Sunday, April 16, 2023

খেজুরের ইতিহাস ছয় হাজার বছরের

 তখনো কিছুই সৃষ্টি হয়নি। কেবল বিশৃঙ্খল পানি। প্রধান দেবতা এলেদুমারে বসবাস করেন আকাশে। তার কাছ থেকেই পৃথিবী তৈরির অনুমতি নেন ওবাতালা। সমস্ত দেবতাদের থেকে স্বর্ণ সংগ্রহ করে তৈরি করেন লম্বা রশি। তারপর বেয়ে অবতরণ করলেন নিচে। বপন করলেন সঙ্গে নিয়ে আসা একটা খেজুরের বীজ। বিস্ময়কর দ্রুততার সঙ্গে অঙ্কুরিত হলো বীজটি। রূপান্তরিত হলো পরিণত গাছে। থোকায় থোকায় ধরতে লাগল খেজুর। তার বীজ আবার মাটিতে পড়ে জন্ম দিল নতুন গাছের। পৃথিবী হয়ে উঠল আবাদযোগ্য। নেহাত গল্প মনে হতে পারে একে। তবে নাইজেরিয়ার ইয়োরুবা জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করে সৃষ্টিতত্ত্ব হিসেবে। খেজুর সেখানে শুধু স্বর্গীয় খাদ্য না, পৃথিবীতে জন্মানো প্রথম গাছও। খেজুর নিয়ে বিস্ময়বোধে ইয়োরুবা নতুন না। পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির বিশ্বাসীরা মুগ্ধতা দেখিয়েছে খেজুরের প্রতি। খেজুর গাছে খুঁজে পেয়েছে গভীর কোনো অর্থবাচকতা। সভ্যতার সঙ্গে খেজুরের জড়িয়ে থাকার এ আখ্যান ছয় হাজার বছরের। আখ্যানের একদিকে যেমন অদ্ভুত সৌন্দর্যে ঘেরা, অন্যদিকে তেমনভাবেই পূর্ণ স্বাতন্ত্র্য নিয়ে।

মানুষ আর খেজুর প্রথম কবে মুখোমুখি হয়, তা অজানা। তবে বিদ্যমান দলিলে খেজুর চাষের প্রথম নজির খ্রিস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগের। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের তীরে তখন সমৃদ্ধ সভ্যতা। উর ছিল তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রভূমি। সুমেরিয় নামে পরিচিত সে সভ্যতায় খেজুরই ছিল অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। খেজুরের প্রভাব জড়িয়ে ছিল পার্থিব ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে। চন্দ্রদেবতার মন্দির নির্মিত হয়েছিল খেজুরের ডালে। খেজুর পরিগণিত হয়েছে উর্বরতার প্রতীকে। খেজুরের ব্যবহার কতটা বহুমাত্রিক তার প্রমাণ সুমেরীয় শব্দভাণ্ডার। খেজুরের বিভিন্ন ধরন ও বিভিন্ন অংশ নিয়ে সেখানে অন্তত ১৫০ শব্দ পাওয়া যায়। সুমেরীয় পুরাণে খেজুরকে বলা হয় পৃথিবীতে বপন করা প্রথম গাছ। দেবতা এনকির মাধ্যমে খেজুর গাছের জন্ম। তাকে সহযোগিতা করেছেন দেবী ইনানা ও একটা কাক। খেজুরের এ প্রভাব পরবর্তী আক্কাদীয় সভ্যতায় গিয়ে বেড়েছে বৈ কমেনি। আক্কাদীয় সিলিন্ডারে উর্বরতা ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে খেজুর গাছ দৃশ্যমান। সিলিন্ডারে জনৈক উপাসককে নতজানু অবস্থায় দেবতার সামনে দেখা যায়। যেন ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদন করছেন। পেছনেই স্পষ্ট খেজুর গাছ। খেজুর যেন ঈশ্বরের পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য দেয়া উপহার। ফলে তাদের ধর্মীয় উৎসবে থাকত খেজুরের সরব উপস্থিতি। থাকত সম্পত্তি ও সন্তান অপশক্তির হাত থেকে রক্ষার আচারে। খেজুর গাছের প্রতিটা অংশই ব্যবহার উপযোগী। ফলে খেজুর গাছ কাটা ছিল সে সময় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ব্যাবিলনীয় সম্রাট হাম্মুরাবির আইনসংহিতার ঘোষণাটি এক্ষেত্রে বিবেচ্য। বলা হয়েছে ‘যদি কোনো জমির মালিক অন্য কারো জমির গাছ কেটে ফেলে, তাহলে জরিমানা গুনতে হবে’। পুরো মেসোপটেমিয়া সভ্যতায়ই খেজুর গাছকে স্থান দেয়া হতো জীবনবৃক্ষ হিসেবে। ধর্মবিশ্বাসে জীবনবৃক্ষ বলতে পবিত্র বিশেষ গাছকে বোঝায়। জীবনবৃক্ষের মাধ্যমেই সংযুক্ত হয় স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল। প্রতীকায়িত করে জ্ঞান, অমরত্ব ও উর্বরতাকে। মাটির নিচে থাকা খেজুর গাছের অংশ যেন পাতালের সঙ্গে ও ডালপালাহীন কাণ্ড যেন স্বর্গের সঙ্গে যুক্ত। ফলে খেজুর গাছ মানবজগৎ ও দেবতাদের জগতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ বিশ্বাস খেজুর গাছকে পৃথক মর্যাদা দিয়েছিল অন্য যেকোনো গাছের চেয়ে। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের তীরের উর্বর ভূমিতে বিপুল উদ্যমে চাষ হতো খেজুরের। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে মেসোপটেমিয়া সফর করেন হেরোডোটাস। পশ্চিম আনাতোলিয়ায় জন্ম নেয়া গ্রিক পণ্ডিত ও ইতিহাসের জনক তিনি। মেসোপটেমিয়ার মানুষের জীবনযাত্রার পাশাপাশি সেখানকার সারি সারি খেজুর বাগান তাকে মুগ্ধ করেছিল, সে মুগ্ধতা তিনি লিপিবদ্ধ করে গেছেন ‘দ্য হিস্টোরিজ’ গ্রন্থে।
হেরোডোটাস মিসরেও সফর করেছিলেন কাছাকাছি সময়ে। প্রাচীন মিসর সভ্যতার ইতিহাসে অনেক কারণেই বিস্ময় ছড়িয়ে রেখেছে। তেমন একটা উদাহরণ মমি। হেরোডোটাস তুলে ধরেছেন মমি তৈরির মিসরীয় পদ্ধতি। মমি তৈরিতে ব্যবহার করা হতো খেজুরের রস। খেজুর চাষে পূর্ণ ছিল গোটা নীল উপত্যকা। ধ্বংসাবশেষ হিসেবে প্রাচীন মিসরীয় অধিকাংশ চিত্রকর্মেই খেজুর গাছের উপস্থিতি দৃশ্যমান। ভাস্কর্যের ধরনকেও প্রভাবিত করেছে খেজুর গাছের কাঠামো। ফল ও রসের বাইরে ব্যবহূত হয়েছে খেজুরের কাঠ। অর্থাৎ খাদ্য হিসেবে খেজুর, পানীয় হিসেবে খেজুরের রস আর আবাস হিসেবে খেজুরের শাখা। ফলে খেজুর গাছে দেবত্ব আরোপ অস্বাভাবিক ছিল না। মেমফিসে খোদাই করা চিত্রকর্মে ধর্মযাজককে খেজুর চাষে রত দেখা যায়। গম্বুজের দেয়ালে অঙ্কিত হয়েছে খেজুর গাছের বেড়ে ওঠা। খেজুর গাছ ছিল কয়েকজন দেবতার বসতি। বিশেষ করে দেবী হাথোর ও নেফথিস। হাথোর জীবন, সংগীত ও উর্বরতার দেবী। অন্যদিকে নেফথিস মৃত ব্যক্তির জন্য সুরক্ষা দানকারী দেবী। প্রাচীন মিসরীয়রা বিশ্বাস করত, মৃত ব্যক্তির জন্য নেফথিস পানি ও খেজুর নিয়ে হাজির হন। অসীমতার দেবতা হেহ। প্রায়ই তাকে চিত্রিত দেখা যায় দুই হাতে খেজুর শাখা ধরে রাখা অবস্থায়। মিসরীয় মন্দিরগুলোতে খেজুরের শাখা রাখা হতো সময়ের নির্ধারক হিসেবে। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অনন্ত জীবনের প্রতীক হয়ে উপস্থিত থাকত খেজুর।
ইহুদি বিশ্বাসে খেজুর পেয়েছে বিশেষ অবস্থান। নবি সলোমনের নির্মিত টেম্পলের দেয়াল ও দরজার কাজে ব্যবহূত হয়েছে খেজুর গাছ। ছিল ভেতরে ও বাইরের পাশের অলংকরণে। যবুর কিতাবে বলা হয়েছে, সৎ কর্মশীলরা খেজুর গাছের মতো সমৃদ্ধি নিয়ে বেড়ে উঠবে। বাইবেলের ভাষ্যে প্রথম পুরুষ আদম যে বেহেশতে বসবাস করতেন তার মধ্যে ছিল জীবনবৃক্ষ। তালমুদের ব্যাখ্যায় সেই জীবনবৃক্ষ মূলত একটা খেজুর গাছ। ইহুদি ঐতিহ্যে সাতদিনব্যাপী পালিত ধর্মীয় উৎসব সুকুত। উৎসবের প্রতিদিনকার ধর্মীয় কর্মকাণ্ডেই ব্যবহূত হয় খেজুরের নরম শাখা। খেজুরের শাখা প্রতীকায়িত করে বনি ইসরায়েলের বিজয়কে। হিব্রু বাইবেলে কানান অঞ্চলকে ‘দুধ ও মধুর ভূমি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বাইবেলীয় সময়ে জর্ডান নদীর পাশে ছিল প্রচুর খেজুর গাছ। মধু বলতে খেজুর থেকে উত্পন্ন মধুকেই বোঝানো হতো তখন। ইহুদি নগরী জেরিকোকে বলা হতো ‘খেজুর গাছের শহর’। খেজুর গাছ জুদিয়া রাজ্যের প্রতীক। স্বাধীন হিব্রু রাজ্যে অঙ্কিত মুদ্রাতেও দেখা যায় খেজুর গাছের উপস্থিতি। ৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমান জেনারেল টাইটাস জেরুজালেমে অভিযান পরিচালনা করেন। দখল করে নেন জুদিয়া রাজ্য। নতুন ব্রোঞ্জের মুদ্রা প্রবর্তিত হয় জেরুজালেম থেকে। জুদিয়া ক্যাপটা নামে পরিচিত মুদ্রাগুলো। মুদ্রায় খোদাই করা থাকত খেজুর গাছ। একটা মুদ্রার এক পিঠে দেখা যায় এক বৃদ্ধাকে, যিনি খেজুর গাছের নিচে বসে কাঁদছেন। রোমান উৎসগুলোতে জেরুজালেম অঞ্চলে উৎপাদিত খেজুরের প্রশংসাবাণী বিদ্যমান। সে সূত্র ধরে গ্রিক ও রোমান মুদ্রাতেও মেলে খেজুর গাছের উপস্থিতি। খেজুর সেখানে তৈরি করেছিল অর্থনৈতিকভাবে স্বতন্ত্র অবস্থান।
ফিনিশীয় মুদ্রায়ও দেখা যায় খেজুর গাছের খোদাইচিত্র। মূলত গ্রিক থেকে উৎসারিত ফিনিশিয়া নামটিই খেজুরের সঙ্গে সম্পর্কিত। খেজুর গাছ দেখা যায় কার্থেজের মুদ্রাতেও। গ্রিক পুরাণমতে, অ্যাপোলো ও তার যমজ বোন আর্তেমিস জন্মগ্রহণ করেছিলেন একটা খেজুর গাছের নিচে। ফলে অ্যাপোলোর মন্দিরে বিপুলভাবে সমাদৃত হয়েছে খেজুর গাছ। অ্যাপোলোর জন্মস্থান ডেলোস দ্বীপে তৈরি করেছে বিশেষ জায়গা। পরবর্তী সময়ে যখন এথেন্সের নেতৃত্বে গ্রিক নগররাষ্ট্রগুলো নিয়ে গড়ে ওঠে ডেলিয়ান লিগ, তাদের আইকন ছিল খেজুর গাছ। গ্রিক সভ্যতায় খেজুর নতুন মাত্রা তৈরি করেছিল। ৪৬৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সংঘটিত ইউরিমেডনের যুদ্ধে জয়ের পর স্মারক হিসেবে ডেলফির মন্দির প্রাঙ্গণে রোপণ করা হয় খেজুর গাছ। গ্রিক সমুদ্রদেবতা পসাইডনের হাতে খেজুরের শাখা ধরে রাখা অবস্থায় দেখা যায়, খেজুরের ডাল যেন ক্ষমতা ও আভিজাত্যের প্রতিনিধিত্ব করছে। ক্রমে বিজয়ের প্রতিশব্দ হিসেবেই খেজুর গাছ ব্যবহূত হতে শুরু করে প্রাচীন গ্রিস ও রোমে। জুলিয়াস সিজার ক্ষমতায় আসার আগে দেবী নাইকির মন্দিরে অলৌকিকভাবে গজিয়ে উঠেছিল খেজুর গাছ, যা তার বিজয়ের ইঙ্গিত বহন করে। কোনো যুদ্ধ কিংবা সামরিক অভিযানে বিজয়ী হয়েছেন, এমন ব্যক্তিরা পরবর্তী অভিযানে বিশেষ ধরনের টোগা পরিধান করতেন। টোগা পালমার নামে পরিচিত সেই টোগায় প্রতীকায়িত হয়ে থাকত খেজুর গাছ। বিজয়ী সামরিক দল কিংবা প্রতিযোগিতামূলক খেলায় বিজয়ীর মাথায় পরিয়ে দেয়া হতো পাতার তৈরি জয়মাল্য। হাতে তুলে দেয়া হতো খেজুরের পাতা। অবশ্য বিজয়ীকে বরণের এমন রীতি সেমেটিক ঐতিহ্যেও চর্চিত ছিল দীর্ঘদিন। খেজুর মাহাত্ম্য আরো বেশি করে চিত্রিত হয়েছে গ্রিক পৌরাণিক বীর হেরাক্লেসের আলোচনায়। পাতাল থেকে ফিরে আসার পর হেরাক্লেস সবার আগে খেজুর পাতা দেখতে পান। তিনি নিজে সেই পাতা দিয়ে মুকুট বানিয়ে মাথায় পরেন। গ্রেকো-রোমান সভ্যতায় আলংকারিক হিসেবেও খেজুর ও খেজুরের গাছ ছাপ রেখে গেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। খেজুর গাছ খোদিত হয়েছে মোজাইকে। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের স্থাপত্যকলার অংশ হিসেবে তিউনিসিয়া থেকে সিরিয়া পর্যন্ত মোজাইকে দেখা যায় খেজুর গাছ ও খেজুর। খেজুর গাছের প্রশংসাবাক্য কীর্তিত হয়েছে হোমারের মহাকাব্য ওডেসিতে। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের আকিমেনিদ সিলমোহর পাওয়া গেছে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায়। সেখানে খেজুর গাছের উপস্থিতি স্পষ্ট। অর্থাৎ প্রাচীন পারসিক ঐতিহ্যেও খেজুর গাছে অপরিচিত ছিল না।
খ্রিস্টীয় বিশ্বাসে খেজুরের শাখাকে গণ্য করা হয় বিজয়ের স্মারক হিসেবে। লাস্ট সাপারের আগে যখন যিশুখ্রিস্ট জেরুজালেমে প্রবেশ করেন, সেখানকার মানুষ তাকে খেজুরের শাখা নেড়ে স্বাগত জানায়। বিজয়ীকে বরণ করার রীতি এমনই ছিল তখন। যিশুকে বরণ করে নেয়ার এই দিনকে পরবর্তী সময়ে আত্মীকৃত করে নিয়েছে চার্চ। রূপ দিয়েছে বার্ষিক উৎসবের। পালন করা হয় পাম সানডে। বর্তমান সময়েও ক্যাথলিক, লুথারিয়ান, মেথোডিস্ট, অ্যাংলিকান ও মোরাভিয়ান খ্রিস্টধর্মে আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয় ‘পাম সানডে’। খেজুর শাখা খ্রিস্টীয় বিশ্বাসে শহীদি চেতনার প্রতীক। মৃত্যুকে মনে করা হয় শরীরের ওপর আত্মার বিজয়। কবরে খেজুরের ডাল রাখার অর্থ মনে করা হয় এটা কোনো শহীদের কবর। ক্রুসেডাররা ঘরে ফিরত খেজুর গাছের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে। যার সিলসিলা ধরেই ক্যাথলিক চার্চ থেকে এখনো ‘পাম অব জেরুজালেম’ অ্যাওয়ার্ড দেয়া হয়। খ্রিস্টধর্মের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপে বৃদ্ধি পেয়েছে খেজুরের জনপ্রিয়তা। অনুপ্রেরণা হিসেবে ছিল গ্রেকো-রোমান সংস্কৃতির উত্তরাধিকার। সাদা পাতা প্রতীকায়িত করে ঐশ্বরিক বিশুদ্ধতাকে। এখন স্পেনের এলচি বিখ্যাত বার্ষিক উৎসবের জন্য। উৎসবটিকে বলা হয় পিলগ্রিমেজ টু এলচি। উৎসবের অন্যতম প্রধান অঙ্গ হলো মাতা মেরির মৃত্যু ও স্বর্গে আরোহণ। এক ফেরেশতা আকাশ থেকে এসে মা মেরির সামনে থামেন। তার হাতে তুলে দেন খেজুরের শাখা। বিশ্বাস অনুসারে এর অর্থ হলো এখন থেকে তার কবরে খেজুর গাছ জন্মাবে। বুক অব রিভেলেশনের শেষ অধ্যায়ে উদ্ধৃত হয়েছে এ প্রসঙ্গ। ‘নদীর উভয় পাশেই রয়েছে জীবনবৃক্ষ। যেখানে ১২ রকমের ফল ধরে। প্রতি মাসেই পাওয়া যায় ফল। সে গাছের পাতায় রয়েছে মানুষের আরোগ্য।’ ১২ সংখ্যার তাত্পর্য রয়েছে। প্রাচীন মিসরীয় সংস্কৃতিতে গাছের ডালকে বছরের সঙ্গে ও পাতাকে মাসের সঙ্গে তুলনা করা হতো। খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যে বিশ্বাস করা হয়, খেজুর গাছ থেকে প্রতি মাসে একটি করে নতুন অঙ্কুর গজায়। ফলে গাছ যেন বারো মাসকে ধারণ করা বছরকেই প্রতীকায়িত করে। খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাস করা ক্রিসমাস ট্রির মাহাত্ম্যও এখানে।
ইসলাম ধর্মে খেজুর আল্লাহ প্রদত্ত অলৌকিক ফল। শরীর ও আত্মার সুস্থতায় ভূমিকা রাখে খেজুর। খেজুরবিহীন বাড়িকে দরিদ্র বাড়ি বলে অভিহিত করেছেন রাসুল (সা.)। কোরআনেও খেজুরের কথা বারবার উদ্ধৃত হয়েছে সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ ও প্রাচুর্যের উদাহরণ হয়ে। বিশ্বাসীদের জন্য জান্নাতে খেজুর গাছ থাকবে। নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে খেজুরের স্মৃতি। একবার এক খেজুর গাছ রাসুলের সামনে মাথা অবনত করে সম্মান জানায় বলে হাদিসে বর্ণিত রয়েছে। মদিনায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামের প্রথম মসজিদ নির্মিত হয়েছিল খেজুর পাতায়। মুয়াজ্জিন বেলাল প্রায়ই খেজুর গাছ বেয়ে উঠে দিনে পাঁচবার আজান দিতেন। মুসলিম চিত্রকলায় খেজুর গাছ পাওয়া যায়। মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম বিশেষ উদাহরণ মিনার, যা প্রভাবিত খেজুর গাছ থেকে। আরব মননে খেজুর গাছ ছিল পূর্ণতার প্রতীক। কেবল লেখাজোখায় না, তাদের চিত্রকর্ম ও স্থাপত্যে উঠে এসেছে খেজুর গাছের প্রভাব। বলা হয়, ‘খেজুর গাছের মতো হও, কেউ যখন ঢিল ছুড়বে, জবাব দেবে একটা মিষ্টি খেজুর ছুড়ে’। আরবরা যখন বাগদাদ থেকে আন্দালুসিয়ায় গেল, বিস্তার ঘটে খেজুরের। উমাইয়া শাসক আবদুর রহমান আন্দালুসিয়ায় গিয়ে একটা নিঃসঙ্গ খেজুর গাছ দেখে লিখে ফেলেছিলেন অবিস্মরণীয় এক কবিতা—
"খেজুরের দেশ থেকে বহু দূর
রুসাফার মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে এক খেজুর বৃক্ষ
বললাম, ‘তুমি যেন ঠিক আমারই মতোন, একা এই দূর পরবাসে
পরিবার ও বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন
এমন জায়গায় বেড়ে উঠছ, যেখানে তুমি পরদেশী
আমার মতন, ঘর থেকে বহু দূরে, বহুদূরে।"
আরব পরিচিতির স্মারক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে খেজুর গাছ। যা পরবর্তী সময়ে স্পেন থেকে ছড়িয়ে পড়েছে ইতালি ও ইউরোপের অন্যান্য অনুকূল আবহাওয়া অঞ্চলে। আন্দালুসিয়ার ৮০০ বছরের আরব শাসনে খেজুর গাছ পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধির জেরে উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হয়েছে খেজুর। পঞ্চম শতাব্দীতে আরবদের আন্দালুসিয়া থেকে বিতাড়ন করা হয়। অদ্ভুতভাবে তুলে ফেলা হতে থাকে খেজুর গাছ। আন্দালুসিয়ার খেজুর গাছকে মনে করা হতো অবিশ্বাসীদের ফেলে যাওয়া পদচিহ্ন। কেবল দক্ষিণ স্পেনের এলচিতে থাকা খেজুর বাগানই রক্ষা পেয়েছিল ক্রোধ থেকে।
খেজুরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সঙ্গে খেজুরকেন্দ্রিক উৎসবের উদাহরণও কম নেই। প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতায় বসন্তকালীন উৎসবে স্মরণ করা হতো দেবী ইশতারকে। ইশতার খেজুর বৃক্ষের পৃষ্ঠপোষকতা দানকারী দেবী। ইহুদিদের সুকুত ও খ্রিস্টান পাম সানডের মতো অন্যান্য সংস্কৃতিতেও রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে। দক্ষিণ লিবিয়া ও উত্তর শাদের সীমান্তবর্তী গ্রাম টিবেস্টিতে দেখা যায় খেজুরকেন্দ্রিক উৎসব। বর্তমানে খেজুর চাষ তাদের জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। উৎসবে খেজুর গাছকে কেন্দ্র করে নৃত্য ও খেজুরের মদ পান করা সাধারণ দৃশ্য। মধ্যপ্রাচ্যে খেজুর সামাজিক উৎসবে প্রবেশ করেছে। বাহরাইনে বিয়ের অনুষ্ঠানে ফটক সাজানো হয় খেজুরের শাখা দিয়ে। খেজুর সেখানে প্রতিনিধিত্ব করে আনন্দ ও আশীর্বাদের। ওমানে এখনো পুত্রসন্তানের জন্মের সঙ্গে সঙ্গে একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হয় প্রাচীন ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে। সম্প্রতি উপসাগরীয় অঞ্চলে শুরু হয়েছে খেজুর উৎসব। খেজুর চাষীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। সবচেয়ে ভালো খেজুরচাষী লাভ করেন পুরস্কার। প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে খোদ ক্যালিফোর্নিয়ায় উদযাপিত হয় খেজুর উৎসব। স্পষ্ট যে এখনো অটুট রয়েছে খেজুরের আধিপত্য। অজস্র গল্প জন্ম দিয়ে এখনো এগিয়ে চলছে খেজুর ও মানুষের মহাকাব্যিক সম্পর্ক।
Credit: আহমেদ দীন রুমি
https://bonikbarta.net/

‘মরুভূমির রুটি’ খেজুর

 খেজুরের ইতিকথা

উৎপাদনে শীর্ষে মিসর, রফতানিতে সৌদি আরব
খেজুর আমদানিতে সারা বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে আছে ভারত। ২০২১ সালে তারা ২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের খেজুর আমদানি করে।
বাংলাদেশ ২০২১ সালে ৬ কোটি ১৬ লাখ ডলারের খেজুর আমদানি করেছিল। ২০২০ সালে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ১০ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে দেশটির খেজুর আমদানির পরিমাণ বেড়েছে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ। এ রমজানে বাংলাদেশ মোট ২০টি দেশ থেকে খেজুর আমদানি করেছে। সবচেয়ে বেশি আমদানি করেছে যথাক্রমে ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, আলজেরিয়া ও পাকিস্তান থেকে।
ভূমধ্যসাগর ও জর্ডান উপত্যকার মাঝামাঝি অবস্থিত একটি উপকূলীয় অঞ্চল। বর্তমান লেবাননের সম্পূর্ণ এবং সিরিয়া, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের অংশবিশেষ নিয়ে এটি গঠিত। প্রাচীনকালে তা ফিনিশিয়া নামে পরিচিত ছিল। শব্দটি গ্রিক। এর অর্থ বেগুনি ভূমি। এখানকার অধিবাসীরা মুরেক্স নামক এক প্রকার সামুদ্রিক শামুক থেকে বেগুনি রঙ বের করে আনত। এ রঙের জন্য অঞ্চলটি বিখ্যাত ছিল। তাই অঞ্চলটির এমন নামকরণ করেছিল গ্রিকরা। সেখানে প্রচুর পরিমাণে জন্মাত এক ধরনের গাছ। গ্রিকরা ভেবেছিল ফিনিশিয়া সে গাছের আদিভূমি। তাই তারা এর নাম দিল ফিনিক্স (ফিনিশিয়ার গাছ)। কালক্রমে সে অঞ্চলের প্রতীকে পরিণত হলো এ গাছ। ফিনিশীয় মুদ্রায় হয়েছে তার উপস্থাপন। গ্রিকদের ফিনিক্স আমাদের দেশে খেজুর গাছ নামে পরিচিত। এ গাছকে সংস্কৃত ভাষায় খর্জুর বলা হয়। সেখান থেকেই বাংলায় খেজুর শব্দটি এসেছে।
ফিনিক্স বলতে সাধারণত আমাদের মনে পৌরাণিক একটি পাখির চিত্রই ভেসে ওঠে। খেজুর গাছও ফিনিক্স হিসেবে পরিচিত। এমন তথ্য আমাদের কিছুটা আশ্চর্যান্বিত করে বৈকি। মজার ব্যাপার হলো, গ্রিক মিথগুলোতে ফিনিক্স পাখির সঙ্গে খেজুর গাছের সাদৃশ্য হাজির করা হয়েছে। রোমান লেখক প্লিনি দ্য এলডার তার ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ বইতে ফিনিক্স পাখির গল্প বলেছেন। কিংবদন্তি অনুসারে, আরবের মরুভূমিতে বাস করে এ পাখি। ৫০০ বছর তার আয়ু। তবে একই সময়ে দুনিয়ায় কেবল একটিই ফিনিক্স থাকে। খেজুর গাছের মাথায় তার বাসা। দারুচিনির ডাল ও এক ধরনের সুগন্ধি আঠা দিয়ে তৈরি। ৫০০ বছর পরে সূর্যের তাপে নিজেকে পুড়িয়ে ফেলে এ পাখি। আর সে ছাই থেকেই পাখিটির পুনর্জন্ম ঘটে। ফিনিক্স পাখির মতোই ক্রমাগত জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের মধ্য দিয়ে খেজুর গাছ পরিপূর্ণতা লাভ করে। প্রতি বছর এ গাছের নতুন শাখা গজায়। পুরনো শাখাগুলো মরে যায়। মরা শাখা গাছের বাকলে পরিণত হয়। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি দেখে মনে হয় যেন মরা শাখাগুলো গাছের ভেতরে প্রবেশ করছে। সেগুলোই আবার নতুন শাখা হিসেবে বেরিয়ে আসছে। তাছাড়া ফিনিক্স পাখির মতো খেজুর গাছও সাধারণত দীর্ঘজীবী হয়। খেজুরের বীজ তার গুণাগুণ বজায় রেখে অনেক বছর মাটির নিচে সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে তাতে অঙ্কুরোদগম ঘটে। কয়েক বছর আগে ডেড সির কাছে খেজুরের কিছু বীজ আবিষ্কৃত হয়েছিল। সেগুলো ছিল দুই হাজার বছরের পুরনো। এ ধরনের খেজুর গাছ জুডিয়াতে (বর্তমান ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের অংশবিশেষ) জন্মাত। বর্তমানে তা বিলুপ্তপ্রায়। সে বীজগুলোতে অঙ্কুরোদগম ঘটানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি বীজ অঙ্কুরিত হয়। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন মেথুসেলাহ। খেজুর গাছের এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে গ্রিকরা এর নাম দেয় ফিনিক্স।
খেজুর গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ফিনিক্স ড্যাকটাইলিফেরা phoenix dactylifera. এটি গ্রিক নাম। এর ‘ফিনিক্স’ নামকরণের কারণ তো জানা গেল। এবার ‘ড্যাকটাইলিফেরা’র ওপর আলোকপাত করা যাক। গ্রিক শব্দ ‘ড্যাকটাইলাস’ ও ‘ফেরো’র সমন্বয়ে ড্যাকটাইলিফেরা গঠিত। ড্যাকটাইলাস অর্থ খেজুর। আর ফেরো মানে বহন করা। তবে প্রকৃতপক্ষে, ড্যাকটাইলাস শব্দের অর্থ আঙুল। আঙুলের খেজুরে পরিণত হওয়া নিয়ে চমৎকার একটি গল্প আছে। দ্বিতীয় শতাব্দীর গ্রিক স্বপ্নবিশারদ আর্তেমিদোরাস রচিত বুক অব ড্রিমসে এ গল্পের উল্লেখ আছে। গল্পের নায়ক এক অসুস্থ ব্যক্তি। পেটের পীড়ায় ভুগছিল লোকটি। কাতর হয়ে সে চিকিৎসা-দেবতার কাছে আরোগ্য কামনা করে। স্বপ্নে সে নিজেকে চিকিৎসা-দেবতার মন্দিরে আবিষ্কার করে। দেবতা লোকটির ডান হাতের আঙুলগুলো ধরেন। তিনি তাকে সেগুলো খেতে বলেন। লোকটি সে আদেশ পালন করে। স্বপ্নের অন্তর্নিহিত তাত্পর্য ধরতে পারে লোকটি। ঘুম ভাঙার সঙ্গে সঙ্গেই সে পাঁচটি খেজুর খেয়ে নিল। আর কী আশ্চর্য! সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করল অসুস্থ লোকটি। এভাবেই স্বপ্নের ব্যাখ্যায় হাতের আঙুল ও খেজুর সমার্থক হয়ে যায়। এ কারণে খেজুর গাছের বৈজ্ঞানিক নামের দ্বিতীয় অংশ হয় ড্যাকটাইলিফেরা। এ গ্রিক শব্দটিই ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় বিভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। ইতালীয় ডেটেটরো, ফরাসি ডেটেট, স্প্যানিশ ডেটিল ও ইংরেজি ডেট ড্যাকটাইলিফেরার রূপভেদ। তবে পর্তুগিজ ভাষায় খেজুরকে বলা হয় তামার। হিব্রু ও আরবি ভাষা থেকে তারা শব্দটি গ্রহণ করেছে। সেমেটীয় ভাষায় তামার দ্বারা খেজুর গাছ ও খেজুর দুটোকেই বোঝায়। তামার শব্দটি এসেছে তামুর থেকে। এর অর্থ হৃৎপিণ্ড। হৃৎপিণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো কিছু বোঝাতেও শব্দটি ব্যবহূত হয়। যেমন রক্ত, লাল রঙ ইত্যাদি। যাবতীয় শুভ ও ঋজু বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করতেও শব্দটির ব্যবহার আছে। পাকা খেজুরের রঙ লালচে হয়। খেজুর গাছ একহারা ও ঋজু। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে সেমেটীয় ধারায় খেজুরকে তামার বলা হয়। ভাষাতাত্ত্বিকরা এমন অভিমতই ব্যক্ত করেছেন। হিব্রুতে তামার নামে এক নারীর নাম পাওয়া যায়। ওল্ড টেস্টামেন্টে তার বর্ণনা আছে। বর্ণনানুসারে, কিং ডেভিডের এক মেয়ের নাম ছিল তামার। অপূর্ব সৌন্দর্যের অধিকারী। সেখান থেকেও হিব্রু ও আরবিতে খেজুরের এমন নামকরণ হতে পারে। এমন নাম দ্বারা খেজুরের সৌন্দর্যের দিকেই যেন ইঙ্গিত করা হয়েছে। প্রাচীন গ্রিক ও লাতিন ভাষায় খেজুর গাছকে পালমা নামেও অভিহিত করা হয়েছে। পালমা তামারের একটি অপভ্রংশ হতে পারে বলে অনেক ভাষাতাত্ত্বিক মনে করেন।
খেজুর সাধারণত মরু অঞ্চলে জন্মায়। শুষ্ক আবহাওয়া ও ঊষর ভূমিতে বেড়ে ওঠে খেজুর গাছ। তথাপি এ ফল তার অঙ্গে এত রস কীভাবে ধারণ করে, তা এক বিস্ময়ই বটে। মরুভূমির মানুষের কাছে তাই এ ফল অতি আদরের। খেজুর তাদের অন্যতম প্রধান খাদ্য। খাবার-পরবর্তী মিষ্টান্ন হিসেবেও খেজুরের ব্যবহার আছে। আবার দুই খাবারের মাঝে হালকা নাশতা হিসেবেও তারা খেজুর খেয়ে থাকে। তাই খেজুরকে বলা হয় ‘মরুভূমির রুটি’। এর আরেকটি নাম আছে। আমাদের দেশে বসে সে নাম শুনলে অবাকই লাগবে। মরুবাসীর কাছে খেজুর ‘গরিবের পিঠা’ নামে পরিচিত। সেখানে খেজুরের প্রাচুর্য ও সহজপ্রাপ্যতার কারণে এমন নামকরণ।
খেজুর গাছ খুবই প্রাচীন। পাঁচ কোটি বছর আগের খেজুর গাছের ফসিল আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। তবে খেজুর চাষাবাদের ইতিহাস ততটা প্রাচীন নয়। হযরত ঈসা (আ.)-র জন্মের প্রায় চার হাজার বছর আগে থেকে মানুষ খেজুরের আবাদ শুরু করেছে বলে জানা যায়।
ইংরেজ উদ্ভিদবিজ্ঞানী ই. কর্নার খেজুর গাছকে আদর্শ উদ্ভিদ বলে আখ্যা দিয়েছেন। ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি অব পামস’ বইয়ে তিনি এমন দাবি করেছেন। পরিপূর্ণ একটি খেজুর গাছ দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫০ ফুট (১৫ মিটার) বা তার বেশি হয়ে থাকে। এটি খুব ধীরগতিতে বাড়ে। পরিপূর্ণ রূপ পেতে এর ১০০ বছর লাগে। এর কোনো প্রধান মূল নেই। এর মূলগুলো আঁশযুক্ত। খেজুর গাছের কাণ্ড থেকে অসংখ্য গৌণ মূল বের হয়ে আসে। সেগুলো আবার অধিকতর ছোট মূলের জন্ম দেয়। গৌণ মূলগুলোতে অসংখ্য বায়ুকুঠুরি আছে। এগুলোর মাধ্যমে খেজুর গাছ প্রচুর পরিমাণে পানি শোষণ করে। এ প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদটি নিজেকে সতেজ রাখে।
খেজুর গাছের কাণ্ডের একেবারে ওপরের দিকে একটি প্রান্তিক কুঁড়ি থাকে। সেখান থেকে নতুন পাতা গজায়। এ কুঁড়িকে গাছটির হৃৎপিণ্ড বা মাথা বলা হয়। এটি কেটে দিলে গাছটি মরে যায়। প্রতিটি পাতার একটি মেরুদণ্ড থাকে। এটি লম্বা ও শক্ত। একে মধ্যশিরা বলা হয়। এর উভয় পাশে পালকের মতো অনেকগুলো গৌণ পাতা গজায়। এগুলো লম্বা ও অগ্রভাগ সুচালো। তারা খেজুর গাছকে বাতাসে দোল খাওয়া কিংবা ভেঙে পড়ার হাত থেকে বাঁচায়। মধ্যশিরার নিচের অংশ জুড়ে কিছু কাঁটা জন্মায়। এগুলো খুবই ধারালো। এ কাঁটাগুলো প্রান্তিক কুঁড়িটিকে প্রাণিকুলের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। গৌণ পাতাগুলোর বহিরাবরণ বেশ শক্ত হয়। মরুভূমিতে বালিঝড়ের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তারা খেজুর গাছকে নিরাপদ রাখে। তাছাড়া মরু অঞ্চলের গরম বাতাস থেকে কোষগুলোকে রক্ষায় গৌণ পাতাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখে। পানি এগুলোর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। তাই মাছ ধরার উপকরণ তৈরিতে তাদের ব্যবহার আছে। প্রান্তিক কুঁড়ির কাছাকাছি কচি পাতাগুলো আঁশযুক্ত আবরণে ঢাকা থাকে। পাতাগুলো বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আঁশগুলোও বড় হয়। বড় পাতাগুলো ছোট পাতাগুলোকে সূর্যের তাপ থেকে ছায়া দেয়।
বসন্তকালে খেজুর গাছে ফুল আসে। ফুলগুলো লম্বা ও শক্ত খোলের ভেতর থাকে। এসব খোল প্রথমে সবুজ থাকে। ধীরে ধীরে বাদামি হয়। ক্রমে তা পরিপূর্ণ হয়। তখন সূর্যের তাপে সেগুলো শুকিয়ে যায় এবং সংকুচিত হয়ে আসে। একপর্যায়ে খোলগুলো ফেটে ফুলের গোছা বেরিয়ে আসে। প্রতিটি গোছায় একটি কাণ্ড থাকে। সেখান থেকে ৫০ থেকে ১৫০টি বা তারও বেশি শাখা বের হয়। প্রতিটি শাখায় অসংখ্য ফুল থাকে। পুরুষ ফুল দেখতে তারার মতো। এর রঙ সাদা। শরীর মোমের মতো মসৃণ। নারী ফুল ডিম্বাকৃতির মুক্তার মতো দেখায়। রঙ হলুদাভ। পুরুষ ফুলের গোছা ছোট শাখার রূপ নেয়। এতে অনেকগুলো ফুল থাকে। প্রতিটি গোছা ছয় ইঞ্চি লম্বা হয়। নারী ফুলের গোছা লম্বায় এর দ্বিগুণ। তবে তাতে ফুলের সংখ্যা কম থাকে।
খেজুর বেরি জাতীয় ফল। একটি ডিম্বাশয় থেকে একটি খেজুরই জন্মায়। প্রতিটি ফুলে তিনটি গর্ভপত্র আছে। পরাগায়নের পর কেবল একটি গর্ভপত্র থেকে ফল হয়। অন্য দুটির গর্ভপাত হয়ে যায়। খেজুর থোকায় থোকায় জন্মায়। প্রতিটি থোকার একটি কাণ্ড থাকে। এ কাণ্ড থেকে অনেকগুলো শাখা বের হয়। বৃতির মাধ্যমে খেজুর শাখার সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে একটি খেজুর গাছ বছরে প্রায় ৭০ কেজি খেজুর উত্পন্ন করতে পারে।
খেজুর স্বতন্ত্র একটি ফল। এটি তিনটি স্তরে পাকে। প্রথম পর্যায়ে পাকা খেজুর শক্ত থাকে। তখন রঙ থাকে উজ্জ্বল হলুদ কিংবা লাল। এ সময় খেজুর খানিকটা মুচমুচে, রসালো ও মিষ্টি হয়। আরেকটু পাকলে তা আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে নরম হতে থাকে। তখন খেজুরের কিছু অংশ শক্ত থাকে। শক্ত অংশের রঙ হয় হলুদ কিংবা লাল। আর কিছু অংশ থাকে নরম। সে অংশের রঙ হয় স্বচ্ছ বাদামি। একসময় সম্পূর্ণ খেজুর পেকে নরম হয়ে যায়। মুচমুচে ভাবটি চলে যায়। তখন তা অধিকতর মিষ্টি ও রসালো হয়। গাছের পাকা খেজুর রোদে শুকিয়ে যায়। তখন তার চামড়া কুঁচকে যায়। কালচে বর্ণ ধারণ করে। অপূর্ব লাগে দেখতে। অনেকটা ক্যান্ডির মতো দেখতে খেজুরগুলো তখন গাছ থেকে পাড়া হয়। মোড়কজাত হয়ে এসব খেজুর চলে যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।
খেজুরের পুষ্টিগুণ অতুলনীয়। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে। ফ্ল্যাভোনয়েডস ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়। অ্যালঝেইমার প্রতিরোধে এটি কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ক্যান্সার থেকে মানব শরীরকে রক্ষা করে। খেজুরে ফ্ল্যাভোনয়েডস থাকে। এটি এক প্রকার অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এছাড়া ক্যারোটিনয়েডস ও ফেনোলিক অ্যাসিড নামে আরো দুই ধরনের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট আছে খেজুরে। ক্যারোটিনয়েড হৃৎপিণ্ডকে সুস্থ রাখে। চোখের বিভিন্ন সমস্যা প্রতিরোধ করে। ফেনোলিক অ্যাসিড ক্যান্সার ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। খেজুরে বিভিন্ন ধরনের খনিজ পদার্থ আছে। এর মধ্যে ফসফরাস, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম অন্যতম। এসব উপাদান হাড়কে মজবুত করে। হাড়ের বিভিন্ন সমস্যা থেকে শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খেজুর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এসব পুষ্টি উপাদান খেজুরকে একটি আদর্শ খাবারে পরিণত করেছে। মধ্যযুগে আরব বণিক ও অভিযাত্রীরা উত্তাল সাগরে দিনের পর দিন খেজুর খেয়েই টিকে থাকত। তখন স্কার্ভির প্রকোপ ছিল বেশি। ইউরোপীয় নাবিকেরা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হতো। কিন্তু খেজুর খাওয়ার কারণে আরবরা এ রোগ ঠেকিয়ে দিতে পেরেছিল।
খেজুর গাছের ব্যবহারিক উপযোগিতাও দারুণ। এর কোনো অংশই ফেলনা নয়। খেজুর শুকিয়ে বহু বছর রেখে দেয়া যায়। সাগর ও মরু অভিযাত্রীদের কাছে তা অমূল্য। খেজুর সিদ্ধ করে ও ছেঁকে মধু তৈরি করা যায়। গাঁজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খেজুর থেকে উত্কৃষ্ট পানীয় প্রস্তুত হয়। খেজুর গাছের আঁশ থেকে দড়ি ও ঝুড়ি তৈরি করা যায়। একসময় বাড়ি বানাতে খেজুর গাছের পাতার ছাউনি ব্যবহূত হতো। খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হতো খেজুর গাছের শাখা।
সেমেটিক ধারার ধর্মগুলোতে খেজুরের আলাদা গুরুত্ব আছে। এটি পবিত্র ফল হিসেবে বিবেচিত। ইসলাম ধর্মে খেজুরকে কেন্দ্র করে অনেক আয়াত ও হাদিস আছে। ইহুদি ধর্মেও আছে নানা প্রবাদ ও কিংবদন্তি। বারো শতকের এক ইহুদি ধর্মযাজকের কণ্ঠে তারই প্রতিধ্বনি। নেতানিয়েল আল ফাইয়ুমি নামের সেই রেবাইয়ের উক্তি দিয়েই লেখাটি শেষ করব। আজ থেকে ৮০০ বছর আগে তিনি লিখেছেন, ‘প্রাণিকুলের মধ্যে মানুষ শ্রেষ্ঠ। আর উদ্ভিদকুলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো খেজুর গাছ।’
Source: নিজাম আশ শামস
মোহাম্মদ রবিউল হোসাইন

খেজুর: বিভিন্ন নামে

 বহু জাতের খেজুর আছে যা চেনা বিশ্বের পক্ষে কঠিন। মধ্যপ্রাচ্যে খেজুর আছে প্রায় ৬০০ জাতের।

Production
In 2020, world production of dates was 9 million tones, led by Egypt, Saudi Arabia, Iran, and Algeria with 60% of the world total combined.
খেজুর এখন সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। আর এ খেজুরের আছে নানা জাত। খেজুর নিয়ে প্লিনি দ্য এলডার লিখেছেন, ‘খেজুরের প্রায় ৪৯টি জাত রয়েছে।’ প্লিনি বলে গিয়েছিলেন খেজুরের এ জাতগুলোর বেশির ভাগেরই নাম বর্বর। এখানে বর্বর বলতে আসলে আরবে প্রচলিত নামের কথা বলা হয়েছে। বেশির ভাগ খেজুরের নাম আরবিতেই। এমন হওয়ার কারণ আরব ও মধ্যপ্রাচ্যে একসময় খেজুরই ছিল অর্থনীতির মূল। বহুদিনের চাষাবাদের কারণে সেখান থেকেই খেজুরের জাত নির্ধারণ ও নাম দেয়া হয়েছিল। নামগুলো তৈরি হয়ে বহির্বাণিজ্যের কারণে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে চলে যেতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে খেজুরের নাম নির্ধারিত হতো বৈশিষ্ট্য অনুসারে। যেমন প্লিনি লিখেছেন এক ধরনের খেজুরের নাম ছিল ‘দাবলান’। মূলত নরম বোঝাতে এ নাম দেয়া হয়েছিল।
খেজুর এলাকাভেদে ভিন্ন হতো। ব্যাবিলনের রাজকীয় বাগানে এক ধরনের খেজুর উত্পন্ন হতো। গোল এ খেজুরগুলোর নাম ছিল ‘মার্গারিড’। মুক্তার মতো হওয়ার কারণে এ নাম দেয়া হয়েছিল। ‘সিয়াগ্রাস’ ছিল লম্বা ও শক্ত ধরনের খেজুর। স্বাদের দিক থেকেও তা অন্য জাতের তুলনায় আলাদা। প্লিনির উল্লেখ করা খেজুরের মধ্যে ‘কায়োটে’ সবচেয়ে শক্ত। এ খেজুর মদ তৈরিতে ব্যবহার করা হতো। পাটেটে নামের খেজুর খুব রসালো। এগুলো গাছে থাকা অবস্থায়ই ফেটে যেত। এ খেজুরের নামকরণের ক্ষেত্রে ফাটলের গুরুত্ব আছে। ফেটে যেত বলে সিরিয়াক হিব্রু পাটাক (ফেটে যাওয়া) থেকে নামটি এসেছে।
খেজুরের ধরন নির্ভর করে অঞ্চলের ওপর। যেমন ইথিওপিয়ার খেজুর শক্ত ধরনের। এ অঞ্চলের কোনো কোনো জাতের খেজুর এত শক্ত হয় যে এগুলো গুঁড়ো করে ময়দা তৈরি করা যায়। সে ময়দা থেকে রুটি তৈরি করাও সম্ভব। আবার খেজুর আহরণ করার ক্ষেত্রেও অঞ্চল অনুসারে পার্থক্য হয়। থিবসে প্রায় কাঁচা খেজুরই তুলে নিয়ে বয়াম ভরে রাখা হয়। প্রাকৃতিকভাবে না পাকার কারণে খাওয়ার আগে চুলার পাশে রাখতে হয় থিবসের খেজুর।
বালানি খেজুর বিভিন্ন রঙ ও আকারের হয়। এ জাতের খেজুর উত্পন্ন হয় মূলত মিসর ও ফিনিশিয়ায়। প্রাথমিক অবস্থায় বালানি মোটেও সস্তা ছিল না। নির্দিষ্ট কিছু পরিবারেরই কেবল সামর্থ্য ছিল এ খেজুর কেনার। চতুর্থ শতাব্দীতে পর্যটক জেনোফন পারস্যে ঘুরতে গিয়েছিলেন। তিনি নানা জাতের খেজুরের কথা বলেছেন। তার বর্ণনা মতে, ‘সেখানে বিভিন্ন ধরনের খেজুর পাওয়া যেত। আকার-আকৃতিতে ছিল নানা বৈচিত্র্য। মনে হতো এগুলো সোনালি অ্যাম্বারের টুকরো। কোনো কোনো খেজুর এত মিষ্টি হতো যে মুখে লেগে থাকত। কোনোটি দিয়ে আবার মদও তৈরি হতো।’
খেজুর মূলত পাম জাতেরই একটি অংশ। অনেক সময়ই নানা বীজ থেকে পাম বা খেজুর উত্পন্ন হয়। এর সবগুলোর নামও নেই। এই নতুন জাতকে আরবিতে বলা হয় ‘দেকেল’। কখনো বর্ণনা করা হয় ‘মাজুল’ বা ‘মেজুল’ নামে যার অর্থ ‘অজানা’। আমরা বাংলাদেশে জনপ্রিয় ধারার যে খেজুর দেখি এর বাইরেও নানা জাতের পাম ও খেজুর রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় পাঞ্জাব অঞ্চলেই খেজুর আছে প্রায় ৩০০ জাতের। তবে বলে রাখা ভালো এর মধ্যে মাত্র কয়েকটিই কেবল খেতে ভালো। সে তুলনায় ইরাকে ভালো জাতের খেজুরের সংখ্যা বেশি। সেখানে নানা ধরনের খেজুর বহুকাল ধরেই চাষ হয়ে আসছে।
আবার অজানা জাত অর্থাৎ ‘দেকেল’ থেকেও ভালো স্বাদের খেজুর পাওয়া যেতে পারে। উত্তর আফ্রিকায় এমন একটি খেজুর পাওয়া গেছে। হালকা সোনালি এ খেজুরের নাম দেয়া হয়েছে ‘দেগলেত নূর’ Deglet Noor (আলোর খেজুর)। প্রায় স্বচ্ছ এ খেজুরের বীজটি বাইরে থেকে দেখা যায়। এর মূল অঞ্চল আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার ওয়েসিসে। খেজুরটি সপ্তদশ শতাব্দীতে প্রথম আবিষ্কার করা হয় এবং শুরু থেকেই একে অসাধারণ হিসেবে বোঝা গিয়েছিল। কিংবদন্তিও রয়েছে এ খেজুরটি নিয়ে। সে অনুসারে একজন ধার্মিক নারী লাল্লা নূরের সঙ্গে খেজুরের যোগ রয়েছে। তিনি এতটাই দরিদ্র ছিলেন যে আল্লাহর ৯৯ নামে জিকির করার জন্য তার ৯৯ দানার তসবি ছিল না। তিনি খেজুরের ৯৯টি বীজ নিয়ে হিসাব করে জিকির করতেন। তার মৃত্যুর পর কবরে ওই বীজও পুঁতে দেয়া হয়। সেই ৯৯টি বীজ থেকে গাছ হয়েছিল এবং প্রতিটি গাছে স্বাদু খেজুর হতো। লোকে তাই এর নাম দিয়েছিল দেগলেত নূর। আবার অনেকের মতে এ বীজ এসেছিল মহানবীর (স.) স্ত্রী আয়েশার (রা.) উঠান থেকে। তিনি মদিনায় ছিলেন আর মদিনাকে বলা হতো আলোর শহর।
এমন আরেকটি অজানা জাতের খেজুর জনপ্রিয় হয়েছিল। এর নাম মেজুল। মূলত অজানা জাত থেকেই খেজুরটি এসেছিল। মরক্কো ও দক্ষিণ আলজেরিয়ায় এ জাতের খেজুর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। তবে উনিশ শতকেও তাফিলেতাত অঞ্চলে ভ্রমণ করা কোনো ভ্রামণিক এ জাতের কোনো খেজুরের নাম করেননি। তাই মনে করা হয় জাত সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকার কারণেই খেজুরের এ নামকরণ করা হয়েছে। মরক্কোর তাফিলেতাত অঞ্চলটি খেজুরের জন্য বহুদিন ধরেই জনপ্রিয়। অঞ্চলটিতে বিশেষভাবে খেজুরের চাষ হয়। এ অঞ্চলে সূর্যের তাপ খুব বেশি পড়ে। তাই খেজুর বাগানে যারা কাজ করে তাদের আলাদা করে পানির ব্যবস্থা করতে হয়। সেখানকার বেশির ভাগচাষীই করিতকর্মা। এরা আরবের ফিলাল থেকে কাজ করতে তাফিলেতাতে আসে।
বিশ শতকের শুরুর দিকেও মেজুল একটি প্রায়-অপরিচিত জাত ছিল। এটি কেবল রফতানি করার জন্য উৎপাদন করা হতো। উৎপাদনের পর তা আলাদা করে রাখা হতো। এ খেজুরে গ্রামবাসীর কোনো অধিকার ছিল না। যারা এ খেজুর উৎপাদন করতেন তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল নিম্নজাতের খেজুর। মেজুল ও দেগলেত নূর বিশ্বের কাছে অপরিচিত থাকলেও এখন পরিচিত। কিন্তু বহু জাতের খেজুর আছে যা চেনা বিশ্বের পক্ষে কঠিন। কেননা মধ্যপ্রাচ্যে খেজুর আছে প্রায় ৬০০ জাতের।
প্রতিটি অঞ্চলে খেজুর উৎপাদনের নিজস্ব ইতিহাস আছে। এসব ক্ষেত্রে খেজুরের নামকরণে প্রভাব রাখে অঞ্চল বা ব্যক্তির নাম। কখনো কখনো খেজুরের চেহারার ওপরও নির্ভর করে এর নাম। স্বাদ ও রঙ পর্যন্ত বিবেচনা করে নাম রাখা হতো। এর মধ্যে কিছু নাম বেশ চিত্তাকর্ষক। যেমন, বেইদ ইল-বিলবিল (কোকিলের ডিম), আসাবি ইল-আরুস (কনের আঙুল), মালাব্বাস আল-আরুজ (বুড়ো নারীর বানানো ক্যান্ডি) ও খাসাওয়ি ইল-বাঘাল (গাধার অণ্ডকোষ)।
তবে বিশেষ খেজুরের মধ্যে আছে ইরাকের জাইদি। এটি বাগদাদের মূল অর্থনৈতিক ফসল বলা চলে। জাইদি দামে সস্তা এবং যেকোনো আবহাওয়ায় ভালো থাকে। চিনি বেশি থাকার কারণে বাগদাদের বিশেষ অ্যালকোহল ‘আরক’ তৈরিতে জাইদি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া খিস্তাওয়ি ও হিলাওয়ি অন্যতম জনপ্রিয় খেজুর। হিলাওয়ি মূলত বাগদাদের দক্ষিণের হিল্লা শহরের নামে নামকরণ করা হয়েছে। সবুজ ধরনের একটি মিষ্টি জাতের খেজুর খাদরাওয়ি। তবে প্রচুর পরিমাণে খাওয়া হয় ইস্তামারান নামের খেজুরটি। বসরার সেরা খেজুর বারহি। বারহি অর্থাৎ গরম হাওয়া থেকে এ নামটি এসেছে। শুকনো খেজুরের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় আসরাসি।
মিসরে সবচেয়ে মূল্যবান খেজুর হায়ানি। হায়ান নামক গ্রামের নামে এর নামকরণ করা হয়েছে। গ্রামটিকে হাজিদের পুকুর বলা হয়। হজযাত্রীরা এককালে এ গ্রামে থেমে বিশ্রাম করতেন। সাইদি খেজুরও বিখ্যাত। আসরাসির মতোই এ খেজুরও শুকনো। তিউনিসিয়ার মানখির (নাকের মতো) খেজুর বেশ লম্বা আকারের। খেতে অনেকটা দেগলেত নূরের মতো। আলজেরিয়ার থুরিও শুকনো এবং এটি ওই ময়দা তৈরি করার মতো খেজুর। দক্ষিণ ইরানে এক ধরনের মিষ্টি খেজুর ফলে। কালো ধরনের এ খেজুরের নাম মাজাফাতি।
এতসব খেজুরের নাম না জানলেও গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের মানুষ আজওয়া খেজুরের নাম জানে। এটি মূলত মদিনার খেজুর এবং মহানবীর (স.) প্রিয়। ওমানে বু নারিনজা নামের খেজুরটিও স্বাদু। সৌদির খালাসার সঙ্গে এর স্বাদের মিল রয়েছে। মজার ব্যাপার হলো এত ধরনের খেজুরের খুব কম প্রকারের সঙ্গেই আমরা পরিচিত। খেজুর কিনে চেখে দেখেই এক জীবন কাটিয়ে দেয়া সম্ভব।
14 Popular Dates Varieties:
Medjool Dates
Piarom Dates
Deglet Noor Dates
Mazafati Dates
Barhi Dates
Rabbi Dates
Thoory Dates
Sayer Dates
Dayri Dates
Halawy Dates
Sukkari Dates
Khudri Dates
Zahedi Dates
Safawi Dates
Source: মাহমুদুর রহমান
Own study

অনেক পুষ্টি বাঁধা কপিতে

 Cabbage is a cruciferous vegetable that is low in calories and high in nutrients. Incorporating cabbage into your daily diet can provide a range of health benefits, including:

Rich in Nutrients: Cabbage is an excellent source of vitamins C, K, and B6, as well as dietary fiber, folate, and potassium.
Antioxidant Properties: Cabbage contains antioxidants that help to protect the body from free radicals, which can cause cellular damage and lead to chronic diseases such as cancer and heart disease.
Anti-inflammatory Properties: Cabbage contains anti-inflammatory compounds that can help to reduce inflammation in the body, which is a risk factor for many chronic diseases.
Digestive Health: The high fiber content in cabbage can promote digestive health and help prevent constipation.
Weight Loss: Cabbage is a low-calorie food that can help with weight loss and weight management.
Heart Health: Cabbage contains compounds that can help to lower cholesterol levels and reduce the risk of heart disease.
Immune System: Cabbage is rich in vitamin C, which is essential for a healthy immune system.
Skin Health: Vitamin C in cabbage can help to boost collagen production, which is important for healthy skin.
Adding cabbage to your daily diet can provide a range of health benefits and may help to reduce the risk of chronic diseases.

খুঁজে নাও ইসলামকে আর ইসলামে পুরোপুরি প্রবেশ করো

 আমি ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি

'I was forced to accept Islam'
-ড্যানিয়েলে লোডুকা Danielle LoDuca
Reverted Muslim Woman
আমি কখনোই আল্লাহকে খোঁজার গরজ অনুভব করিনি।
যখন কিছুই করার থাকত না, তখন কোনো পুরনো বই বা ভবন দেখে সময় কাটাতাম। কখনো কল্পনাও করিনি আমি মুসলমান হব। আমি খ্রিস্টানও হতে চাইনি। যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের প্রতিই আমার তীব্র বিতৃষ্ণা ছিল। প্রাচীন কোনো গ্রন্থ আমার জীবনযাপনের পথ-নির্দেশ করবে, তা নিয়ে ভাবিইনি। এমনকি কেউ যদি আমাকে কয়েক কোটি ডলার দিয়েও কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে বলত, আমি সরাসরি অস্বীকার করতাম।আমার প্রিয় লেখকদের অন্যতম ছিলেন Bertrand Arthur William Russell. তার মতে, ধর্ম হলো কুসংস্কারের চেয়ে একটু ভালো, সাধারণভাবে লোকজনের জন্য ক্ষতিকর, যদিও এর ইতিবাচক কিছু বিষয়ও আছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি জ্ঞানের পথ বন্ধ করে দেয়, ভীতি আর নির্ভরতা বাড়িয়ে দেয়। তাছাড়া আমাদের বিশ্বের যুদ্ধ, নির্যাতন আর দুর্দশার জন্য অনেকাংশে দায়ী ধর্ম। আমার মনে হতো, ধর্ম ছাড়াই তো ভালো আছি। আমি প্রমাণ করতে চাইতাম, ধর্ম আসলে একটা জোচ্চুরি। ধর্মকে হেয় করতে আমি পরিকল্পিত কাজ করার কথা ভাবতাম। ‘হ্যাঁ, সেই আমিই এখন মুসলমান।’
আমি ঘোষণা দিয়েই ইসলাম গ্রহণ করেছি।
আর সেটা না করে উপায়ও ছিল না। আমি অনুগত হয়েছি, ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছি।মজার ব্যাপার হলো, যখন ধর্মাবলম্বনকারীদের সাথে বিশেষ করে মুসলমান হিসেবে পরিচয়দানকারীদের সাথে কথা বলতাম, আমি প্রায়ই লক্ষ করতাম, তারা বিশ্বাস করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। তাদের ধর্মগ্রন্থে যতই সাংঘর্ষিক বিষয় থাকুক, ভুল থাকুক, তারা সবকিছু এড়িয়ে দ্বিধাহীনভাবে ধর্মকে আঁকড়ে ধরে। তারা জানে, তারা কী বিশ্বাস করে।ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো আল্লাহকে খুঁজকে চাইনি, সেই ইচ্ছাও আমার কখনো হয়নি। একদিন আমার এক বন্ধু ইসলামে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে বোঝাতে চাইল, আমি ক্ষুব্ধ হলাম।
কোনো মানুষ যখন কিছু বিশ্বাস করতে চায়, তখন তার মধ্যে অনেক সময়ই এমন একটা বোধ সৃষ্টি হয়, যার ফলে সেটা গ্রহণ করার ব্যাপারে আগ্রহ তার মধ্যে তৈরি হয়। ধর্মের ব্যাপারেও আমার মধ্যে তেমন একটা ধারণার সৃষ্টি হয়েছিল। আমি ধর্মকে স্রেফ একটা বাজে জিনিস হিসেবে বিশ্বাস করতে চাইতাম। এমন বিশ্বাস কিন্তু কোনো দৃঢ় প্রমাণের ভিত্তিতে হয়, এমন নয়। স্রেফ অনুমানের ওপর গড়ে ওঠে এ ধরণের বিশ্বাস। আমি যখন কোনো ধর্মীয় বই পড়তাম, তখন সেগুলোর প্রতি আমার কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকত না, তবে আমার উদ্দেশ্য থাকত তা থেকে ভুল-ত্রুটি বের করা। এর ফলে আমি আমার উদ্দেশ্যের প্রতি অটল থাকতে পারতাম।
আমার কোরআনের পেপারব্যাক অনুবাদটি পেয়েছিলাম বিনা মূল্যে। একদিন দেখলাম, এমবিএ’র কিছু ছেলে কুরআন বিলি করছে। আমি জানতে চাইলাম, এগুলো কি ফ্রি? তারা হ্যাঁ সূচক জবাব দিলে আমি একটা নিয়ে রওনা দিলাম। এসব বইয়ের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। কেবল ফ্রি পেয়েছিলাম বলে নিয়েছিলাম। তবে আমার উদ্দেশ্য ছিল, বইটা পড়ে আরো কিছু খুঁত যদি পাওয়া যায়, তবে ধর্মটির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে। আমি যে কপিটা পেয়েছিলাম, সেটির পাতাগুলো মলিন হয়ে গিয়েছিল, অনেক পুরনো ছিল সেটি। কিন্তু আমি যতই পড়তে থাকলাম, ততই বশীভূত হতে লাগলাম। আমি আগে যেসব ধর্মীয় গ্রন্থ পড়েছি, তা থেকে এটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমি অর্থ সহজেই বুঝতে পারছিলাম। সবকিছুই ছিল স্পষ্ট। আমার মনে পড়ল, আমার এক বন্ধু যখন আমাকে ইসলামে আল্লাহ কেমন তা বোঝাচ্ছিল, আমি রেগে গিয়েছিলাম, কিন্তু এবার পাতার পর পাতা উল্টে অনেক জায়গায় দেখতে পেলাম তাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘অবশ্যই আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়াময়।’মনে হলো, পবিত্র কুরআন সরাসরি আমার সাথে কথা বলছে, আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে আছে। এটা একটা ‘পুরনো গ্রন্থ’ কিন্তু পুরোপুরি প্রাসঙ্গিক। এর কাব্যিকতা, কল্পনাশক্তি এবং যেভাবে বার্তা পৌঁছে দেয়, তা আমাকে অন্তর থেকে নাড়া দিল। এর অভূতপূর্ব সৌন্দর্য আমি আগে কখনো টের পাইনি। মরুভূমির দমকা হাওয়া যেন সবকিছু উল্টে দিল। মনে হলো আমি যেন কিছু একটার জন্য দৌড়াচ্ছি।
কুরআন আমার বোধশক্তিতে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল।
কুরআন আমাকে নিদের্শনাবলী দেখে তারপর চিন্তা করতে, ভাবতে, বিবেচনা করতে বলল। এটা অন্ধ বিশ্বাস প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে উৎসাহিত করে। কুরআন মানুষকে কল্যাণের দিকে আহ্বান করে, স্রষ্টাকে স্বীকার করে নিতে বলে, সেইসাথে আধুনিকতা, মানবিকতা, সহমর্মিতার কথা বলে। অল্প সময়ের মধ্যেই আমার জীবনকে বদলে নেয়ার আগ্রহ তীব্র হয়। আমি ইসলাম সম্পর্কে অন্যান্য বই পড়তে শুরু করলাম। আমি দেখতে পেলাম, কুরআনে অনেক ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, অনেক হাদিসেও তেমনটা আছে। আমি দেখলাম, পবিত্র কুরআনে অনেক স্থানে আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল মুহাম্মদকে (সা) সংশোধন করা হয়েছে। আমার কাছে অদ্ভূত লাগল। এতেই বোঝা যায়, তিনি গ্রন্থটির লেখক নন।
আমি নতুন পথে হাঁটতে শুরু করলাম, পবিত্র কুরআনের জ্যোতি আর নবী মুহাম্মদ (সা) এর দেখানো রাস্তায়।
এই ব্যক্তিটির মধ্যে মিথ্যাবাদির কোনো আলামত দেখা যায়নি। তিনি সারা রাত নামাজ পড়তেন, জুলুমকারীদের ক্ষমা করে দিতে বলতেন, দয়া প্রদর্শনকে উৎসাহিত করতেন। সম্পদ আর ক্ষমতা তিনি প্রত্যাখান করতেন, কেবল আল্লাহর ইবাদতের বিশুদ্ধ বার্তাই প্রচার করতেন। আর তা করতে গিয়ে নির্মম নির্যাতন সহ্য করেছেন।
সব কিছুই সরল, সহজেই বোঝা যায়। আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। এই মহাবিশ্বের জটিল আর বৈচিত্র্যময় কোনো কিছুই ঘটনাক্রমে ঘটেনি। তা-ই সাধারণ বিষয় হলো, সেই একজন- যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তাঁকে অনুসরণ করতে হবে। আমার অ্যাপার্টমেন্টের কৃত্রিম লাইটিং এবং বাতাসের ওজন নিয়ে ভাবতে ভাবতে পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি পড়লাম: “কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমণ্ডলীর ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল, এরপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না?” [কুরআন ২১:৩০] এই আয়াত পড়ে আমার মাথা যেন দুই ভাগ হয়ে গেল। এটাই তো Big Bang তত্ত্ব (এটা স্রেফ একটা তত্ত্ব নয়)… সব জীবন্ত সত্ত্বাই পানি থেকে সৃষ্টি হয়েছে, বিজ্ঞানীরা মাত্র এটা আবিষ্কার করেছে। এটা ছিল অবাক করা বিষয়। এটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে উত্তেজনাকর এবং সবচেয়ে ভীতিকর সময়। আমি বইয়ের পর বই অধ্যায়ন করতে লাগলাম, তথ্যগুলো যাচাই করতে থাকলাম। এক রাতে আমি প্র্যাট ইনস্টিটিউট লাইব্রেরিতে বসে খোলা বইগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমার মুখটা হয়তো কিছুটা ফাঁক হয়ে গিয়েছিল। কী ঘটতে যাচ্ছে, আমি বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটুকু অনুভব করলাম, আমার সামনে যা রয়েছে, তা হলো সত্য। আগে আমি যেটাকে সত্য ভাবতাম, সেটার আর কোনা অস্তিত্ব ছিল না। এখন আমার সামনে দুটি বিকল্প ছিল। এর ভেতর একটার আসলে কোনো বিকল্পই ছিল না। আমি যা আবিষ্কার করেছিলাম, তা অস্বীকার করতে পারছিলাম না, অগ্রাহ্য করতে পারছিলাম না। আগের মতোই চলব, এমনটাও ভাবছিলাম সামান্য সময়ের জন্য। সেটাও সম্ভব ছিল না। ‘আমার কাছে পথ খোলা ছিল কেবল একটাই।’
ইসলাম গ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না আমার সামনে।
অন্য কিছু করা মানেই ছিল সত্যকে অস্বীকার করা।
NB:
আল কুরআন ২১:৩০(সূরা আম্বিয়া আয়াত ৩০)
যারা (নবীর কথা মেনে নিতে) অস্বীকার করেছে তারা কি চিন্তা করে না যে, এসব আকাশ ও পৃথিবী এক সাথে মিশে ছিল, তারপর আমি তাদেরকে আলাদা করলাম এবং পানি থেকে সৃষ্টি করলাম প্রত্যেকটি প্রাণীকে৷ তারা কি (আমার এ সৃষ্টি ক্ষমতাকে) মানে না ?
ড্যানিয়েলে লোডুকা-Danielle LoDuca ইউরোপিয়ান বংশোদ্ভূত আমেরিকান। ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তিনি। ২০০২ সালে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। পেশায় তিনি শিল্পী। ব্যক্তিজীবনে পাঁচ সন্তানের মা। ইসলাম নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।
https://www.islamicity.org/.../danielle-loduca-i-was.../

কাজু কথন

 বাদামের জগতে এক রাজকীয় স্থানে রয়েছে পুষ্টিগুণ এবং শরীরিক উপকারিতা সমৃদ্ধ এক বাদাম, আর তা হলো কাজু বাদাম। যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো cashew nuts. গুণাগুণের দিক থেকে কাজু বাদামের কোনও বিকল্প নেই। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, খনিজ, প্রোটিন এবং অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট। স্বাস্থ্যকর সব খাবারের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এই কাজু বাদাম নিয়মিত খেলে শরীরের নানা রকম সমস্যার সমাধান পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞ বা ডাক্তাররা একে “প্রাকৃতিক ভিটামিন ট্যাবলেট” বলেও আখ্যা দিয়ে থাকেন।
প্রতিদিন কেউ যদি নিয়ম করে এক মুঠো করে কাজু বাদাম খাওয়ার অভ্যাস করে তাহলে তা শরীরের পুষ্টিকর উপাদানের ঘাটতি দূর হয়, সেই সাথে পাওয়া যায় আরও অনেক উপাকার একাধিক গবেষণায় তা প্রমাণিত হয়েছে। আজ তবে কাজু বাদাম খাওয়ার উপকারিতা এবং সেই সাথে এটি খাওয়ার নিয়ম জেনে নেওয়া যাক।
নিয়মিত কাজু বাদাম খাওয়ার উপকারিতাঃ
১. রক্ত-শূণ্যতার মতো রোগের প্রকোপ কমেঃ
কাজু বাদামে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, যা শরীরে লোহিত রক্ত কণিকার উতপাদন এতো পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় যে তা দেহের রক্তাল্পতার মতো সমস্যা দূর করে দেয়। সেই সাথে তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়িয়ে দেয়। তাই অ্যানিমিয়ার মতো রোগের প্রকোপ কমতে এই কাজু বাদাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
২. ক্যান্সারের মতো মরণ ব্যাধি দূরে করেঃ
কাজু বাদামের ভেতরে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, যা ক্যান্সার সেলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা সৃষ্টি করে, সেই সাথে টিউমারও যাতে দেখা না দেয় বা আক্রমণ না করে সেদিকেও লক্ষ্য রাখে। এখানে এই মারণ ব্যাধিকে সাপ ও অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টকে বেজির সাথে তুলনা করা যেতে পারে উদাহরন হিসেবে। কাজু বাদামে প্রঅ্যান্থো-সায়ানিডিন Proanthocyanidin নামে একটি উপাদান থাকে, যার ফলে এই বিশেষ কাজ হয়।
৩. হাড়কে মজবুত করেঃ
কাজু বাদামে থাকে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং ম্যাগনেসিয়াম। যার ফলে এই বাদামটি নিয়মিত খেলে তা হাড়ের উপর প্রভাব ফেলে ফলে হাড়ের শক্তি বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। পরবর্তিতে বৃদ্ধ হওয়ার পরও তা অস্টিওআর্থারাইটিসের মতো হাড়ের রোগ হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমিয়ে দেয়। কেননা কাজু বাদামে আছে ভিটামিন-K, যা হাড়ের জন্য অনেক উপকারি উপাদান।
৪. ডায়াবেটিস মতো ব্যাধি রোধ করেঃ
ডায়াবেটিসের রোগি যদি নিয়মিত রুটিন করে এক মুঠো করে কাজু বাদাম খাওয়া শুরু করে, তাহলে তা দেহের ভিতরে এমন কিছু পরিবর্তন আনতে শুরু করে যে, এতে করে ইনসুলিনের কর্মক্ষমতা বেড়ে যায়। যার ফলে রক্তে থাকা শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, এবং তা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা কমে অনেক কমে যায় বিভিন্ন গবেষণায় এটা দেখা গিয়েছে। তাই পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে যে যাদের পরিবারে এই মরণ রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের নিয়মিত কাজু বাদাম খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত।
৫.বিভিন্ন প্রকার সংক্রমণের ঝুঁকি কমায়ঃ
কাজু বাদামে থাকে জিঙ্ক, যার কাজ হলো ভাইরাসের আক্রমণের হাত থেকে শরীরকে রক্ষা করা। তাই নিয়মিত কাজু খেলে আপনি এই ধরনের ইনফেকশনের হাত থেকে রেহাই পেতে পারেন।
৬. হার্টের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করেঃ
কাজু বাদামের প্রধান উপাদান অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট ক্যান্সার রোগকে দূরে রাখার সাথে সাথে নানারকম হার্টের রোগ থেকে বাঁচাতেও বিশেষ কাজ করে থাকে।
৭. চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেঃ
কাজু বাদামে প্রচুর পরিমাণে রয়েছে কপার। আর এই উপাদানটি হল সেই খনিজ, যা চুলের সৌন্দর্য বাড়ানোর সাথে সাথে চুলের গোড়াকে শক্ত করতে বিশেষ দায়িত্ব পালন করে থাকে। এছাড়াও কাজু বাদামে থাকা কপার শরীরের ভিতরের কিছু এনজাইমের ক্ষরণ বৃদ্ধি করে যা চুলের রংকে কালো রাখতে সহায়তা করে।
কাজু বাদাম খাওয়ার সঠিক নিয়মঃ
কাজু বাদাম খাওয়ার উপকারিতা অনেক। তাই এটি নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস করা উচিত। তবে কিভাবে বা কি নিয়মে খাবেন তা জানা দরকার। এর জন্য প্রথমে আপনাকে ঠিক করতে হবে আপনি কেন খাবেন? এবং কখন খাবেন?
যদি আপনি ডায়েট এর জন্য খেয়ে থাকেন তাহলে সকালের নাস্তার পর এবং দুপুরের খাবারের আগের সময়, যেমন- ১১.০০–১.০০ টার মধ্যে একমুঠ বাদাম খেতে পারেন। আবার বিকালেও যখন হালকা ক্ষুধা লাগবে তখন নাস্তা হিসাবে অন্য খাবার না খেয়ে একমুঠ কাজু বাদাম ৪.০০–৫.৩০ টার মধ্যেও খেতে পারেন। এতে ক্ষুধাও চলে যাবে সেই সাথে আপনার ডায়েটও ঠিক থাকবে।
ডায়েট ছাড়া যদি অন্য কোন কারণে খেয়ে থাকেন তাহলে ১০–১২ টি বাদাম রাতে ভিজিয়ে রেখে সকালে তা খেয়ে নিবেন।
বিশেষ সর্তকতাঃ
অতিরিক্ত মাত্রায় কাজু বাদাম খাওয়া যাবে না। অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে কিন্তু শরীরের উপকারের পরিবর্তে অপকারটা বেশি হবে। কারণ এর উপাদানগুলো বেশি মাত্রায় শরীরে যেতে থাকলে তা উল্টো ফল হতে শুরু করে। তাই কাজু বাদাম সবসময় পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে, তবেই এর সুফল পাওয়া যাবে
https://bn.quora.com/profile/

নিকোটিনমুক্ত রাখে কোন খাবার

 সিগারেটের মূল উপাদান নিকোটিন। নিকোটিন উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে, যা নার্ভ ও মাংসপেশী ব্লক করে দেয়। ফলে এরা সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। নিকোটিন হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। যারা ধূমপান করেন তাদের জন্য এমন কিছু খাবার আছে, যা খেলে শরীর থেকে নিকোটিন নিষ্কাশিত হতে সহায়তা করে।

ব্রোকলি: ব্রোকলিতে উচ্চমাত্রার ভিটামিন বি৫ ও ভিটামিন সি থাকে। বি ভিটামিন শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। ব্রোকলি খেলে মেটাবোলিজম বৃদ্ধি পায় এবং ফুসফুসকে টক্সিন থেকে রক্ষা করে। ব্রোকলিতে জিন থাকে, যা ফুসফুসের কোষকে আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
কমলা: কমলা সাইট্রাস ফল। নিকোটিন ভিটামিন সি হ্রাস করে এবং চাপ বৃদ্ধি করে। কমলা খেলে ভিটামিন সি-এর স্তর পরিপূর্ণ হয় এবং স্ট্রেস ও উদ্বিগ্নতা কমে।
পালংশাক: গবেষণায় দেখা গেছে যে, ধূমপায়ীদের ফলিক এসিডের সাপ্লাই কম থাকে। এই এসিড মাংসপেশী, স্নায়ু এবং ব্রেইন হেলথ ঠিক রাখার জন্য প্রয়োজন। সৌভাগ্যক্রমে পালংশাকে প্রচুর পরিমাণে ফলিক এসিড থাকে। পালংশাক খেলে স্মোকিংয়ের স্বাদ নষ্ট হয়!
গাজর: গাজরের জুস খেলে কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায় বেশি। প্রতিদিন এক কাপ গাজরের জুস পান করলে আপনার শরীর ভিটামিন এ, বি, সি এবং কে দিয়ে পরিপূর্ণ হবে, যা আপনার শরীর থেকে নিকোটিন বের করে দিতে সাহায্য করে।
পানি: পৃথিবীর সবচেয়ে আন্ডাররেটেড পানীয় হচ্ছে পানি। নিকোটিনের দ্বারা শরীরের অভ্যন্তরের যে ক্ষতি হয় তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পানি। আপনি কি জানেন নিকোটিন মানুষকে পানিশূন্য করে? প্রতিদিন কমপক্ষে ৮ গ্লাস পানি পান করলে শরীর রিহাইড্রেট হয় এবং মেটাবোলিজম বৃদ্ধি পায় যার ফলে শরীর থেকে বিষাক্ত দ্রব্য বের হয়ে যায়।
এছাড়াও আদা, লেবু, ডালিম, কিউই ইত্যাদি খেলে নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা যায়।
সর্বোপরি নিকোটিনমুক্ত থাকতে চাইলে ধূমপান ছাড়তেই হবে।
সূত্র: হেলথ লাইন