রাখবে। আর মনে রাখবে, “শীল চলে গেলেই , চরিত্র খারাপ হলেই “কিল” খেতে হবে। মানে তোমাকে হীন হতে হবে, অপমানিত হতে হবে পদে পদে। মার খেতে হবে সবখানে।
“শীল যায় কিল খায়।”
কথাগুলোর প্রতিধ্বনি চলছেই। আমার জীবনে। এখনো।