Thursday, February 23, 2023

কলা

 Origin Of Banana

কলা নামক ফলটি আসলে কী-কোথায় এর উত্‍পত্তি?
কলা (Banana) নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণা হয়েছে। যেখানে দেখা গিয়েছে যে এর ভিতরে এমন তিনটি জেনেটিক মার্কার রয়েছে, যা তিনটি ভিন্ন বন্য কলার (Wild Banana)। কিন্তু এমন কলা সারা বিশ্বে আবিষ্কৃত হয়নি। কলা পাকলে হলুদ রঙের হয়। মিষ্টি, নরম এবং মসৃণ হয়। কিন্তু আসলে একটি কলা আপনি যা ভাবেন তা নয়। এগুলি হলুদ, সবুজ, নীল, বাল্বের মতো, বীজযুক্ত বা বীজহীন হতে পারে। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম কলা।
পৃথিবীতে অনেক ধরনের, অনেক আকারের ও রঙের কলা পাওয়া যায়। উদ্ভিদবিদ জুলি সার্ডোস (Julie Sardos) বলেন, 'কলার বৈচিত্র্য সমগ্র বিশ্বে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। আমরা আমাদের অনুসন্ধানে জানতে পেরেছি বর্তমানে সারা বিশ্বে যে সাধারণ কলা খাওয়া হচ্ছে তা তিনটি বন্য কলা থেকে এসেছে। কিন্তু তিনটি বুনো কলা সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না। এমনকি খুঁজেও পাওয়া যায়নি। কলার এই তিন বন্য পূর্বপুরুষ মিলিত হলে মনে হয় কলা নিয়ে আমাদের চিন্তাধারা বদলে যাবে।'
বন্য কলা (Wild Bananas), যাকে বৈজ্ঞানিকভাবে Musa Acuminata বলা হয়। এর মধ্যে অনেক বীজ আছে। এটা খাওয়া যাবে না। মুসা প্যারাডিসিকা হলো কাঁচ কলা। বিজ্ঞানীরা মনে করেন কলার ইতিহাস ৭ হাজার বছরের পুরনো। আমরা এখন যে কলা খাচ্ছি, তার জন্ম ৭ হাজার বছর আগে পাপুয়া নিউ গিনিতে (Papua New Guinea)। তখনকার মানুষ কলার উৎপাদন করত, তাও কোনও সার ছাড়াই। তারপর প্রথমবার বীজ ছাড়াই কলা বের হলো। এটা খাওয়ার মতো ছিল। কিন্তু কীভাবে উৎপাদন করা হয়েছিল, তা আমরা জানি না।
কীভাবে সারা বিশ্বে কলা ছড়িয়ে পড়ল?
পাপুয়া নিউগিনি থেকে বাণিজ্যপথে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ভারতে কলা পৌঁছেছিল। এখানে আসার পর ক্রসব্রিড হয়েছে। আরও অনেক জাতের কলা তৈরি হতে থাকে। ছোট কলা, মোটা কলা, হাই পাল্প কলা, পাতলা কলা, হাই পাল্প কলা ইত্যাদি। বিভিন্ন রঙের কলা। মিষ্টি কম আর মিষ্টি বেশি। আপনি শুধু ভারতেই দেখুন, কয়েক ডজন ধরনের কলা পাবেন। কেরলের লাল রঙের কলা এবং ভুসাওয়ালের হলুদ কলা। গ্রোস মিশেল Gros Michel ("বিগ মাইক") কলার একটি রপ্তানি জাত এবং 1950 এর দশক পর্যন্ত এটি প্রধান জাত ছিল।
এভাবেই তিন বন্য কলার কথা জানতে পারেন বিজ্ঞানীরা
জুলি সার্ডোস বলেন, 'আমরা কম্পিউটারে তিনটি কলার জেনেটিক মার্কার দেখেছি। কোন রুট থেকে তারা মিলিত হয়েছে, তা খুঁজে বের করেছি। তদন্ত এখনও চলছে। এই কলা কোথা থেকে শুরু হয়েছে তা এই তদন্তে জানা যাবে। তাদের ক্রসব্রিডিং কোথায় করা হয়েছিল? কলার আগে বড় বীজ ছিল, কীভাবে বীজহীন ফল হয়ে উঠল, তাও জানা যাবে।'
বিজ্ঞানীরা কী পেয়েছেন?
তিনটি বন্য কলার জেনেটিক মার্কারগুলির মধ্যে একটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। দ্বিতীয়টি স্থানীয়ভাবে বোর্নিও দ্বীপে প্রজনন করা হয়েছিল। তৃতীয়টি এসেছে পাপুয়া নিউ গিনির কলা থেকে। এসব জায়গা থেকে জেনেটিক চরিত্র অবশ্যই পাওয়া যায়, কিন্তু তার পরেও কলা সবচেয়ে রহস্যময় ফল। তাদের গোপন কথা প্রকাশ করা হচ্ছে না। জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞানী জেমস লাইবেনস ম্যাক বলেন, সার্ডোসের তথ্য থেকে জানা যায় যে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের কোথাও কলা জন্মেছিল।
আগে কলা নরম ফল ছিল না:
কলা ছিল বীজসহ প্রথম শক্ত ফল, যা খাওয়া যেত না। তাহলে হঠাৎ করে মিষ্টি মণ্ডসহ বীজহীন ফল হল কী করে? এই প্রশ্নের উত্তরে জুলি বলেছেন, 'কলার প্রজনন এত সহজ নয়। একটি ভোজ্য কলা তৈরি করা সহজ নয়। আপনাকে এক জাতের কলা অন্য জাতের সঙ্গে ক্রসব্রিড করতে হবে। এটা যে সফল হবেই তা নয়। তারপর কলা এমন হতে হবে, যেন খেতে হয়। অন্যথায় প্রজনন নষ্ট হয়ে যাবে। এই গবেষণাটি সম্প্রতি ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে।'

জামাতে নামায পড়া কেন?

 নামাজ আদায়কারীদের অনেকেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মসজিদে আসেন। মসজিদে নামাজ পড়তে এলে তাঁদের পরস্পরের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। মসজিদে জামাতে নামাজ আদায়ের অশেষ সওয়াব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জামাতে নামাজ পড়ার ফজিলত একা পড়ার চেয়ে ২৭ গুণ বেশি। (বুখারি শরিফ)

মসজিদে নামাজ আদায় করলে বান্দার আত্মিক উন্নতি হয়। সামাজিক ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। জামাতে নামাজ আদায় করায় মুসলমানরা দৈনিক পাঁচবার একত্রে মিলিত হওয়ার সুযোগ পান। ফলে তাদের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে ওঠে। একতাবদ্ধ হয়ে সত কাজ করার শিক্ষা জামাতে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে অর্জন করা যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নামাজের প্রথম সারি হলো ফেরেশতাদের সারির মতো। তোমরা যদি প্রথম সারির মর্যাদা সম্পর্কে জানতে, তবে তা পাওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়তে। মনে রেখো, একা নামাজ পড়ার চেয়ে দুই ব্যক্তির একত্রে নামাজ পড়া উত্তম। আর দুই ব্যক্তির একত্রে নামাজ পড়ার চেয়ে তিন ব্যক্তির একত্রে নামাজ পড়া উত্তম। এভাবে যত বেশি লোকের জামাত হবে, তা আল্লাহর কাছে তত বেশি প্রিয় হবে।’
একবার এক অন্ধ ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমার এমন কেউ নেই, যে আমাকে হাত ধরে মসজিদে আনবে।’ অতঃপর লোকটি মসজিদে উপস্থিত হওয়া থেকে অব্যাহতি চান এবং ঘরে নামাজ পড়ার অনুমতি চান। রাসুলুল্লাহ তাঁকে ঘরে নামাজ পড়ার অনুমতি দিয়ে দেন। লোকটি রওনা করলে রাসুলুল্লাহ তাঁকে পুনরায় ডেকে পাঠান। লোকটি ফিরে আসেন। রাসুলুল্লাহ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘তুমি কি আজান শুনতে পাও?’ লোকটি বললেন, ‘হ্যাঁ, শুনতে পাই।’ রাসুলুল্লাহ বললেন, ‘তাহলে তুমি মসজিদে উপস্থিত হবে।’ তারপর বললেন, ‘ফজর ও এশার নামাজ মুনাফিকদের জন্য অন্যান্য নামাজের তুলনায় বেশি কষ্টকর। তোমরা যদি জানতে এ দুটি নামাজের মধ্যে কী পরিমাণ সওয়াব নিহিত আছে, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও নামাজে উপস্থিত হতে।’
-.prothomalo

সূরা ফাতিহা সালাতে অত্যাবশ্যকীয়

 সুরা ফাতিহা এমন এক সুরা, কেউ যখন এর একটি করে আয়াত পড়তে থাকে, আল্লাহ সঙ্গে সঙ্গে সেই আয়াতের জবাব দিতে থাকেন। এই সুরা যেন আল্লাহর সঙ্গে তাঁর বান্দার সরাসরি যোগাযোগ।

সুরা ফাতিহার অর্থ আবার দেখে নিই:
সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই।
যিনি পরম করুণাময়, পরম দয়াময়;
বিচার দিনের মালিক।
আমরা তোমারই উপাসনা করি, তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি;
তুমি আমাদের চালিত করো সঠিক পথে,
তাঁদের পথে, যাঁদের তুমি অনুগ্রহ দান করেছ,
যারা (তোমার) রোষে পতিত হয়নি, পথভ্রষ্ট হয়নি।
এই সাতটি আয়াতের মধ্যে প্রথম তিনটি আয়াতে আছে আল্লাহর পরিচয়। আর শেষ তিন আয়াতে আছে আল্লাহর কাছে আমাদের প্রার্থনা।
আল্লাহর পরিচয় হিসেবে বলা হয়েছে, তিনি পরম দয়ালু ও করুণাময়; কারণ তিনিই মহাবিশ্বের প্রতিপালন করছেন। তাই তিনিই আমাদের মাফ করে দেওয়ার চূড়ান্ত অধিকারী। তিনি যেহেতু বিচার দিবসের প্রভূ, সেই বিচারে তিনিই আমাদের প্রতি দয়া বর্ষণ করার একমাত্র ত্রাণকর্তা।
সুরাটির শেষ তিন আয়াতের প্রথমেই আল্লাহর কাছে আমরা সরল পথ দেখিয়ে দেওয়ার পথনির্দেশ চাচ্ছি। কোন পথ সরল? আল্লাহ তায়ালা নবী-রাসুলকে যে পথে চালিত করেছেন। এটি হলো আল্লাহর কাছে আমাদের প্রত্যাশা। যিনি নবী-রাসুলদের পথ দেখিয়েছেন, তিনি ছাড়া আমাদের কে আর সর্বোত্তম পথ দেখাতে পারেন!
প্রথম অংশে আল্লাহর পরিচয় আর শেষ অংশে আল্লাহর কাছে আমাদের প্রত্যাশার মাঝখানে বলা হয়েছে, ‘ইয়া কানা বুদু ওয়া ইয়া কানাস্তাইন।’ অর্থাত, ‘আমরা তোমারই উপাসনা করি, তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।’ এই আয়াতকে বলতে পারি আল্লাহর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। তাঁর কাছে আমাদের নিঃশর্ত আত্মনিবেদনের সম্পর্ক। আমাদের একমাত্র ইবাদত আল্লাহরই প্রতি। সব সাহায্যও আমরা তাঁর কাছেই চাই।
সুরাটির শেষাংশের প্রথম আয়াতে বলা হচ্ছে, তুমি আমাদের সরল পথ দেখাও। এর পরেই কথাটি আরেকটু বিশদ করে পর পর দুই আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ যাঁদের পরম অনুগ্রহ করেছেন, তাঁদেরকে দেখানো পথটিই হলো এ সরল পথ। কারা আল্লাহর এই অনুগ্রহ পেয়েছেন? যাঁরা পথভ্রষ্ট হননি। এ জন্য তাঁরা আল্লাহর ক্রোধেরও শিকার হননি।
-prothomalo

নবী, রাসূলদের ভাষা

 মাতৃভাষা আল্লাহর সেরা দান। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে মনের ভাব ব্যক্ত করতে মাতৃভাষা দান করেছেন। ভাষা অন্যান্য প্রাণীর ওপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম দিক। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘দয়াময় আল্লাহ, তিনিই শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন, তিনিই সৃষ্টি করেছেন মানুষ, তিনিই তাকে শিখিয়েছেন ভাব প্রকাশ করতে।’ (সুরা আর-রহমান, আয়াত : ১-৪)

পৃথিবীতে বৈচিত্র্যময় ভাষা দান করেছেন। ভাষার এই বৈচিত্র্য আল্লাহর নিদর্শনের অংশ। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে আছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে জ্ঞানীদের জন্য অবশ্যই বহু নিদর্শন আছে।’ (সুরা রুম, আয়াত : ২২)
নবীরা মাতৃভাষায় কথা বলতেন : আল্লাহ তাআলা সব নবীকে তাঁর স্বজাতির ভাষা দিয়ে প্রেরণ করেছেন। তাঁরা নিজ নিজ জাতিকে মাতৃভাষায় আল্লাহর পথে আহ্বান করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি প্রত্যেক রাসুলকে স্বজাতির ভাষাতেই পাঠিয়েছি, যাতে সে তাদের কাছে বর্ণনা দেয়।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ০৪)
আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ প্রত্যেক নবীকে তাঁর স্বজাতির ভাষায় প্রেরণ করেছেন।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ২১৪১০)
আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, ‘রাসুলরা মাতৃভাষাভাষী হওয়ার কারণ হচ্ছে, যেন তাদের জাতি রাসুল প্রেরণের উদ্দেশ্য এবং তাঁরা কী নিয়ে প্রেরিত হয়েছেন তা বুঝতে পারেন।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির : ৪/৪৭৭)
মাতৃভাষায় দক্ষ ছিলেন রাসুলরা : নবী (আ.) শুধু মাতৃভাষায় ধর্ম প্রচার করেননি; বরং তাঁরা ছিলেন নিজ নিজ ভাষায় পাণ্ডিত্যের অধিকারী। সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও আলংকারিক ভাষার কৃতিত্বধারী। পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত থেকে যা অনুমান করা যায়। কোরআনে মুসা (আ.)-এর ভাষ্যে হারুন (আ.)-এর প্রশংসা করে বলা হয়েছে, ‘আর আমার ভাই হারুন, সে আমার চেয়ে বিশুদ্ধ ভাষার অধিকারী, তাই তাকে আমার সঙ্গে সাহায্যকারী হিসেবে প্রেরণ করুন, সে আমাকে সমর্থন করবে।’ (সুরা কাসাস, আয়াত : ৩৪)
নবীজি (সা.)-এর ভাষাগত দক্ষতা : শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভি (রহ.) মহানবী (সা.)-এর ভাষাগত দক্ষতা সম্পর্কে লেখেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মুবারক ভাষার বিশুদ্ধতা, একই বাক্যে বহু বাক্যের সমাবেশ, অভূতপূর্ব বাচনভঙ্গি, অমূল্য নির্দেশ ও সমাধান এত বেশি থাকত যা কোনো গবেষক ও চিন্তাবিদ কোনো সীমা ও গণনার মধ্যে আবদ্ধ করতে পারবে না। তাঁর ভাষার মাধুর্য, গভীরত্ব ও সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কেননা আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে অধিক শুদ্ধ ও সুমধুর ভাষার অধিকারী কাউকে সৃষ্টিই করেননি।
একবার ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেন যে হে আল্লাহর রাসুল, না আপনি বাইরে ভিনদেশে কোথাও গেছেন, না আপনি বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে ওঠা-বসা করেছেন, তবু আপনি এত সুন্দর শুদ্ধভাষা কোথা থেকে পেলেন? রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ইসমাইল (আ.)-এর ভাষা ও পরিভাষা যা দুষ্প্রাপ্য ও বিলীন হয়ে গিয়েছিল তা আমার কাছে জিবরাইল (আ.) নিয়ে আসেন এবং তা আমি আত্মস্থ করেছি। উপরন্তু তিনি বলেন, আমার প্রভু আমাকে (আদব) ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন, ফলে আমার ভাষাকে অতি উত্তম করে দিয়েছেন। যে শিক্ষা আরবি ভাষা, তার শুদ্ধতা, অলংকার, সৌন্দর্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত তাকে আরবরা আদব বলে। (মাদারিজুন নুবুওয়াহ)
কোন নবীর ভাষা কী ছিল : কোরআনের বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয় যে নবী-রাসুল (আ.) মাতৃভাষায় কথা বলতেন এবং মাতৃভাষাতেই মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। নবী-রাসুলদের ভাষা সম্পর্কে যেসব ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়, তা হলো—
১. আদম (আ.) : পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও প্রথম নবী আদম (আ.) জান্নাতে আরবি ভাষায় কথা বলতেন। তবে পৃথিবীতে আগমনের পর তিনি সিরিয়াক ভাষায় কথা বলেন। যাকে সিরিয়াক অ্যারামিক ভাষাও বলা হয়।
২. নুহ, শিশ, ইউনুস ও ইদরিস (আ.) : সিরিয়াক ভাষায় কথা বলতেন।
৩. হুদ ও সালিহ (আ.) : আরবি ভাষায় কথা বলতেন।
৪. ইবরাহিম (আ.) : তাঁর মাতৃভাষা ছিল সিরিয়াক। তবে তিনি আরবি ভাষায়ও পারদর্শী ছিলেন।
৫. লুত ও ইয়াকুব (আ.) : তাঁরাও সিরিয়াক ও আরবি উভয় ভাষায় পারদর্শী ছিলেন।
৬. ইসমাইল, আইয়ুব ও শোয়াইব (আ.) : আরবি ভাষায় কথা বলতেন।
৭. ইউসুফ (আ.) : শৈশবে তিনি আরবি ভাষায় কথা বলতেন। তবে মিসরে আগমনের পর প্রাচীন মিসরীয় ভাষা কিবতি ভাষায় কথা বলতেন।
৮. দাউদ ও সুলাইমান (আ.) : অ্যারামিক (সিরিয়াক ভাষার উপভাষা ও হিব্রুর প্রাচীনরূপ) ভাষায় কথা বলতেন। তবে তাঁরা আরবি ভাষায়ও পারদর্শী ছিলেন।
৯. মুসা ও হারুন (আ.) : তাঁরা প্রাচীন মিসরীয় কিবতি ভাষায় কথা বলতেন। তবে তিনি মাদায়েনে হিজরত করার পর আরবি ভাষা রপ্ত করেন। তবে মিসরের বনি ইসরাঈলরা অ্যারামিক (হিব্রু) ভাষায় কথা বলত।
১০. ইউশা বিন নুন (আ.) : তিনি মূলত আরবি ভাষায় কথা বলতেন। তবে প্রাচীন মিসরীয় কিবতি ভাষাও জানতেন।
১১. জাকারিয়া, ঈসা ও ইয়াহইয়া (আ.) : তাঁরা অ্যারামিক ভাষায় কথা বলতেন। তবে তাঁরা আরবি ভাষাও জানতেন।
১২. মুহাম্মদ (সা.) : তিনি আরবি ভাষায় কথা বলতেন। তিনি ছিলেন আরবের সবচেয়ে বিশুদ্ধ ভাষার অধিকারী।
মতভিন্নতা ও সমাধান : নবীদের মাতৃভাষা নিয়ে ঐতিহাসিকদের ভেতর মতভিন্নতা আছে। তবে বেশির ভাগ মতের মধ্যেই সমন্বয় করা সম্ভব। যেমন ঈসা (আ.)-এর ভাষার বিষয়ে দুটি মত হলো অ্যারামিক ও হিব্রু। মূলত অ্যারামিক হলো হিব্রু ভাষার প্রাচীনরূপ। হিব্রু অ্যারামিকের বিবর্তিত রূপ। তাই মৌলিকভাবে উভয় মতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই।
সূত্রঃ (ফিকরাহ ডটকম ও আল-মুলাক্কাস ডটকম)
আতাউর রহমান খসরু

মানুষ তাড়াহুড়ো প্রবণ

 ইসলামে কোনো কাজে তাড়াহুড়ো পছন্দনীয় নয়। বরং সব কাজে ধীরস্থিরতা ও মধ্যপন্থা অবলম্বন করা মুসলমানের গুণ। আল্লাহর রাসুল (সা.) সব কাজে ধীরস্থিরতা ও গাম্ভীর্য পছন্দ করতেন। সাহাবায়ে কেরামকেও এমনই শিক্ষা দিতেন প্রিয় নবী (সা.)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুলকে (সা.) বলতে শুনেছি, ‘যখন নামাজের জন্য ইকামত দেওয়া হয় তখন তোমরা দৌড়ে আসবে না, বরং তোমরা গাম্ভীর্য সহকারে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে আসবে। তারপর যতটুকু নামাজ (ইমামের সঙ্গে) পাবে, পড়ে নেবে। আর যতটুকু ছুটে যাবে, (সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে) নিজে পূর্ণ করে নেবে। (বুখারি: ৬৩৬; মুসলিম: ৬০২)

ইবাদত-বন্দেগি ছাড়াও প্রাত্যহিক কাজকর্মেও তাড়াহুড়ো প্রবণতা পরিহার করা। অনেককেই দেখা যায় নিজস্ব কর্মসম্পাদন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাড়াহুড়োর আশ্রয় নিয়ে থাকেন। এটা মানুষের সৃষ্টিগত বিষয় হলেও একটি নিন্দনীয় স্বভাব। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষ সৃষ্টিগতভাবে তাড়াহুড়োপ্রবণ, অচিরেই আমি তোমাদের আমার নিদর্শনাবলি দেখাব; কাজেই তোমরা তাড়াহুড়ো করো না।’ (সুরা আম্বিয়া: ৩৭)। কুরআনের অন্যত্র এটাকে মানুষের দুর্বলতারূপে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘মানুষ অত্যন্ত তাড়াহুড়োপ্রবণ।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ১১)। আয়াত দুটির মূলকথা হলো তাড়াহুড়ো প্রবণতা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। (তাফসিরে কুরতুবি)
তাড়াহুড়ো অনেক সময় ক্ষতি ডেকে আনে। কাজেই কোনো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে একদম তাড়াহুড়ো করা উচিত নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ধৈর্য ও স্থিরতা আল্লাহর পক্ষ থেকে আর তাড়াহুড়ো শয়তানের পক্ষ থেকে।’ (তিরমিজি: ২০১২)
তাড়াহুড়ো কোনো কাজ যথার্থ হয় না; বরং যেকোনো কাজে রাসুল (সা.) উম্মতকে পরামর্শের সুন্নাহ শিখিয়েছেন। ইসতিখারার দীক্ষা দিয়েছেন। যার সবগুলোতেই তাড়াহুড়ো বর্জনের শিক্ষা পাওয়া যায়। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম জাওজিয়্যাহ (রহ.) বলেন, তাড়াহুড়োকে শয়তানের কাজ হিসেবে উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে; তাড়াহুড়ো করে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় বা কোনো কাজ সম্পাদন করা হয়, এতে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, উত্তেজনা কিংবা ক্রোধ শামিল থাকে। এর ফলে বান্দার আত্মমর্যাদা ও ব্যক্তিত্বের হানি ঘটে। ক্ষেত্রবিশেষে এই তাড়াহুড়োর জন্য ব্যক্তিকে অপমান ও অপদস্থতার সম্মুখীনও হতে হয়।
কোনো কারণে কারও ওপর ক্ষুব্ধ হলেও ক্রোধ প্রকাশে তাড়াহুড়ো করা মোটেও সমীচীন নয়। এতে এক দিন তা আক্ষেপের কারণ হতে পারে। ঠিক তেমনি কাউকে ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করার আগে ভালোবাসা বা ঘৃণা করা কোনোটিই সঙ্গত নয়। কারণ এক দিন তা অনুশোচনার উপলক্ষ হতে পারে। মানুষ অন্যের
গিবত-শিকায়েত করতেও তাড়াহুড়ো করে ফেলে। একজন মানুষের কোনো বিষয় খারাপ লাগতেই পারে। কিন্তু তাকে পর্যাপ্ত সময় পর্যবেক্ষণ না করে সমালোচনায় লিপ্ত হলে এক দিন এর জন্য লজ্জায় মাথা নত হয়ে আসতে পারে। ইসলাম নির্দেশিত ভদ্রতা ও সৌজন্যতা রক্ষা করে চললে, মুমিন ভাইদের হক সম্পর্কে সচেতন থাকলে এই লজ্জাকর পরিস্থিতিতে নিশ্চয়ই কাউকে পড়তে হবে না। সর্বক্ষেত্রে ভারসাম্য ও মধ্যম পন্থা অবলম্বন করাই ইসলামের শিক্ষা। তাই আসুন আমরা তাড়াহুড়োর মানসিকতা পরিহার করি। কারণ এটি একটি আত্মিক ব্যাধি, যার উতস হচ্ছে মানসিক অস্থিরতা, অহঙ্কার আর ইসলামের জ্ঞানের অভাব। তবে উতস যা-ই হোক, সর্বাবস্থায় তা নিন্দনীয় ও বর্জনীয়। আল্লাহ সবাইকে তাড়াহুড়ো প্রবণতা পরিহার করে সর্বক্ষেত্রে ধীরস্থিরতা অবলম্বনের তওফিক দান করুন। আমিন।
shomoyeralo

Sunday, January 29, 2023

মহাবিশ্বের জ্ঞান অর্জনে কুরআনি তাগিদ

 

মহাবিশ্বের জ্ঞান অর্জন কোনো বিলাসী কাজ নয়। এ বিষয়ে পশ্চিমা জগত এগিয়ে চলছে দ্রুত গতিতে, কিন্তু বর্তমানে মুসলমানদের এ ব্যাপারে কোনো চেতনা নেই। অথচ মহাকাশ গবেষণা ঈমানকে মজবুত করার জন্য অপরিহার্য। আল্লাহতা’য়ালাই আমাদের প্রকাশমান বিশ্বলোক সম্পর্কে চিন্তা ও গবেষণা করার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টির ব্যাপারে কুরআনপাকে এরশাদ হচ্ছে-
“ইন্না ফি খালকিস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি ওয়াখতিলাফিল লাইলি ওয়ান্নাহারে লাআয়াইতিল্ লি উলিল আলবাবিল্লাজিনা ইয়াজ কুরুনাল্লাহা কিয়ামাওঁ ওয়া কুয়ুদা ওয়া য়ালা জুনুবিহিম ওয়া ইয়াতাফাক্কারুনা ফি খালকিস্ সামাওয়াতে ওয়াল আরদি... (আলে ইমরান-১৯০)
অর্থাত- আকাশমন্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে; দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে, নিশ্চিত নিদর্শনাবলী রয়েছে প্রকৃত বুদ্ধিমান লোকদের জন্য। যারা আল্লাহকে স্মরণ করে দাঁড়িয়ে বসা ও শায়িত অবস্থায় সর্বক্ষণ এবং আকাশমন্ডল ও পৃথিবী সৃষ্টি পর্যায়ে চিন্তা-ভাবনা করে।
এই চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণার ফলশ্রুতিতে একজন ঈমানদার পরম সত্যে উপনীত হয় এবং মহান আল্লাহর একমাত্র সৃষ্টিকর্তা হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় লাভ করে।
মহান আল্লাহ আকাশ গবেষণার তাগিদ দিয়ে ইরশাদ করেন-
“আফালাম ইয়ানজুরু ইলাস্ সামায়ে ফাওকাহুম কাইফা বানাইনাহা ওয়া ঝাইয়ান্নাহা ওয়া মালাহা মিন ফুরুজ। ওয়াল আরদা মাদাদনাহা ওয়া আলকাইনা ফিহা রাওয়াসিআ ওয়া আনবাতনা মিন কুল্লি ঝাওজেম্ বাহিজ। ( কাফ-৬-৭)
অর্থাত-ওরা কি কখন ও ওদের উপর অবস্থিত আকাশমন্ডলের দিকে দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে দেখছে কিভাবে তা আমরা নির্মাণ করেছি, সুসজ্জিত ও সৌন্দর্যমন্ডিত বানিয়েছি এবং তাতে কোনো ফাঁক ফাটল নেই? আর যমীনকে আমরা সুবিন্যস্ত করেছি, তার বুকে বড় বড় পর্বতরাশি দাঁড় করিয়ে দিয়েছি এবং তাতে তরতাজা চাকচিক্যময় জোড়াসমূহ উতপাদন করেছি?
সুসজ্জিত সুবিন্যস্ত আকাশমন্ডল মানুষের নিকট চিরদিনের জন্য এক মহাবিস্ময়ের ব্যাপার। আধুনিক বিজ্ঞানের গবেষণার ফলে এই মহাবিস্ময় আরও বিস্ময়কর হয়ে উঠেছে। কিন্তু এ ব্যাপারে মুসলমানদের আবদান আরও ব্যাপক হওয়া উচিত ছিল।
বিশ্ব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু হয় বেশ পরে। ইসলামের প্রথমদিকে দীনের মৌলিক শিক্ষা প্রচার ও বাস্তবায়নে বহু বছর কেটে যায়। পরে হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যভাগে শিয়া মতবাদের ছায়াতলে ইখওয়ানুস সাফা নামে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হয়। এই দলটির প্রকৃত অবদান হলো তাদের জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চা। তারা অংক, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা দর্শন, সঙ্গীত প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রবন্ধ রচনা করেন।
জ্যোতিষ শাস্ত্রের উতকর্ষতা শুরু হয় খলিফা আল মামুনের কালে (৮১৯-’৩৩ খ্রিঃ)। মামুনের রাজত্বকালে অনুবাদ কার্যের ফলে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখায় ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। জ্যোতির্বিদ্যার প্রতি মামুনের প্রগাঢ় অনুরাগ ছিল এবং তিনি নিজেও একজন জ্যোতির্বিদ ছিলেন। জ্যোতির্বিদ্যা সম্বন্ধে ব্যাপক গবেষণা চালানোর জন্য তিনি বাগদাদের সন্নিকটে ট্যাডমোরের প্রান্তরে শামসিয়া নামক স্থানে মান মন্দির নির্মাণ করেন। এটিই ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মান মন্দির। খলিফা আল মামুনের সময় সিনদ বিন আলী এবং ইয়াহ বিন- আবি মনসুরের তত্ত্বাবধানে এই মান মন্দির নির্মিত হয়। আল মামুন দামেস্কের নিকট কাসিয়ুনেও একটি মান মন্দির নির্মাণ করেন। আব্বাসীয় খিলাফতের অন্যতম প্রখ্যাত জ্যোতির্বিদ আবু আল- আব্বাস আহমদ আল ফারগানী। পরবর্তী কালে স্পেনের জ্যোতির্বিদ মাসলামা আল মাজরিতি জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত সারণী বিশোধিত করেন। বুয়াইয়া আমলে বাগদাদে যে মানমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় উহাতে আবদুর রহমান আস সুফী, আহমদ আস সাগানী এবং আবু ওয়াফা গবেষণা কার্য পরিচালনা করেন। অনন্ত বিশ্ব সম্পর্কে জানার জন্য মামুনের উতসাহে আরব জ্যোতির্বিদদের নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করতে গিয়ে Draper বলেন, “The Arabs have left unfading trace of their fingers on the sky which every one can see who reads the names of the stars on an celestial globe.” অর্থাত “আরবগণ নভোমন্ডলে যে অম্লান হস্তছাপ রেখেছেন তা যে কোনো ব্যক্তি ভূমন্ডলের নক্ষত্র সম্বন্ধীয় জ্ঞার আহরণকালে উপলব্ধি করতে পারবেন।”
ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্যোতির্বিদ আল বাত্তানী (৮৭৭-৯১৮) খ্রিঃ রাক্কায় জ্যোতিষ শাস্ত্র গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। মৌলিক গবেষণায় তার যথেষ্ট অবদান রয়েছে। টলেমির সূত্র পরিবর্তন করে তিনি চন্দ্র এবং বিভিন্ন গ্রহের কক্ষ পথ সম্পর্কে অবিনব মত প্রতিষ্ঠা করেন। সুলতান মাহমুদের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি জ্যোতিষ শাস্ত্রের সমসাময়িক তত্ত্বাবলীর সমন্বয়ে “আল কানুন উল মাসূদী ফিল হাইওয়ান নজুম” শীর্ষক একটি গবেষণা প্রসূত গ্রন্থ ১০৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রণয়ন করেন।
বৈজ্ঞানিক কার্যকলাপ নবম ও দশম শতাব্দীতে সম্পূর্ণরূপে না হলেও, প্রভূত পরিমাণে তাইগ্রিস ও ফোরাত নদীর উপত্যকায় কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। দশম শতাব্দীর প্রথম চল্লিশ বছরের মধ্যে খলিফারা দীর্ঘদিনের জন্য পার্থিব ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত হয়ে গেলেন। বাগদাদ এবং পারস্যের উভয়স্থলে, প্রথমটিতে পারসিকদের শাসনকালে এবং দ্বিতীয়টিতে কোনো তুর্কী বংশীয়দের শাসনকালে অন্ধকারময়তার যুগ শুরু হয়ে গৈল। একইসময় আরব সাম্রাজ্যের রাষ্ট্রশক্তি বৈজ্ঞানিকদের পৃষ্ঠপোষকতা কমিয়ে দিলেন। যেমন খলিফা হাকিম ( ৯৯৬-১০২১) কর্তৃক কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত “বিজ্ঞান সভার” বার্ষিক বাজেট ছিল মাত্র ২৫৭ দিনার। এসব কারণে মুসলমানরা প্রতিযোগিতায় খ্রিস্টান ইউরোপের সঙ্গে টিকে থাকতে পারলো না। কারণ ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ইউরোপে নাগরিক জীবন ও শিল্প বাণিজ্যে বিবর্তন শুরু হয়ে যায়। ইউরোপের রেনেসাঁর সাথে প্রতিযোগিতায় মুসলমানগণ টিকে থাকতে পারলো না। পঞ্চদশ শতাব্দীর পরে ইসলামিক জগত বর্বরতায় পর্যবসিত হয়ে পড়েছিল। যে সমস্ত অনুকূল পরিবেশে মুসলমান সংস্কৃতি ও বৈজ্ঞানিক উন্নতি ঘটেছিল, বর্তমানে সেগুলোর অভাব। আজ তাই মুসলমানদের পুনরায় হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে কুরআনের ছায়াতলে আশ্রয় নিতে হবে।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে প্রচুর আয়াত রয়েছে মহাবিশ্ব সম্পর্কে চিন্তা গবেষণার তাগিদ দিয়ে যেমন-
“আলাম তারা কাইফা খালাকাল্লাহু সাবায়া সামাওয়াতেন তিবাকা, ওয়া জায়ালাল কামারা ফিহিন্না নুরাওঁ ওয়া জায়াআশ্ শামসা সিরাজা। ( নুহ- ১৫-১৬)
অর্থাত-তোমরা কি ভেবে দেখেছ আল্লাহ কিভাবে স্তর বিন্ন্যাস করে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন, তাতে চন্দ্রকে আলো বানিয়েছেন এবং সূর্যকে বানিয়েছেন প্রদীপ।
“কুল সিরু ফিল আরদে ফানজুরু কাইফা বাদায়াল খালকা (আল আনকাবুত-২০)
অর্থাত- বল হে নবী! তোমরা পৃথিবীতে পরিভ্রমণ কর অতঃপর লক্ষ্য করে দেখ, আল্লাহ সৃষ্টিকর্ম কিভাবে সৃষ্টি করেছেন।
“ওয়া কাআইয়িম্ মিন আয়াতিন ফিস্ সামাওয়াতে ওয়াল আরদে ইয়ার্মুরুরনা আলাইহা ওয়া হুম আনহা মু’রেদুন। (ইউসুফ- ১৫)
অর্থাত- মহাকাশ ও পৃথিবীতে অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। লোকেরা তার উপরে দৃষ্টি ফেলে চলে যায়, কিন্তু তার মর্ম বুঝতে ইচ্ছুক নয়।
এতসব নির্দেশ থাকার পরেও মুসলিম বিশ্ব এখনও নীরব। আজ যদি মুসলমানরা আবার গবেষণা কার্যে লেগে যায় তাহলে মহাবিশ্ব রহস্য তাদের হাতের মুঠোয় এসে যাবে।

সূত্র: মনসুর আহমদ

Wednesday, January 25, 2023

মানার খবর নেই অথচ নামাযের মতো গুরুত্বপূরণ কাজ করতে মসজিদে আসি

 সালাতে মোবাইল ফোন : জরুরি মাসয়ালা

এখন প্রায় প্রতিটি মসজিদের একই চিত্র যে, জামাতে সালাত চলা অবস্থায় মুসল্লির মোবাইলে রিং বেজে ওঠে। সালাত অবস্থায় মোবাইল বেজে উঠলে যার মোবাইল শুধু যে তার সালাতেরই বিঘ্ন ঘটায় এমন নয়; বরং আশপাশের মুসল্লিদেরও খুশুখুজু বিঘ্নিত হয়। সালাত অবস্থায় মসজিদে যেহেতু পিনপতন নীরবতা বিরাজ করে, তাই মোবাইল বেজে ওঠার সাথে সাথেই সবার ধ্যানখেয়াল চলে যায় মোবাইলের রিংটোনের দিকে। অথচ সালাত অন্য সব ইবাদত থেকে ভিন্ন ধরনের একটি ইবাদত। এ ইবাদতটি হলো সরাসরি আল্লাহ তায়ালার দরবারে হাজিরা দিয়ে তাঁর মহান সত্তার সামনে দণ্ডায়মান হয়ে তাঁর সাথে কথোপকথনের এক অপূর্ব মুহূর্ত। এ কারণেই সালাত অবস্থায় একাগ্রতা ও খুশুখুজুর প্রতি যেভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, অন্য কোনো ইবাদতের বেলায় তেমনটি করা হয়নি।
কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- ‘ওই সব মু’মিন সফলকাম, যারা নিজেদের সালাতে বিনয়-নম্র।’ (সূরা মু’মিনুন : ১-২) তাই একজন মুসল্লির উচিত মসজিদে প্রবেশের আগেই মোবাইল একেবারে বন্ধ না করলেও অন্তত রিংটোন বন্ধ করে দেয়া। এ অবস্থায় মোবাইলে ভাইব্রেশন দিয়ে রাখাও ঠিক নয়। কারণ ভাইব্রেশন দিয়ে রাখলেও কল এলে মুসল্লির মনোনিবেশ নষ্ট করে। এতে অন্যের সালাতের ক্ষতি না হলেও নিজের সালাতের খুশুখুজু নষ্ট হয় অবশ্যই। তা ছাড়া মোবাইলটি তখন পাশের মুসল্লির শরীরে স্পর্শ করলে তারও সালাতের একাগ্রতা নষ্ট হবে। তাই ভাইব্রেশন দিয়ে রাখাও ঠিক নয়; বরং হয়তো সাইলেন্ট করে রাখবে, কিংবা একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে। কোনো কারণে যদি সালাতের আগে মোবাইলের রিং বন্ধ করা না হয় আর সালাত পড়াবস্থায় রিং বেজে ওঠে তখন করণীয় ও লক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো নিম্নরূপ-
১. দুই হাত ব্যবহার না করে নামাজের আপন অবস্থায় থেকেই এক হাতের সাহায্যে মোবাইল পকেটে রেখেই কোনো বাটন চেপে রিং বন্ধ করে দেবে। আর পকেট থেকে বের করার প্রয়োজন হলেও এক হাত দিয়েই করবে। মোবাইল বের করে পকেটের কাছে রেখেই না দেখে দ্রুত বন্ধ করে পকেটে রেখে দেবে। জেনে রাখা প্রয়োজন, সালাতে প্রয়োজনে এক হাত কোনো কাজে ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে যেমন- টুপি উঠানোর জন্য, জামার হাতা নামানোর জন্য, সিজদার স্থানের কঙ্কর সরানোর জন্য, শরীরের কোনো স্থান বিশেষ প্রয়োজনে চুলকানোর জন্য ইত্যাদি। (ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ১/৫৬৪, শরহুল মুনিয়াহ-৪৪৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া-১/১০৫, খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ১/১২৯, রদ্দুল মুহতার : ১/৬২৪, শরহে নববী : ১/২০৫)
২. এক হাত দিয়ে বন্ধ করতে গিয়ে মোবাইল পকেট থেকে বের করে দেখে দেখে বন্ধ করা যাবে না। কারণ এমনটি করলে যদিও দুই হাত ব্যবহার হচ্ছে না, কিন্তু মোবাইল দেখে দেখে বন্ধ করা অবস্থায় এ ব্যক্তিকে কেউ দেখলে সে সালাতে আছে বলে মনে করবে না। আর সালাত অবস্থায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সালাত ভেঙে যায়। তাই সালাত অবস্থায় মোবাইল দেখে দেখে বন্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। (রদ্দুল মুহতার : ১/২৬৪-২৬৫, আলবাহরুর রায়েক : ২/১১-১২)
৩. সালাতে মোবাইল বন্ধের জন্য একসাথে দুই হাত ব্যবহার করা যাবে না। যদি একসাথে দুই হাত ব্যবহার করে তবে সালাত নষ্ট হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতার : ১/২৬৪-২৬৫, আলবাহরুর রায়েক : ২/১১-১২)
৪. সিজদাবস্থায় রিং বেজে উঠলে কেউ কেউ সিজদা থেকে প্রায় বসে গিয়ে মোবাইল বের করে বন্ধ করে থাকে। অথচ তখনো ইমাম-মুসল্লি সবাই সিজদাতেই থাকে। সালাতের এ অবস্থা থেকে মোবাইল বন্ধের জন্য বসে যাওয়াতে নামাজ ভেঙে যাবে। যদিও মোবাইল বন্ধ করাতে তিন তাসবিহ পরিমাণ সময় ব্যয় না হয়। কারণ যেখানে দুই হাতের ব্যবহারকেই সালাত ভঙ্গের কারণ বলা হয়েছে, সেখানে পুরো শরীরকে সালাতের অবস্থা থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা নিঃসন্দেহে সালাত ভঙ্গের কারণ হবে। এ ছাড়া এ অবস্থায় কোনো আগন্তুক তাকে দেখলে সে সালাতে নেই বলেই মনে করবে। এটিও আমলে কাসিরের অন্তর্ভুক্ত, যা সালাত নষ্টকারী।
৫. তিনবার বিশুদ্ধভাবে ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আজিম’ বা ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আলা’ বলা যায়- এ পরিমাণ সময়ের ভেতর উপরন্তু দু’বার পর্যন্ত এক হাতের সাহায্যে উপরোক্ত ১ নম্বরে উল্লেখিত নিয়মে রিং বন্ধ করা যাবে। এ সময়ের ভেতর দুইবারের বেশি বন্ধ করা যাবে না। যদি করে তবে সারাত নষ্ট হয়ে যাবে। হ্যাঁ, একবার বা দু’বার বন্ধ করার পর তিন তাসবিহ পরিমাণ বিলম্বে আবার রিং বেজে উঠলে তখন বন্ধ করা যাবে। মোট কথা, তিন তাসবিহ বলা যায় এ সময়ের ভেতর তিনবার রিং বন্ধের জন্য এক হাতও ব্যবহার করা যাবে না। এতে সালাত নষ্ট হয়ে যাবে। (খুলাসাতুল ফাতাওয়া : ১/১২৯, রদ্দুল মুহতার : ১/৬২৫, আহসানুল ফাতাওয়া : ৩/৪১৮-৪১৯)
৬. মোবাইল প্যান্টের পকেটে থাকলে তা বের করে বন্ধ করার জন্য দুই হাত ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। তদ্রƒপ ফোল্ডিং সেট হলেও রিং বা ফোন বন্ধ করতে কখনো কখনো দুই হাত ব্যবহার করার প্রয়োজন হয়। অথচ দুই হাত ব্যবহার করলে সালাত ভেঙে যায়। তাই এ ক্ষেত্রে কি নিজের সালাত নষ্ট করে হলেও রিং বন্ধ করবে? নাকি করবে না। মূলত সালাতে খুশুখুজুর গুরুত্ব অনেক বেশি। এতই বেশি যে, কোনো মুসল্লির মল-মূত্রের বেগ হওয়ার দরুন খুশুখুজু বিঘ্নিত হলে তার জন্য সালাত ছেড়ে দেয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে। ফিকহের কিতাবাদিতে এ ক্ষেত্রে সালাত ছেড়ে দেয়াকে উত্তম বলা হয়েছে। কেউ কেউ ওয়াজিবও বলেছেন। (তাহতাবি আলাল মারাকি-১৯৮, হিন্দিয়া : ১/১০৭, আল বাহরুল রায়েক : ১/২৮৭, রদ্দুল মুহতার : ১/৬৫৪)
তাহলে সালাত অবস্থায় মোবাইল বেজে উঠলে যার মোবাইল শুধু তার সালাতেরই বিঘ্ন ঘটায় না; বরং আশপাশের মুসল্লিদেরও খুশুখুজু বিঘনিত হয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে সালাত নষ্ট না করে বন্ধ করা সম্ভব না হলে সালাত ছেড়ে দিয়ে হলেও মোবাইল বন্ধ করা জায়েজ তো বটেই; বরং এমনটি করাই কর্তব্য। আর রিংটোন যদি গান বা মিউজিকের হয়, তবে এর খারাবি তো আরো অধিক। সুতরাং এ ধরনের পরিস্থিতিতে সালাতে থেকে উপরোক্ত নিয়ম অনুযায়ী এক হাত দিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হলে তাই করবে। আর তা সম্ভব না হলে নিজের সালাত ছেড়ে দিয়ে হলেও রিং বন্ধ করে দেবে। এরপর মাসবুকের ন্যায় আবার নতুন করে জামাতে শরিক হবে। (রদ্দুল মুহতার : ১/৬৫৫)
সোর্সঃ মুফতি পিয়ার মাহমুদ, সিনিয়র মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া মাখযানুল উলুম, তালতলা, ময়মনসিংহ