Sunday, May 24, 2020

জালিম কারা? কুরআন ভিত্তিক একটি বিশ্লেষন

১.
জালিম শব্দটি আরবি। ‘আজ-জুল্ম’ শব্দমূল থেকে উদ্গত। যার আভিধানিক অর্থ ‘অত্যাচার করা, উতপীড়ন করা, নিপীড়ন করা, নির্যাতন করা, দুর্ব্যবহার করা।’ ব্যাখ্যা: যেসব মানুষ কারো প্রতি অত্যাচার, উতপীড়ন, নিপীড়ন, নির্যাতন এবং দুর্ব্যবহার করে তাদেরকে জালিম এবং যাদের প্রতি জুল্ম করা হয় তাদেরকে মাজলুম বলে।
‘আজ-জুল্ম’ শব্দটি ক্রিয়াবাচক, জালিম শব্দটি কর্তৃবাচক এবং মাজলুম শব্দটি কর্মবাচক।
১. জালিম হলো আত্ম-অবিচারকারী বা নিজের প্রতি জুলুমকারী। কুরআন মাজিদের একটি উদাহরণ, সুলায়মান আ:-এর দরবারে উপস্থিত রানী বিলকিসকে বলা হলো, এ প্রাসাদে প্রবেশ করো। যখন সে তাতে প্রবেশ করতে অগ্রসর হলো তখন সে দেখল, যেন এক গভীর জলাশয় এবং সে তার পদদ্বয় অনাবৃত করতে থাকল। এ সময় তাকে হজরত সুলায়মান আ: বললেন, এটা তো স্বচ্ছ স্ফটিকমণ্ডিত প্রাসাদ মাত্র। তখন সে নারী বলল, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমি তো আত্ম-অবিচার বা নিজের প্রতি জুলুম করতে চলছিলাম। (অর্থাত প্রাসাদের মেঝে স্বচ্ছ কাঁচমণ্ডিত ছিল। দেখতে পানি বলে ভুল হতো। সে কারণে রানী বিলকিস কাপড় গুটিয়ে নিচ্ছিল।) আমি সুলায়মানের সাথে বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম’ (সূরা নামল: ৪৪)।
২. জালিম সে তো নিজের খেয়ালখুশির অনুসরণকারী। এ অর্থে কুরআন মাজিদের একটি আয়াত, ‘যদি আপনি আহলে কিতাবদের কাছে সমুদয় নিদর্শন উপস্থাপন করেন, তবুও তারা আপনার কিবলা মেনে নেবে না এবং আপনিও তাদের কিবলা মানেন না। আপনার কাছে জ্ঞান আসার পরও যদি আপনি তাদের নিজেদের খেয়ালখুশির অনুসরণ করেন তাহলে নিশ্চয়ই আপনি সেসব জালিমের অন্তর্ভুক্ত হবেন’ (সূরা বাকারা: ১৪৫)।
৩. জালিম হলো আল্লাহ তায়ালার সাথে অংশীদার স্থাপনকারী। ‘স্মরণ করো, যখন লুকমান উপদেশছলে স্বীয় পুত্রকে বলেছিলেন, হে আমার ছেলে! আল্লাহর সাথে কোনো শরীক করো না। নিশ্চয়ই শির্ক অতি বড় ধরনের জুলুমই বটে’ (সূরা লুকমান: ১৩)।
৪. জালিম হলো আল্লাহ তায়ালার বিধানের বিপরীত বিচার-ফয়সালাকারী।  ‘আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং যখমের বিনিময়ে সমান যখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে গোনাহ থেকে পাক হয়ে যায়। আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তদনুযায়ী যারা বিচার-ফায়সালা করে না তারাই জালিম’ (সূরা মায়িদা: ৪৫)।
৫. জালিম হলো, যারা সাক্ষ্য গোপনকারী তথা প্রত্যক্ষ বা চাক্ষুস বিষয়কে উল্টিয়ে ফেলে মিথ্যার ব্যবসা করে। ‘অথবা তোমরা কি বলছ যে, নিশ্চয়ই ইবরাহিম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকুব আ: ও তাদের সন্তানগণ ইহুদি অথবা খ্রিষ্টান ছিলেন? আপনি বলে দিন, তোমরা বেশি জানো, না আল্লাহ বেশি জানেন? যে ব্যক্তি সাক্ষ্য গোপন করে তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে?’ (সূরা বাকারা: ১৪০)।
৬. জালিম হলো, আল্লাহ তায়ালার আদেশ অমান্যকারী।
‘এবং আমি আদমকে হুকুম করলাম যে, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাকো এবং ওখানে যা চাও, যেখান থেকে চাও, পরিতৃপ্তিসহ খেতে থাকো, কিন্তু তোমরা কখনোই এ গাছের নিকটবর্তী হয়ো না। তাহলে তোমরা জালিমদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’ (সূরা বাকারা: ৩৫)।  আল্লাহ বলেন, ‘তারা বলল, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা তো আমাদের নিজেদের প্রতি জুলুম করে ফেলেছি। এখন তুমি যদি আমাদেরকে ক্ষমা এবং অনুগ্রহ না করো তাহলে তো আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শামিল হয়ে যাবো’ (সূরা আরাফ: ২৩)। হজরত আদম আ: শয়তানের কুমন্ত্রণায় ওই আদেশটি লঙ্ঘন করে জালিম সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এ কথা তাঁর বক্তব্যই প্রমাণ করে।

৭. জালিম হলো, উপহাসকারী, কাউকে অন্যায়ভাবে দোষারোপকারী এবং অন্যকে মন্দনামে আহ্বানকারী। ‘হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষের অপর কোনো পুরুষকে উপহাস করা উচিত নয়। কেননা যাকে উপহাস করা হলো সে তাদের থেকে উত্তমও হতে পারে এবং কোনো নারীর অপর কোনো নারীকেও উপহাস করা উচিত নয়। কেননা যাকে উপহাস করা হলো, সে উপহাসকারিণী থেকে উত্তমও হতে পারে। তোমরা তোমাদের একে অপরের প্রতি দোষারোপ করবে না এবং তোমাদের কাউকে মন্দ নামে ডাকবে না। ঈমান গ্রহণের পর মন্দ নামে ডাকা বড় পাপের কাজ। যারা এর থেকে ফিরে থাকবে না, তারাই তো জালিম’ (সূরা হুজরাত: ১১)।

৮. জালিম হলো, আল্লাহ তায়ালার প্রতি মিথ্যা আরোপকারী অথবা তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ কুরআন মাজিদকে মিথ্যা প্রতিপন্নকারী। ‘তার থেকেও বড় জালিম আর কে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যাচার করে অথবা সত্য তার সামনে এসে যাওয়া সত্ত্বেও তা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে? জাহান্নামই কি এ ধরনের কাফিরদের অবাসস্থল নয়?’ (সূরা আনকাবুত: ৬৮)।

৯. জালিম হলো, আল্লাহ তায়ালার ঘরে তারই নাম স্মরণে বাধা দানকারী এবং তা ধ্বংস সাধনে প্রচেষ্টাকারী। ‘তার থেকেও বড় জালিম আর কে, যে মানুষকে আল্লাহ তায়ালার মসজিদে আল্লাহর নাম উচ্চারণে বাধা প্রদান করে এবং তা ধ্বংস সাধনে প্রচেষ্টা করে বেড়ায়? এ ধরনের লোকদের ইবাদতের ওই সব স্থানে ঢোকাই উচিত নয়। আর যদি যায় তাহলে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায়ই যেন যায়। তাদের জন্য পার্থিব জীবনে অপমান, লাঞ্ছনা এবং পরকালীন জীবনে ভয়াবহ শাস্তি রয়েছে’ (সূরা বাকারা: ১১৪)।

১০. জালিম হলো, সুদভিত্তিক অর্থনীতি তথা ব্যবসাবাণিজ্য, লেনদেন ইত্যাদি পরিচালনাকারী। ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং লোকদের কাছে তোমাদের যে সুদ বাকি রয়ে গেছে তা ছেড়ে দাও। যদি প্রকৃতপক্ষে মুমিন হয়ে থাকো, আর যদি তা না করো তবে জেনে রেখো, এটা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। এখনো যদি তাওবা করো এবং সুদ ছেড়ে দাও তাহলে তোমরা আসল মূলধনের অধিকারী হবে। তোমরা জুলুম করবে না, তাহলে তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না’ (সূরা বাকারা: ২৭৮-২৭৯) ।

১১. জালিম হলো, সেসব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি যারা মানুষকে ভয়াবহ আগুন বা ‘নার’-এর পানে তথা জাহান্নামের দিকে আহ্বান করে। ‘অতঃপর আমি তাকে ও তার সৈন্যবাহিনীকে পাকড়াও করলাম এবং সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম। দেখে নাও, জালিমদের পরিণতি কিরূপ হয়েছিল। আমি তাদেরকে নেতা বানিয়ে ছিলাম আর তারা মানুষকে ভয়াবহ ‘নার’-এর পানে আহ্বান করত। কিয়ামতের দিন তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না’ (সূরা কাসাস: ৪০-৪১)।

১২. জালিম হলো তারা যারা মানুষকে আল্লাহর পথে চলতে বাধা প্রদান করে, তাতে বক্রতা খোঁজে এবং আখিরাতকে প্রত্যাখ্যান করে।
‘যারা আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বাধা দেয়, সে পথকে বাঁকা করে দিতে চায় এবং আখিরাত তথা আল্লাহর দরবারে প্রত্যাবর্তন অস্বীকার করে’ (সূরা হুদ: ১৯)।

১৩. জালিম হলো ভূমিদস্যু। ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে জুলুমের পথ অবলম্বন করে কারোর এক বিঘাত পরিমাণ জমি আত্মসাত করে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত তবক জমিন ঝুলিয়ে দেয়া হবে’ (বুখারি-২৯৫৯)।

১৪. জালিম হলো, যারা ধর্মের ব্যাপারে মুমিনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপনকারী ব্যক্তি। ‘আল্লাহ তো তোমাদের কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন। যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদের দেশ থেকে বহিষ্কার করেছে এবং তোমাদের বহিষ্কারে সাহায্য করেছে। এ ধরনের লোকদের সাথে যারা বন্ধুত্ব করে তারাই জালিম’ (সূরা মুমতাহিনা: ৯)।

উপসংহার: জুলুম একটি শব্দ। এর ব্যাপকতা অনেক। আল্লাহ তায়ালার নাফরমানি, অবাধ্যতা, সীমাঅতিক্রম কিংবা কারো নিজের প্রতি অথবা অন্য কোনো মানুষের প্রতি অন্যায়-অবিচার, উতপীড়ন-নিপীড়ন, দুর্ব্যবহার এবং যেকোনো সৃষ্ট্ জীবের প্রতি প্রকৃত অধিকার হরণ বা তার যথোপযুক্ত

২.
সাপের কবলে পড়ে কাঁদে এক নির্জীব শিকার।
শেষ হয়ে এলো তার
জীবন-পিপাসা।
মাথা ঠুকে মরে সে মাটিতে
সকল জীবন, স্বপ্ন, আলোকের মুক্ত অধিকার
বাতাসে বাতাসে ভাসে ব্যর্থতার আহাজারি, ব্যর্থ হাহাকার।
এখানে সভয়ে দেখি আদমের সন্তানেরা
হলো কোটি মৃত্যুর শিকার,
কোটি আজদাহা-লোভ-কুণ্ডলীতে ক্ষয়মান দিগন্ত-কিনার
লীলাভূমি হলো জালিমের।

দিন শেষ হলো আমাদের।

দিকে দিকে শয়তানের অনুচর সেই জালিমেরা
তুলে দিল বেড়া,

কুল মাখলুক আজ সর্পবাস হলো জালিমের
দিন শেষ হলো আমাদের।
আমাদের ক্ষুধাতুর শবের পর্বতে
অত্যাচার করে গেলে নিশ্চিতে-বিলাসে
আমাদের ভবিষ্যত কালো-সিয়া অন্ধকারে শেষ হয়ে আসে
ক্ষুধাহীন হাড় ভাসে পথে।

তোমাদের পরিচয় আজ হলো শেষ।
অসংখ্য, অশেষ।
তোমরা সকলেই এক তোমাদের এক মজহাব
হারাম নেশায় মত্ত ছুড়িতেছে বিষাক্ত শারাব
জনতার বুকে মৃত্যু বিষ,
ছড়াতেছ সমাজ পুরীষ,
জালিমের সাথে নিতেছ সমান আঘাত,
মানুষের রক্ত শুষি আনিতেছ ভয়াবহ
অন্ধকার কালো-সিয়া রাত।
দুর্বল, বিশীর্ণ এই জনতার বিশ্বাসের চরম সুযোগে
যত পারো করো অত্যাচার।
আজ শুধু ঘৃণা ছাড়া আমাদের আর
কোনো শক্তি নাই এ দুর্যোগে।

আজ শুধু ঘৃণা করে যাব তোমাদেরে।
দিগন্ত-প্রসারী এই ঘৃণার ধোঁয়ায়
তোমাদের ঘিরে ফেলে কোন এক প্রবঞ্চিত ক্ষুধিত প্রভাতে
মুহূর্তে মৃত্যুর মতো প্রতিশোধ-লেলিহান ফাটিবে হাভিয়া
জালিমের আর জুলুমের বুকে এক সাথে চলিবে রহিয়া
শৃঙ্খল, শোষণ-ক্ষুব্ধ রুধিরাক্ত কলিজার উত্তপ্ত গরল।

সেই বিষে শেষ হবে, সে আঘাতে শেষ হবে
অভ্রভেদী অত্যাচার-তিক্ত হলাহল
এই উত্পীড়িত হাড়, বুভুক্ষু জিন্দেগি আর পাদপিষ্ট সিনা
আজ শুধু তোমাদেরে করে যাবে ঘৃণা
উত্তপ্ত লেলিহ ধোঁয়া বুকে তার উত্পীড়িত রাত্রি হবে ভোর
সে আগুন জ্বালানোর
দুর্বার জেহাদে।
ঐ দেখো, সেই ঘৃণা, সেই ঘনায়িত ধোঁয়া
সে লেলিহ মানবতা ক্ষুধাতুর বিষাক্ত প্রভাবে
মাথা তোলে জুলুমের ফাঁদে।
ফররুখ আহমদের

‘জালিম ও মজলুম’

কৃতজ্ঞতা: dailynayadiganta.com
kalerkantho.com








Wednesday, May 20, 2020

৫ পরীক্ষার ব্যাপারে উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন নবী (সা.)

‘অতঃপর আমি তাদের প্লাবণ, পঙ্গোপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত দ্বারা ক্লিষ্ট করি। এগুলো স্পষ্ট নিদর্শন; কিন্তু তারা দাম্ভিকই রয়ে গেল, আর তারা ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়।’ (সূরা আরাফ, আয়াত : ১৩৩)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের ফলে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে; যার ফলে তাদের কৃতকর্মের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তাদের তিনি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সূরা রূম, আয়াত: ৪১)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা: বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা: আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘হে মুহাজিররা! তোমরা পাঁচটি বিষয়ে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। তবে আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি যেন তোমরা তার সম্মুখীন না হও।
১. যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেখানে মহামারী আকারে প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব হয়। তাছাড়া এমন সব রোগের উদ্ভব হয়, যা আগের লোকদের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি।
২. যখন কোনো জাতি ওজন ও পরিমাপে কারচুপি করে তখন তাদের ওপর নেমে আসে দুর্ভিক্ষ, কঠিন বিপদ।
৩. যখন কোনো জাতি জাকাত আদায় করে না তখন আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ বন্ধ করে দেয়া হয়। যদি ভূ-পৃষ্ঠে চতুষ্পদ জন্তু ও নির্বাক প্রাণী না থাকত তাহলে আর কখনো বৃষ্টিপাত হতো না।
৪. যখন কোনো জাতি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তখন আল্লাহ তাদের ওপর বিজাতীয় দুশমনকে ক্ষমতাসীন করেন এবং সে তাদের সহায়-সম্পদ সবকিছু কেড়ে নেয়।
৫. যখন তোমাদের শাসকবর্গ আল্লাহর কিতাব (কুরআন) মোতাবেক মীমাংসা করে না এবং আল্লাহর নাজিলকৃত বিধানকে গ্রহণ করে না, তখন আল্লাহ তাদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দেন।’ (ইবনে মাজাহ)
যুগে যুগে মানুষ এই কাজগুলোই করছে সন্তর্পণে। তাই একুশ শতকে এসেও মানুষের সঠিক পথে কিংবা অন্যায় থেকে ফিরে আনতেই হয়তো বিশ্বময় চলছে এই করোনার আঘাত। এতে আমরা হয়তো ঘরমুখী জীবনে সঠিক পথে ফিরে এসে পরিমিত জীবনবোধে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারবো।

বিপদ-আপদ ও ঈমান

বিপদ-আপদের ঘনঘটার মধ্যেও যে জিনিস মানুষকে সঠিক পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখে এবং কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতিতে পদস্খলন হতে দেয় না সেই একমাত্র জিনিসটি হচ্ছে আল্লাহ প্রতি ঈমান ৷
যার অন্তরে আল্লাহর প্রতি ঈমান নেই সে এসব বিপদ -আপদকে হয় আকস্মিক দুর্ঘটনার ফল মনে করে অথবা এসব বিপদ-আপদ দেয়ার ও দূর করার ব্যাপারে পার্থিব শক্তিসমূহকে কার্যকর বলে বিশ্বাস করে কিংবা সেসবকে এমন কাল্পনিক শক্তিসমূহের কাজ বলে মনে করে যাদেরকে মানুষের কুসংস্কারজনিত বিশ্বাস ক্ষতি ও কল্যাণ করতে সক্ষম বলে ধরে নিয়েছে অথবা তারা আল্লাহকে সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী বলে নিখাদ ও নির্ভেজাল ঈমানের সাথে মানে না ৷
ভিন্ন ভিন্ন এসব ক্ষেত্র ও পরিস্থিতিতে মানুষ নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দেয় ৷ একটি বিশেষ সীমা পর্যন্ত সে বিপদ-আপদ বরদাশত করে বটে কিন্তু তার পরই সে পরাজয় স্বীকার করে নেয় ৷ তখন বিভিন্ন আস্তানায় মাথা নত করে, সব রকম আপমান ও লাঞ্ছনা স্বীকার করে নেয় ৷ এ সময় সে যে কোন হীন কাজ ও আচরণ করতে পারে ৷ সব রকম ভ্রান্ত কাজ করতে প্রস্তুত হয়ে যায় ৷ আল্লাহকে গালি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেনা ৷ এমনকি আত্মহত্যা পর্যন্ত করে বসে ৷
অপরদিকে যে ব্যক্তি একথা জানে এবং আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ তা'আলার হাতেই সবকিছু ৷ তিনিই এই বিশ্ব-জাহানের মালিক ও শাসক ৷ তাঁর অনুমোদনক্রমেই বিপদ-মসিবত আসতে এবং দূরীভূত হতে পারে ৷ এই ব্যক্তির মনকে আল্লাহ তা'আলা ধৈর্য ও আনুগত্য এবং তাকদীরের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার 'তাওফীক' দান করেন ৷ তাকে সাহস ও দৃঢ় মনোবল নিয়ে সব রকম পরিস্থিতিতে মোকাবিলা করার শক্তি দান করেন ৷ অন্ধকার থেকে অন্ধকারতম পরিস্থিতিতেও তার সামনে আল্লাহর দয়া ও সাহসহারা করতে পারে না যে, সে সত্য ও সঠিক পথ থেকে সরে যাবে বা বাতিলের সামনে মাথা নত করবে কিংবা আল্লাহ ছাড়া আর কারো দরবারে তার দুঃখ -বেদনার দাওয়াই বা প্রতিকার তালাশ করবে ৷
এভাবে প্রতিটি বিপদ মুসিবতই তার জন্য অধিক কল্যাণের দরজা উন্মুক্ত করে দেয় ৷ প্রকৃতপক্ষে কোন মুসিবতই তার মুসিবত থাকে না বরং পরিণামের দিক থেকে সরাসরি রহমতে পরিণত হয় ৷ কেননা সে এই মুসিবতে নিঃশেষ হয়ে যাক বা সফলভাবে উৎরিয়ে যাক-উভয় অবস্থায়ই সে তার প্রভুর দেয়া পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে যায় ৷

তাওবায়ে “নাসূহ“


মূল আয়াতে (নাসূহ-نَّصُوحًا) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে আরবী ভাষায় যার অর্থ নিষ্কলুষতা কল্যাণকামিতা খাঁটি মধু যা মোম অন্যান্য আবর্জনা থেকে মুক্ত করা হয়েছে তাকে আরবীতেনাসূহ বলা হয় ছেঁড়া কাপড় সেলাই করে দেয়া এবং ফাঁটা ফাঁটা কাপড় ঠিক করে দেয়া বুঝাতে আরবীনাসূহ” শব্দ ব্যবহার করা হয়৷ অতএব, তাওবা শব্দের সাথেনাসূহ”  বিশেষণ যুক্ত করলে হয় তার আভিধানিক অর্থ হবে এমন তাওবা যার মধ্যে প্রদর্শনী বা মুনাফিকীর লেশমাত্র নেই৷
অথবা তার অর্থ হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজের কল্যাণ কামনা করবে এবং গোনাহ থেকে তাওবা করে নিজেকে মন্দ পারিণাম থেকে রক্ষা করবে৷ অথবা তার অর্থ হবে গোনাহর কারণে তার দীনদারীর মধ্যে যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে তাওবা দ্বারা তা সংশোধন করবে৷
অথবা সে তাওবা করে নিজের জীবনকে এমন সুন্দর করে গড়ে তুলবে যে, অন্যের জন্য সে উপদেশ গ্রহণের কারণ হবে এবং তাকে দেখে অন্যরাও তার মত নিজেদেরকে সংশোধন করে নেবে৷
'তাওবায়ে নাসূহ'-এর আভিধানিক অর্থ থেকে অর্থসমূহই প্রতিভাত হয়৷ এরপর অবশিষ্ট থাকে তাওবায়ে নাসূহ এর শরয়ী অর্থ৷
আমরা এর শরয়ী অর্থের ব্যাখ্যা পাই যির ইবনে হুবাইশের মাধ্যমে ইবনে আবী হাতেম কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদীসে৷ যির ইবনে হুবাইশ বলেনঃ আমি উবাই ইবনে কা'বের (রা) কাছে 'তাওবায়ে নাসূহ' এর অর্থ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেনঃআমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একই প্রশ্ন করেছিলাম৷ তিনি বললেনঃ এর অর্থ হচ্ছে, কখনো তোমার দ্বারা কোন অপরাধ সংঘটিত হলে তুমি নিজের গোনাহর জন্য লজ্জিত হবে৷ তারপর লজ্জিত হয়ে সে জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং ভবিষ্যতে আর কখনো কাজ করো না৷
হযরত উমর (রা), হযরত আবদুল্লাহ (রা) ইবনে মাসউদ এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকেও অর্থই উদ্ধৃত হয়েছে৷
অন্য একটি বর্ণনা অনুসারে হযরত উমর 'তাওবায়ে নাসূহ' সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবেঃ
'তাওবা' পরে পুনরায় গোনাহ করা তো দূরের কথা তা করার আকাংখা পর্যন্ত করবে না (ইবনে জারীর)
হযরত আলী (রা) একবার এক বেদুঈনকে মুখ থেকে ঝটপট করে তাওবা ইসতিগফারের শব্দ উচ্চারণ করতে দেখে বললেন, এতো মিথ্যাবাদীদের তাওবা৷
সে জিজ্ঞেস করলো, তাহলে সত্যিকার তাওবা কি? তিনি বললেন সত্যিকার তাওবার সাথে ছয়টি জিনিস থাকতে হবেঃ
() যা কিছু ঘটেছে তার জন্য লজ্জিত হও৷
() নিজের যে কর্তব্য করণীয় সম্পর্কে গাফলতি করছ তা সম্পাদন কর৷
() যার হক নষ্ট করেছ তা ফিরিয়ে দাও৷
() যাকে কষ্ট দিয়েছ তার কাছে মাফ চাও৷
() প্রতিজ্ঞা করো ভবিষ্যতে গোনাহ আর করবে না৷ এবং
() নফসকে এতদিন পর্যন্ত যেভাবে গোনাহর কাজে অভ্যস্ত করেছ ঠিক তেমনি ভাবে আনুগত্যে নিয়োজিত কর৷ এতদিন পর্যন্ত নফসকে যেভাবে আল্লাহর অবাধ্যতার মজায় নিয়োজিত রেখেছিলে এখন তাকে তেমনি আল্লাহর আনুগত্যের তিক্ততা আস্বাদন করাও(তাফসীরে কাশশাফ)
তাওবা সম্পর্কিত বিষয়ে আরো কয়েকটি জিনিস ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকারঃ
প্রথমতঃ প্রকৃতপক্ষে তাওবা হচ্ছে কোন গোনাহের কারণে জন্য লজ্জিত হওয়া যে, তা আল্লাহর নাফরমানী৷ কোন গোনাহের কাজ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অথবা বদনামের কারণ অথবা আর্থিক ক্ষতির কারণ হওয়ায় তা থেকে বিরত থাকার সংকল্প করা তাওবার সংজ্ঞায় পড়ে না৷
দ্বিতীয়তঃ যখনই কেউ বুঝতে পারবে যে, তার দ্বারা আল্লাহর নাফরমানী হয়েছে, তার উচিত ততক্ষনাত তাওবা করা, এবং যেভাবেই হোক অবিলম্বে তার ক্ষতিপূরণ করা কর্তব্য, তা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়৷
তৃতীয়তঃ তাওবা করে বারবার তা ভঙ্গ করা, তাওবাকে খেলার বস্তু বানিয়ে নেয়া এবং যে গোনাহ থেকে তাওবা করা হয়েছে বার বার তা করতে থাকা তাওবা মিথ্যা হওয়ার প্রমাণ কেননা, তাওবার প্রাণ সত্তা হচ্ছে, কৃত গোনাহ সম্পর্কে লজ্জিত হওয়া কিন্তু বার বার তাওবা ভঙ্গ করা প্রমাণ করে যে, তার মধ্যে লজ্জার অনুভূতি নেই৷
চতুর্থতঃ যে ব্যক্তি সরল মনে তাওবা করে পুনরায় গোনাহ না করার সংকল্প করেছে মানবিক দুর্বলতার কারণে যদি পুনরায় তার দ্বারা সেই গোনাহর পুনরাবৃত্তি ঘটে তাহলে ক্ষেত্রে পূর্বের গোনাহ পুনরুজ্জীবিত হবে না তবে পরবর্তী গোনাহের জন্য তার পুনরায় তাওবা করা উচিত৷
পঞ্চমতঃ যখনই গোনাহর কথা মনে পড়বে তখনই নতুন করে তাওবা করা আবশ্যক নয়৷ কিন্তু তার প্রবৃত্তি যদি পূর্বের পাপময় জীবনের স্মৃতিচারণ করে আনন্দ পায় তাহলে গোনাহের স্মৃতিচারণ তাকে আনন্দ দেয়ার পরিবর্তে লজ্জাবোধ সৃষ্টির কারণ না হওয়া পর্যন্ত তার বার বার তাওবা করা উচিত৷ কারণ, যে ব্যক্তি সত্যিই আল্লাহর ভয়ে গোনাহ থেকে তাওবা করেছে সে অতীতে আল্লাহর নাফরমানী করেছে এই চিন্তা করে কখনো আনন্দ অনুভব করতে পারে না; তা থেকে মজা পাওয়া আনন্দ অনুভব করা প্রমাণ করে যে, তার মনে আল্লাহর ভয় তার মনে গভীরভাবে শেকড় গাড়তে পারেনি৷