Friday, July 10, 2020

রোগ-ব্যাধিতে পাপ হয়

সুস্থতা অসুস্থতা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। সুস্থতায় শোকর আর অসুস্থতায় ধৈর্য এ দুটিকে আল্লাহর নিয়ামতে পরিণত করে। এগুলো মানবজীবনের অনুষঙ্গ। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীদেরও কখনো কখনো রোগ-ব্যাধি দিয়েছেন। তাই কেউ অসুস্থ হলেই এই কথা ভাবা যাবে না যে, এটি তার পাপের ফসল। আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-ও মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়েছেন।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চেয়ে বেশি রোগ যন্ত্রণা ভোগকারী অন্য কাকেও দেখিনি। (বুখারি, হাদিস: ৫৬৪৬)
রোগ-ব্যাধির মাধ্যমে মহান আল্লাহ বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। শুধু রোগ-ব্যাধি কেন মুমিনের যেকোনো দুঃখ-কষ্টের বিনিময়ে মহান আল্লাহ তাকে পাপমুক্ত করেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, মুসলিম ব্যক্তির ওপর যে কষ্ট ক্লেশ, রোগ-ব্যাধি, উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা, দুশ্চিন্তা, কষ্ট ও পেরেশানি আসে, এমনকি যে কাঁটা তার দেহে ফোটে, এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন। (বুখারি, হাদিস: ৫৬৪১)
তবে শর্ত হলো, বিপদে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা: বাকারা, আয়াত: ১৫৫)
আল্লাহ তাআলার এই পরীক্ষার পরিধি হয় মানুষের ঈমানের ওপর ভিত্তি করে। মহান আল্লাহ কখনো কখনো কঠিন বিপদ দিয়েও পরীক্ষা করেন। যার ঈমান যত বেশি তার পরীক্ষাও তত বড় হয়। রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ যে ব্যক্তির কল্যাণ কামনা করেন তাকে তিনি দুঃখকষ্টে পতিত করেন। (বুখারি, হাদিস: ৫৬৪৫)
এই দুঃখ-কষ্টে যারা আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রেখে ধৈর্যধারণ করে, আল্লাহ তাদের সওয়াবও বাড়িয়ে দেন। আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলাম। তখন তিনি জ্বরে ভুগছিলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি তো ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত। তিনি বললেন, হ্যাঁ। তোমাদের দু’ব্যক্তি যতটুকু জ্বরে আক্রান্ত হয়, আমি একাই ততটুকু জ্বরে আক্রান্ত হই। আমি বললাম, এটি এ জন্য যে, আপনার জন্য দ্বিগুণ সওয়াব। তিনি বললেন, হ্যাঁ তাই। কেননা যেকোনো মুসলিম দুঃখ-কষ্টে পতিত হয়, তা একটা কাঁটা কিংবা আরো ক্ষুদ্র কিছু হোক না কেন, এর মাধ্যমে আল্লাহ তার গুনাহগুলোকে মুছে দেন, যেমন গাছ থেকে তার পাতাগুলো ঝরে পড়ে। (বুখারি, হাদিস: ৫৬৪৮)
তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত দুঃখ-কষ্ট ও রোগ-ব্যাধিতে হতাশ না হয়ে মহান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখা। তাঁর কাছে সাহায্য চাওয়া। নিশ্চয়ই তিনি যা করেন, আমাদের কল্যাণের জন্যই করেন। আমরা যেহেতু দুর্বল বান্দা, পরীক্ষা দেওয়ার শক্তি রাখি না, তাই আমাদের উচিত মহান আল্লাহর কাছে সুস্থতার নিয়ামতের দোয়া করা। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুস্থ রাখুন।

মানসিক শক্তি ও দৃঢ় মনোবল রোগ প্রতিরোধে বিশেষ সহায়ক

আল্লাহ তাআলা সবকিছুর স্রষ্টা ও নিয়ন্তা। তিনিই জীবন ও মৃত্যুর মালিক। তাঁর বিধান অনুসরণই আমাদের সুরক্ষার পথ। বিপদ–আপদ ও বালামসিবত উত্তরণে ইসলামে বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ৪৫)। প্রিয় নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘নামাজ বেহেশতের চাবি, পবিত্রতা নামাজের চাবি।’ (মুসনাদে আহমাদ)। 

যথানিয়মে অজু করা শারীরিক ও মানসিক পবিত্রতা এবং পরিষ্কার–পচ্ছিন্নতার জন্য অতি জরুরি ও বিশেষ উপকারী। পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের জন্য নতুন অজু করা সুন্নাত। এ ছাড়া সব নফল নামাজের জন্যও অজু করা সুন্নাত। খাবার গ্রহণের আগে অজু করা সুন্নাত। অজু করে ঘুমানোও একটি সুন্নাত। ঘুম থেকে উঠে অজু করাও সুন্নাত। মলমূত্রত্যাগের পরও অজু করা সুন্নাত। সর্বদা অজু করা অবস্থায় থাকা সুন্নাত আমল। হাদিস শরিফে আছে, ‘অজু মুমিনের অস্ত্র।’ (বায়হাকি)। 

অজুর অসাধারণ সুন্নাতটি নিয়মিত আমল করলে দৈনিক ১৫ থেকে ২০ বার অজু করার মাধ্যমে হাত–পা ধোয়া হয়। এতে একদিকে সুন্নাত আমলের সওয়াব পাওয়া যায়, অন্যদিকে রোগব্যাধির ঝুঁকি থেকেও মুক্ত থাকা যায়। আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদে বলেন, ‘তাদের মাঝে রয়েছে এমন বান্দা, যারা পবিত্রতাকে পছন্দ করে আর আল্লাহ তাআলা পবিত্রদিগকে ভালোবাসেন।’ (সুরা-৯ তাওবাহ, আয়াত: ১০৮)। 

পোশাকের বিষয়ে সচেতনতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাকের উপকারিতা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তোমাদের সম্ভ্রম নিবারণ ও বেশভূষার জন্য তোমাদিগকে পরিচ্ছদ দিয়েছি এবং সাবধানতার পরিচ্ছদই সর্বোতকৃষ্ট। ইহা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।’ (সুরা-৭ আরাফ, আয়াত: ২৬)। বিশেষ অবস্থায় বিশেষ সুরক্ষার জন্য বিশেষ ধরনের পোশাকের নির্দেশনাও রয়েছে আল–কোরআনে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আমি তাঁকে (দাউদ আ.) তোমাদের জন্য বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম, যাতে তা তোমাদের যুদ্ধে সুরক্ষা দেয়, সুতরাং তোমরা কি কৃতজ্ঞ হবে না?’ (সুরা-২১ আম্বিয়া, আয়াত: ৮০)। 

 

মসজিদে যাওয়ার সময় পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন পোশাক পরার বিশেষ নির্দেশ রয়েছে কোরআন হাকিমে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রত্যেক সালাতের সময় তোমরা পরিচ্ছন্ন পরিচ্ছদ পরিধান করবে, পানাহার করবে কিন্তু অপচয় করবে না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীকে পছন্দ করেন না। বলো, “আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসব সুন্দর জিনিস ও পবিত্র জীবিকা সৃজন করেছেন, কে তা হারাম করেছে?”’ (সুরা-৭ আরাফ, আয়াত: ৩১-৩২)।

পোশাক পবিত্র রাখার নির্দেশ সরাসরি কোরআন মাজিদেই রয়েছে। আল্লাহ তাআলা প্রিয় নবীজি (সা.)–কে লক্ষ করে বলেন, ‘তুমি তোমার পরিচ্ছদ পবিত্র রাখো, অপবিত্রতা পরিহার করে চলো।’ (সুরা-৭৪ মুদ্দাচ্ছির, আয়াত: ৪-৫)। নবী করিম (সা.) সব সময় পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন পোশাক পরতেন। তিনি বিশেষ বস্তুকে বিশেষ পদ্ধতিতে পরিষ্কার করতেন। তাঁর একখানা চামড়ার দস্তরখান ছিল, তা তিনি মাঝেমধ্যে আগুনে সেঁকে পরিষ্কার করতেন। (তিরমিজি ও মুসলিম)। তিনি জুতা ও মোজা পরিধানের পূর্বে ও খোলার পরে ঝেড়েমুছে পরিষ্কার করতেন। বিশেষ বিশেষ সময়ে তিনি বিশেষ বিশেষ পোশাক পরতেন এবং পোশাকে বিশেষ বিশেষ অনুষঙ্গ যুক্ত করতেন। যেমন তিনি সব সময় ছোট পাগড়ি পরতেন, জুমার দিনে মাঝারি পাগড়ি পরতেন এবং ঈদে ও বিশেষ দিনে বড় পাগড়ি পরতেন। মসজিদে গমন ও জুমার জন্য তিনি বিশেষ পোশাকের নির্দেশনাও দিয়েছেন, ‘তোমরা জুমার জন্য ও মসজিদের জন্য দুটি কাপড় আলাদা করে রাখো।’ (বায়হাকি)।

শোবার ঘর পরিপাটি ও বিছানা–ছাদর ইত্যাদি ধুয়ে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন রাখা সুন্নাত। প্রতিবার শোয়ার আগে বিছানা–চাদর ইত্যাদি ঝেড়ে পরিপাটি করা সুন্নাত। ঘরের প্রতিটি কক্ষ ও প্রতিটি কোণ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন মহানবী (সা.)। এমনকি ঘরের আঙ্গিনা ও বাড়ির আশপাশও পরিষ্কার রাখতে বলেছেন মহানবী (সা.)। 

রোগ প্রতিরোধে মানসিক শক্তি ও দৃঢ় মনোবল বিশেষ সহায়ক। আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ও সুন্নাত আমলের মাধ্যমেই তা অর্জন করা সম্ভব। 

সত প্রতিবেশী

মানব সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো প্রতিবেশী। জিবরাঈল (আ.) আমাদের প্রিয় নবী (সা.)-কে প্রতিবেশীর ব্যাপারে সর্বদা এত বেশি অসিয়ত করেছেন যে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমার ধারণা হয়, শিগগিরই তিনি প্রতিবেশীকে ওয়ারিশ (উত্তরাধিকার) করে দেবেন।’ (বুখারি, হাদিস: ৬০১৪)
ইসলামে প্রতিবেশীর হককে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন সত প্রতিবেশীকে দেওয়া হয়েছে বিশেষ মর্যাদা। রাসুল (সা.) বলেন, ‘একজন মুসলমানের জন্য প্রশস্ত বাসভবন, সত প্রতিবেশী ও আরামদায়ক বাহন সৌভাগ্যের নিদর্শন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৪০৩২, আদবুল মুফরাদ, হাদিস: ১১৫)
অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলার কাছে সঙ্গীদের মাঝে উত্তম সঙ্গী হলো সেই ধরনের ব্যক্তি যে তার নিজ সঙ্গীর কাছে উত্তম। আল্লাহ তাআলার দৃষ্টিতে প্রতিবেশীদের মাঝে উত্তম হলো সেই ধরনের প্রতিবেশী যে তার নিজের প্রতিবেশীর কাছে উত্তম। (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৪৪)
অতএব প্রতিবেশীর সঙ্গে কখনোই রূঢ় আচরণ করা যাবে না। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে ভ্রাতৃত্বের, ভালোবাসার। অথচ আজকাল শহুরে মানুষরা তো প্রতিবেশীকে চেনেও না। গ্রাম-গঞ্জের মানুষ প্রতিবেশীর খোঁজখবর রাখলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সামান্য বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে বছরের পর বছর। অথচ সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের অমুসলিম প্রতিবেশীর সঙ্গেও নম্র ব্যবহার করতেন। তাঁদের ঘরে মাঝে মাঝে উপহার পাঠাতেন। মুজাহিদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.)-এর জন্য তাঁর পরিবারে একটি ছাগল জবেহ করা হলো। তিনি এসে বলেন, তোমরা কি আমাদের ইহুদি প্রতিবেশীকে (গোশত) উপহার পাঠিয়েছ? আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, প্রতিবেশীর অধিকার প্রসঙ্গে জিবরাঈল (আ.) আমাকে অবিরত উপদেশ দিতে থাকেন। এমনকি আমার ধারণা হলো যে, হয়তো শিগগিরই প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেবে। (বুখারি, হাদিস: ১৯৪৩)
তাই দুই এক ইঞ্চি জমিজমা, পানি নিষ্কাশন কিংবা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে তাদের সঙ্গে শত্রুতা না রেখে আলোচনার মাধ্যমে সেগুলো মীমাংসা করে নিতে হবে। কারণ আমরা যেসব জিনিস নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে শত্রুতা করি, জুলুম অত্যাচার করি, সেই জিনিসগুলো কিন্তু দুনিয়াতেই থেকে যাবে। কিন্তু আমাদের সবাইকে আল্লাহর সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। এবং হিসাব দিতে হবে।
মানুষের হক আল্লাহ কখনো মাফ করে দেন না। ফলে এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়গুলো যেন আমাদের সারা জীবনের নেক আমলগুলোকে ধ্বংস করে না দেয়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলা হলো ইয়া রাসুলুল্লাহ! অমুক নারী সারা রাত নামাজ পড়ে, সারা দিন রোজা রাখে, ভালো কাজ করে, দান-খয়রাত করে এবং নিজ প্রতিবেশীদের মুখের কথায় কষ্ট দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, সে জাহান্নামি। পুনরায় সাহাবিরা বলেন, অমুক নারী ফরজ নামাজ পড়ে, বস্ত্র দান করে এবং কাউকে কষ্ট দেয় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, সে জান্নাতি। (আদবুল মুফরাদ, হাদিস: ১১৮)
উপরোক্ত হাদিসে উল্লিখিত নারীর এত আমল থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়ার কারণে আল্লাহর রাসুল (সা.) তাকে জাহান্নামি ঘোষণা দিয়েছেন। এতে বোঝা যায় প্রতিবেশীর সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা ইসলামে অধিক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমাদের সবার উচিত এই বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক হওয়া। প্রতিবেশীর প্রতি সদয়  হওয়া।

Friday, July 3, 2020

A reminiscence of my inquisitive mind and reconnaissance on Resilience



একটি টেবিল ক্লথের বিশেষ লেখা ও আমার “নম্রতা” অনুসন্ধানী মন



টেবিল ক্লথের মূল কথা “নম্র যারা, ভদ্র তারা।”
আমার গ্রামের নাম শিকারপুর। বগুড়া সদর উপজেলায় অবস্থিত এটি। গ্রামটি ঐতিহ্যবাহী। গ্রামের অন্যতম একটি ঐতিহ্য হলো আমাদের গ্রামের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে- ফুটবল প্রেমী। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দামী ক্লাবের ফুটবলাররা আমাদের গ্রামের মাঠে খেলেছেন, আমাদের আমোদিত করেছেন। কোন ফুটবল খেলার ফাইন্যালের সময় আশপাশের দু-চার গ্রামে হৈচৈ পড়ে যেতো। বহু মানুষ আসতো শিকারপুরের নাপিতের আড়ার মাঠে ফুটবলের ফাইন্যাল খেলা দেখতে। আমারও নেশার কমতি ছিলনা। আমার বড় ভাই, মেজ ভাই আর আমি তিনজনই গ্রামের চাঁদতারা ক্লাবের খেলোয়াড় ছিলাম। আমি সবসময় ডিফেন্সে খেলতাম। মেজদা আর বড় ভাই সেন্টার ফরওয়ার্ডে। খেলায় আমাদের তিন ভাইয়ের সূনাম ছিল। আর আমরা পন্ডিত পাড়ার ছেলে সেটা আমাদের জন্য ছিল বাড়তি সূনাম। ফাইন্যাল খেলায় চ্যাম্পিয়ন হতো আর যে দল রানার-আপ হতো- তাদেরকে পুরস্কারে ভূষিত করা হতো খেলা শেষের অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠানে আনা হতো একটি বিশেষ ধরনের টেবিল আর একটি সাদা টেবিল ক্লথ যা আসতো আমার আবদুল হামিদ চাচার বাড়ী থেকে আর উনি ছিলেন আব্বার চাচাতো ভাই। আবদুল হামিদ চাচা খেলার শেষ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করতেন। তিনি ছিলেন পন্ডিত মানুষ। চাচার বাড়ী থেকে আনা টেবিল ক্লথটিতে লেখা ছিল, “নম্র যারা, ভদ্র তারা” -আজকের লেখার উপজীব্য
“নম্র যারা, ভদ্র তারা” -কথাগুলো মনের ভেতরে রেখে দিলাম। ৮ম শ্রেণির ছাত্র আমি তখন। খুঁজতে থাকলাম এতে কী বলা হলো আর বাস্তব জীবনে এর মূল্যই বা কী? বলা বহুল্য, আবদুল হামিদ চাচাকে কখনোই জিজ্ঞেস করা হয়নি একথাগুলোর মানে কি। চাচাতো বোনদের কেউ একজন সূঁই-সুতোর ফোঁড় দিয়ে দিয়ে কথাগুলো লিখেছিল তাদেরকেও জিজ্ঞেস করা হয়নি। কিন্তু আমার অনুসন্ধানী মন থেমে থাকেনি।
অনেকদিন পর “নম্র যারা, ভদ্র তারা” এ কথাগুলোর খোঁজে নামলাম।

নম্রতা কি?
১. নম্রতা একটি মানবীয় গুণ। নম্রতা—এমন এক গুণ যা শান্তি বাড়ায়
২. নম্রতা এক দৃঢ়তা
৩. নম্রতা উত্তম চরিত্রের ভূষণ
৪. মানুষের জীবনে যত উত্তম গুণাবলী রয়েছে তার মধ্যে উত্তম গুণ হলো- বিনয় ও নম্রতা।
৫. বিনয় ও নম্রতা উত্তম চরিত্রের ভূষণ।
৬. আল্লাহ স্বয়ং নম্র, তাই তিনি নম্রতাকে ভালোবাসেন।
৭. বিনয় ও নম্রতা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ
৮. মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত। বহুধা গুণের সমন্বয়ে মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। তন্মধ্যে বিনয় ও নম্রতার হার সিংহভাগ।
৯. মানুষের অন্যতম সুকুমার ভূষণ হলো-বিনয় ও নম্রতা।
১০. ব্যক্তিজীবনে যে যতো বিনয়ী ও নম্র, সে তত বেশি সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।
১১. বিনয়গুণ দিয়ে অন্যের চোখে বপন করা যায় ভালোবাসার বীজ। 
১২. বিনয় ও নম্রতা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা ও ইহ-পারলৌকিক মুক্তির মহৌষধ।
১৩. মন্দকে প্রতিহত করতে হয় বিনয় ও নম্রতা দ্বারা
১৪. বিনয় ও নম্রতা মানুষকে উচ্চাসনে সমাসীন ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত করতে সহায়তা করে।
১৫. নম্রতা মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানিয়ে দেয় নম্রতার গুরুত্বপূর্ণ পথ অবলম্বন করা ছাড়া মানুষ তার অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছতে সক্ষম হয়না। 
১৬. ‘যাকে নম্রতার কিছু অংশ প্রদান করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখেরাতের বিরাট কল্যাণের অংশ প্রদান করা হয়েছে। আর যাকে সেই নম্রতা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তাকে দুনিয়া ও আখেরাতের বিরাট কল্যাণ হ’তে বঞ্চিত করা হয়েছে’। [তিরমিযী হা/২০১৩; মিশকাত হা/৫০৭৬]
১৭. বিনয়ীকে মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। যে যত বেশী বিনয়ী ও নম্র হয় সে তত বেশী উন্নতি লাভ করতে পারে।
১৮. নম্র মানুষ সরল ও ভদ্র হয়।
১৯. INNA AKRAMAKUM 'INDAL LAAHI ATQAAKUM
তোমাদের মধ্যে যে অধিক পরহেজগার সে-ই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদার অধিকারী৷ - সূরা আল হুজুরাত, ১৩ আয়াতাংশ
২০. বিনয়ং বশীকৃতং ভবেত -বিনয় দিয়ে জগত বশীভুত করা যায়।
২১. "আমার মধ্যে আরেকটু বিনয় থাকলেই আমি বিশুদ্ধ হয়ে যেতাম।"      - টেড টার্নার (মার্কিন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব)
২২. "বিনয়ের অধিষ্ঠান সৌন্দর্যের বেদীতে।" - ডেমাডেস (এথেনীয় বক্তা)
২৩. আল্লাহ কর্তৃক বিনয়ীদের প্রশংসা:
‘দয়াময় আল্লাহর বান্দা তো তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে তখন তারা বলে ‘সালাম’। আর যারা রাত্রি অতিবাহিত করে পালনকর্তার উদ্দেশ্যে সিজদাবনত থেকে ও দন্ডায়মান হয়ে এবং যারা বলে, হে আমার প্রতিপালক! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি বিদূরিত কর, নিশ্চয়ই এর শাস্তি নিশ্চিত বিনাশ। নিশ্চয়ই তা অবস্থান ও আবাসস্থল হিসাবে অত্যন্ত নিকৃষ্ট’ (ফুরক্বান ২৫/৬৩-৬৬)।
২৪. ‘মুমিন ব্যক্তি নম্র ও ভদ্র হয়। পক্ষান্তরে অভদ্র মানুষ ধূর্ত ও চরিত্রহীন হয়’। [তিরমিযী হা/১৯৬৪; মিশকাত হা/৫০৮৫।]

নম্রতা, বিনয় বা সহনশীলতার ইংরেজী হলো রিজিলিয়্যান্স। এর সংজ্ঞা টানতে গিয়ে Mayo Clinic-এর ব্যবস্থাপন পরিচালক মি. অমিত সূধ বলেছেন Resilience is “the core strength you use to lift the load of life.” মানে হলো জীবনের ভার বইবার জন্য মানুষ তার যে মূল শক্তিকে ব্যবহার করে সেটাই রিজিলিয়েন্স বা নম্রতা।
রিজিলিয়েন্স বা নম্রতার জন্য মানুষের ৭টি ‘C’র বিশেষ দরকারঃ
·         1. Competence: যে কোন বিরূপ অবস্থার ধকল সামলানোর সক্ষমতা
·         2. Confidence: আত্ম-বিশ্বfস ছাড়া রিজিলিয়েন্স বা নম্রতার সন্ধান মিলবে না
·         3. Connection: রিজিলিয়েন্স বা নম্রতার খোঁজ পেতে হলে পারিবারিক কানেকশান খুবই দরকারী অনুসঙ্গ
·         4. Character: রিজিলিয়েন্স বা নম্রতার কাছে যেতে হলে চরিত্র অবশ্যই উন্নত হতে হবে
·         5. Contribution: রিজিলিয়েন্স বা নম্রতার কাছে যেতে হলে সমাজে মানুষের অবদান রাখতে হবেই
·         6. Coping: রিজিলিয়্যান্স বা নম্রতার কাছে যেতে হলে বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হবে
·         7. Control: রিজিলিয়েন্স বা নম্রতার কাছে যেতে হলে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রন চাই
রেফারেন্স: Ken Ginsburg, MD, Pediatrician, Children’s Hospital of Philadelphia, USA.

প্রকৃতিতে “নম্রতা” মিলবে?
প্রাণিবিজ্ঞানী হিসেবে আমাকে প্রকৃতির সাথে থাকতেই হয়েছে বা হচ্ছে এখনো। গ্রাম-বাংলার ছেলে হিসেবে তো বটেই। সু-স্নাতক শ্রেণিতে পড়ার সময় আমি প্রকৃতি বিজ্ঞানী আগাসীজের কথা পড়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, “প্রকৃতি থেকে শেখো, প্রস্তক থেকে নয়।” এ কথাগুলো সামনে রেখে ১৯৭৬এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কক্সবাজার ভ্রমণের সময় আমরা একটা ব্যানার তৈরী করেছিলাম।
খুঁজতে খুঁজতে এক সময় মিলেই গেলো যে প্রকৃতিতে নম্রতা রয়েছে। জীব জগতের সব জীবই নম্র ও সহনশীল এমনকি হিংস্র প্রাণীটিও। বহু হিংস্র পশু মানুষের পোষ মেনেছে এগুলো আমরা প্রায়ই বিভিন্ন ভিডিওতে দেখি। বৃক্ষ লতাদির ভেতরেও অনেক সহনশীলতা রয়েছে। তবে দৃশ্যমান সহনশীলতা রয়েছে ঘাসের মধ্যে। একথা শুনতে একটু অবাক লাগে বৈকি। হ্যাঁ। আমি বাঁশের কথা বলছি। সেটাই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ঘাস। বৃক্ষ লতাদির মধ্যে একমাত্র বাঁশই সবচেয়ে বেশী নম্র বা সহনশীল বা রিজিলিয়েন্ট।
কবিতায় পড়েছি-
“লাঠি হোক কাঠি হোক
হয় হোক বাঁশী
দাদা কন জেনো ঠিক-
বাঁশ তবু ঘাসই।”

অথবা
“বংশে যদি বংশী শুধু বাজে
বংশ তবে ধ্বংস হবে লাজে;
বংশ নিঃস নহে বিশ্ব মাঝে-
যেহেতু তা লাগে সবার কাজে।”

“যেহেতু তা লাগে সবার কাজে” একথাগুলো মনের ভেতরে নিয়ে গাঁয়ের বাড়ীতে গিয়ে দাদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে আমাদের বাড়ীর উত্তর-পশ্চিম কোণে ৪টি বড় বড় বাঁশ ঝাড় কেন? গ্রামের ভাষায় “বাঁশের থোপ” দেখিয়ে দাদা বলেছিলেন আমাদের মুনশী সাহেবের প্রশ্নটা যেন কেমন? দাদা আমাকে মুনশী সাহেব বলতেন। কারণ, আমার নানা ছিলেন শিক্ষক আর মসজিদে ঈমামতি করতেন সেই সুবাদে দাদা মুনশী ডাকতেন আমাকে। বোধ করি তিনি আমার নানার ছায়া আমার ভেতর ঠাহর করতে পেরেছিলেন। তো দাদা বল্লেন আমাদের এই গাঁয়ের সব পাড়াতেই তুই দেখবি উত্তর-পশ্চিম কোণে “বাঁশের থোপ”। এর বিশেষ কারণটা হলো প্রবল বেগে ঝড় হলে এই বাঁশগুলো বুক পেতে দিয়ে আমাদের ৫০ বা কোন কোন সময় ১০০ বছরের পুরোনো মাটির বাড়ীগুলোকে রক্ষা করে। কালবোশেখী বা নরওয়েস্টার যখন আসে তখন সেটা উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকেই আসে। আর ঝড় যখন কালবোশেখী বাঁশ ঝাড়ে ঢোকে তখনই ঝড়ের বেগ হঠাত করেই স্তিমিত হয়ে যায় বাঁশের বিভিন্ন অবস্থানের কারণে। বাঁশেরা কেউ নুইয়ে থাকে, কেউ আকারে ছোট, কেউ ডান কাত হয়ে থাকে কেউ বাম কাতে, কেউবা সোঝা -আর কঞ্চির খেলাতো আছেই। আমি হুঁ করে বল্লাম- বুঝলাম দাদা। আবার দ্যাখ, ৫০-৬০ মাইল বেগে ঝড় হলে ওরা নুইয়ে পড়ে। যেন ঝড়ের সাথে ওদের অনেক দিনের খেলার সখ্যতা। আসলে কিন্তু বাঁশেরা ঝড়কে ঠেকিয়ে দিচ্ছে। আমি বুঝলাম দাদা জ্ঞানের ভারী ভারী কথাগুলো বলছে সেই সাথে প্রাকৃতিক বাঁশের নমনীয়তা বা রিজিলিয়েন্স নিয়ে।
আমরা প্রকৃতির কাছে কতটা ঋণী তা এই বাঁশের কাছে শিখলাম দাদার মাধ্যমে। আর বাঁশ আমাকে শেখালো নমনীয়তা। আল্লাহু আকবার।
দাদার কথা শুনে আমার রেড স্যু মূভমেন্ট নামক লীডারশীপ কোম্পানীর সিইও মিসেস ম্যারিয়েলা দাব্বার কথা মনে হয়েছিল। তিনি বলেছেন, “প্রতিকূলতার প্রচন্ড কালবোশেখীর তোড়ে উড়ে না গিয়ে দৃঢ়তার সাথে উঠে দাঁড়াও। এটা হবে তোমার নমনীয়তার সবচে বড় চিহ্ন।”
কবি নজরুলের ভাষায়, “নাচে ওই কালবোশেখী, কাটাবি কাল বসে কি?”
পজিটিভ সাইকোলজির দুই পন্ডিত মি. কর্ণার ও মি. ডেভিডসন নম্রতা বা সহনশীলতার কতকগুলো স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলোঃ
১. পরিবর্তনকে চ্যালেজ্ঞ হিসেবে নিতে হবে
২. প্রতিজ্ঞা থাকতে হবে
৩. নিয়ন্ত্রনহীন হলে চলবে না
৪. অন্যের সহায়তা লাগবে
৫. অন্যের সহায়তাটা যেন নিরাপদ হয়
৬. ব্যক্তিক বা সামষ্টিক লক্ষ্য থাকবে
৭. স্ব-দক্ষতা
৮. ধকল সামলানোর ক্ষমতা
৯. অতীতের সাফল্য সামনে নিতে হবে
১০. বাস্তব অভিজ্ঞতা
১১. রসবোধ থাকতে হবে
১২. লক্ষ্যভেদী অগ্রযাত্রা দরকার
১৩.ধৈর্য
১৪. নেগেটিভ দিক সামলানোর ক্ষমতা
১৫. অভিযোজন বা মানিয়ে নেয়ার ক্ষমতা
১৬. আশাবাদিতা 
১৭. পরিপূর্ণ বিশ্বাস

নমনীয়তার নিগূঢ় রহস্য: ব্রুস লী’র কথা
নমনীয়তা বিষয়ে ব্রুস লী’র এই কথাগুলো পড়ে আমি নিজে “নমনীয়” কি না তা ভাবনার মধ্যে আনতে চেষ্টা করেও পারিনি।
আল্লাহ আল কুরআনের অনেক জায়গায় পানির উদাহরণ কেন এনেছেন এখন আমার কাছে তা স্পষ্ট হচ্ছে। আর এটাও স্পষ্ট হচ্ছে যে আল্লাহ কেন “ইক্করা” কথাটি আল কুরআনের প্রথমে এনেছেন।
আল্লাহু আকবার

ব্রুস লী’ বলেছেনঃ
তোমার মনটাকে পয়লা খালি করে ফেলো। তুমি নিজেকে “পানির মতো” মনে করো যে তোমার নিজের কোন আকার নেই।
এবারঃ
একটি পেয়ালায় পানি ঢাল। পানিটি একটি পেয়ালা হলো
একটি বোতলে পানি ঢাল। পানিটি একটি বোতল হলো
একটি টি-পটে পানি ঢাল। পানিটি একটি টি-পট হলো
এখন পানি পেয়ালা থেকে, বোতল থেকে বা টি-পট থেকে পানি ঢালা যেতে পারে বা স্থানান্তর করা যেতে পারে অথবা পেয়ালা, বোতল বা টি-পট ভাঙলে পানি বেরিয়ে যেতেও পারে।
তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত পানির মতোঃ
১. আকারবিহীন হওয়া,
২. নমনীয় হওয়া,
৩. সমোচ্চশীলতা বা Equilibrium বজায় রাখা
৪. প্রবাহমান হওয়া

কতটা রিজিলিয়েন্ট বাঁশ? কতটা?
১৯৪৫এ জাপানের হিরোশিমায় পরমাণু বোমা মেরেছিল আমেরিকা। সব পুড়ে ছারখার! মানবেতিহাসের এক জঘন্যতম অধ্যায় ছিল সেটি। পরমাণু বোমার আগুনের দাবদাহ মানুষসহ গাছপালা পুড়ে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল হিরোশিমায়্। কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার!! পোড়েনি একটি বাঁশ ঝাড়!! মাত্র ১ বছর পরে সেই বাঁশ ঝাড়ের রাইজোম বা মূল থেকে নোতুন বাঁশের চারা গজিয়েছিল।
কী অসাধারন রিজিলিয়েন্স বাঁশের!!
কী অসাধারণ উদাহরণ মানুষের জন্য আল্লাহর তরফ থেকে!!
আল্লাহু আকবার।
আল্লাহর কাছে মাথা নত না করে কি পারা যায়?    

Tuesday, June 30, 2020

নমনীয়তার নিগূঢ় রহস্য

নমনীয়তা বিষয়ে Bruce Lee’র এই কথাগুলো পড়ে আমি নিজে “নমনীয়” কি না তা ভাবনার মধ্যে আনতে চেষ্টা করেও পারিনি।
আল্লাহ আল কুরআনের অনেক জায়গায় পানির উদাহরণ কেন এনেছেন এখন আমার কাছে তা স্পষ্ট হচ্ছে। আর এটাও স্পষ্ট হচ্ছে যে আল্লাহ কেন “ইক্করা” কথাটি আল কুরআনের প্রথমে এনেছেন।
আল্লাহু আকবার
Bruce Lee’ বলেছেনঃ
তোমার মনটাকে পয়লা খালি করে ফেলো। তুমি নিজেকে পানির মতো মনে করো যে তোমার নিজের কোন আকার নেই।
এবারঃ
একটি পেয়ালায় পানি ঢাল। পানিটি একটি পেয়ালা হলো
একটি বোতলে পানি ঢাল। পানিটি একটি বোতল হলো
একটি টি-পটে পানি ঢাল। পানিটি একটি টি-পট হলো
এখন পানি পেয়ালা থেকে, বোতল থেকে বা টি-পট থেকে পানি ঢালা যেতে পারে বা স্থানান্তর করা যেতে পারে অথবা পেয়ালা, বোতল বা টি-পট ভাঙলে পানি বেরিয়ে যেতেও পারে।
তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত পানির মতোঃ
১. আকারবিহীন হওয়া,
২. নমনীয় হওয়া,
৩. সমোচ্চশীলতা বা Equilibrium বজায় রাখা
৪. প্রবাহমান হওয়া

আল কুরআনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

১. কুরআন শব্দের অর্থঃ সার্বজনীন অধিক পাঠ্য কিতাব
২. কুরআন কোথায় সংরক্ষিত রয়েছেঃ আল্লাহর কাছে, উম্মুল কিতাবে
৩. কুরআন কিসে সংরক্ষিত রয়েছেঃ লওহে মাহফুজে
৪. কুরঅনের মর্যাদা কি?: কুরআন মহা বিশ্বের মালিক আল্লাহ তা‘য়ালার বানী
৫. কুরআন নাযিল হয়েছে কাদের জন্যঃ সমগ্র মানবজাতির জন্য (২.১৮৫)
৬. কুরআনের মূল বিষয়বস্তু কি?: মানুষ(২.১৮৫, ১৪.১)
৭. কুরআন নাযিলে উদ্দেশ্য কি?: মানুষকে মুক্তির পথ দেখানো
৮. কুরআন নাযিলের পদ্ধতি কি?: অহি
৯. প্রথম নাযিল হওয়া অহি: সূরা ৯৬, আল আলাক্ক, আয়াত ১ থেকে ৫
১.পড়ো (হে নবী), তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন৷
২. জমাট বাঁধা রক্তের দলা থেকে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন৷
৩. পড়ো, এবং তোমার রব বড় মেহেরবান
৪. যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিখিয়েছেন৷
৫. মানুষকে এমন জ্ঞান দিয়েছেন, যা সে জানতো না৷
1. Iqra bismi rab bikal lazee khalaq
2. Khalaqal insaana min 'alaq
3. Iqra wa rab bukal akram
4. Al lazee 'allama bil qalam
5. 'Al lamal insaana ma lam y'alam
১০. নাযিল হওয়া শেষ অহি: সূরা ২, আল বাক্কারাহ, আয়াত ২৮১
যেদিন তোমরা আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে সেদিনের অপমান ও বিপদ থেকে বাঁচো৷ সেখানে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার উপার্জিত সতকর্মের ও অপকর্মের পুরোপুরি প্রতিদান দেয়া হবে এবং কারো ওপর কোন জুলুম করা হবে না ৷
Wattaqoo yawman turja'oona feehi ilal laahi summa tuwaffaa kullu nafsim maa kasabat wa hum laa yuzlamoon.
১১. কুরআন নাযিলের সূচনা কোন মাসে?: রমযান মাসে(২:১৮৫)
১২. কুরআন নাযিলের সূচনা সাল: ৬১০ খৃষ্টাব্দ, অগাষ্ট মাস
১৩. কুরআন নাযিলের সমাপ্তি সাল: ৬৩২ খৃষ্টাব্দ
১৪. কুরআন নাযিলের সূচনা যেখানে: জাবাল আন নূরের হেরা গুহায়
১৫. কুরআনের মূল উপাদান কয়টি: ২টি, ভাষা ও বক্তব্য
১৬. কুরআনের প্রথম শব্দটি কি?: পড়ো
১৭. কুরআনের সূরা সংখ্যা: ১১৪টি
১৮. কুরআনের আয়াত সংখ্যা: ৬২৩৬: ৬ হাজার ২শ ৩৬
১৯. কুরআনের পারা সংখ্যা: ৩০
২০. কুরআনের রুকু সংখ্যা: ৫৪০
২১. কুরআনের সাজদার সংখ্যা: ১৪
২২. কুরআনের ১ম সূরা: আল ফতিহা
২৩. কুরআনের শেষ সূরা: আন নাস
২৪. কুরআনের সবচেয়ে বড় সূরা: আল বাক্করাহ। আয়াত সংখ্যা ২৮৬
২৫. কুরআনের প্রতি মুসলমানদের দায়িত্ব: জানা, মানা এবং মানুষের কাছে পৌছানো
২৬. কুরআনের প্রতি ১ম ঈমান আনেন: পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী, হযরত খাদিজা (রা.)
২৭. কুরআনে আল্লাহ নামটি কতবার এসেছে?: ২৬৯৭: ২ হাজার ৬শ ৯৭ বার
২৮. প্রতি আয়াতে আল্লাহর নাম আছে কোন সূরায়?: সূরা ৫৮: আল মুজাদালায়
২৯. কোরআনে নবী ও রাসুলের নাম এসেছে: ২৫ জনের
১. হযরত আদম (আঃ)
২. হযরত ইদরীস (আঃ)
৩. হযরত নূহ (আঃ)
৪. হযরত হুদ (আঃ)
৫. হযরত ছালেহ (আঃ)
৬. হযরত ইবরাহীম (আঃ)
৭. হযরত লূত (আঃ)
৮. হযরত ইসমাঈল (আঃ)
৯. হযরত ইসহাক্ব (আঃ)
১০. হযরত ইয়াকূব (আঃ)
১১. হযরত ইউসূফ (আঃ)
১২. হযরত শুআইব (আঃ)
১৩. হযরত আইয়্যুব (আঃ)
১৪. হযরত যুল কিফল (আঃ)
১৫. হযরত মূসা (আঃ)
১৬. হযরত হারূন (আঃ)
১৭. হযরত দাউদ (আঃ)
১৮. হযরত সুলাইমান (আঃ)
১৯. হযরত ইল্য়াস (আঃ)
২০. হযরত আল ইয়াসা (আঃ)
২১. হযরত ইউনুস (আঃ)
২২ হযরত যাকারিয়া (আঃ)
২৩. হযরত ইয়াহইয়া (আঃ)
২৪. হযরত ঈসা (আঃ) এবং
২৫. মুহাম্মাদ (সঃ)
৩০. কুরআনে মুহাম্মদ(সা.) এর নাম আছে ৫ বার
৩১. কুরআনে সাহাবীর নাম আছে: ১ জনের(যায়েদ রা.) সূরা আহযাব -এর ৩৭ আয়াতে
হে নবী! স্মরণ করো, যখন আল্লাহ এবং তুমি যার প্রতি অনুগ্রহ করেছিলে তাকে তুমি বলছিলে, তোমার স্ত্রীকে ত্যাগ করো না এবং আল্লাহকে ভয় করো৷ সে সময় তুমি তোমার মনের মধ্যে যে কথা গোপন করছিলে আল্লাহ তা প্রকাশ করতে চাচ্ছিলেন, তুমি লোকভয় করছিলে, অথচ আল্লাহ এর বেশী হকদার যে, তুমি তাকে ভয় করবে৷ তারপর তখন তার ওপর থেকে যায়েদের সকল প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল তখন আমি সেই (তালাকপ্রাপ্তা মহিলার) বিয়ে তোমার সাথে দিয়ে দিলাম, যাতে মুমিনদের জন্য তাদের পালক পুত্রদের স্ত্রীদের ব্যাপারে কোনো প্রকার সংকীর্ণতা না থাকে যখন তাদের ওপর থেকে তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়৷ আর আল্লাহর হুকুম তো কার্যকর হয়েই থাকে৷
Wa iz taqoolu lillazeee an'amal laahu 'alaihi wa an'amta 'alaihi amsik 'alaika zawjaka wattaqil laaha wa tukhfee fee nafsika mal laahu mubdeehi wa takhshan naasa wallaahu ahaqqu an takhshaah; falammaa qadaa ZAIDUM minhaa wataran zawwajnaa kahaa likay laa yakoona 'alal mu'mineena harajun feee azwaaji ad'iyaaa'ihim izaa qadaw minhunna wataraa; wa kaana amrul laahi maf'oolaa
৩২. কুরআনে মহিলার নাম আছে: ১ জনের, মরিয়ম
মরিয়ম হলেন ঈসা (আ.)এর মাতা। কুরআনে উল্লেখিত মহিলাদের মধ্যে একমাত্র তারই নাম উল্লেখ করা আছে। এমনকি তার নামে একটি সূরাও নাযিল হয়েছে। সূরা মারইয়াম ও সূরা ইমরানে তার কথা উল্লেখ রয়েছে। তার পিতা ইমরান। আল্লাহ কুরআনের ৩১ টি আয়াতে তার নাম উল্লেখ করেছেন।
Al Quran: MAS Nasim

একটি ভালো নাম একটি শুভ সূচনা

নাম ব্যক্তি বা বস্তুর চিহ্ন। এটি কোনো কিছুকে চেনা ও পরখ করার উপায়। নাম দ্বারা একজন থেকে অন্যজনকে পৃথক করা যায়। তাই ব্যক্তি ও বস্তুর নাম রাখার ক্ষেত্রে পৃথিবীর সব ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ঐক্য রয়েছে। একটি সুন্দর নাম অনেক ধন-সম্পদের চেয়েও উত্তম।
নাম রাখার ব্যাপারে ইসলাম একটু বেশি সচেতন হওয়ার তাগিদ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুর জন্মের সপ্তম দিন নবজাতকের উত্তম ও সুন্দর অর্থবোধক নাম রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। (তিরমিজি: ২/১১০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কিয়ামতের দিন তোমাদের নিজ নাম ও পিতার নামে ডাকা হবে। সুতরাং তোমরা সুন্দর নাম রাখো।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৩০০)
তবে ইসলামে নাম রাখার কয়েকটি স্তর আছে—
এক. ‘আবদুল্লাহ’ ও ‘আবদুর রহমান’ এ দুটি নাম রাখা সর্বোত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় নাম হলো আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৯৮)
দুই. মহান আল্লাহর উবুদিয়্যাত তথা দাসত্বের অর্থজ্ঞাপক নাম রাখা উত্তম। যেমন—আবদুল আজিজ (আজিজ তথা মহাপরাক্রমশালীর বান্দা), আবদুর রহিম (পরম করুণাময়ের বান্দা), আবদুল মালিক (রাজাধিরাজের বান্দা) ইত্যাদি নামগুলোতে আল্লাহর দাসত্বের অর্থ রয়েছে। এগুলো রাখা উত্তম। তবে বর্তমানে এমন নাম রাখা হলে বেশির ভাগ মানুষ পুরো নাম ব্যবহার করে না। আবদুল আজিজকে আজিজ নামেই ডাকা হয়। এতে অর্থ বিকৃত হয়ে গুনাহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এজাতীয় নাম না রাখাই ভালো। (মা’আরেফুল কোরআন, ভূমিকা দ্রষ্টব্য)
তিন. নবী-রাসুলদের নামে নাম রাখা উত্তম। প্রিয় নবী (সা.)-এর দুটি নাম রয়েছে: মুহাম্মাদ ও আহমাদ। এ ছাড়া অন্য নবীদের নাম রাখা যায়। তবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উপনাম ‘আবুল কাসেম’ অন্যদের জন্য রাখা নিষিদ্ধ। (বুখারি, হাদিস ৫৮৩৩)।
চার. নেককার ও ঈমানদার মনীষীদের নামে নাম রাখা উত্তম। সাহাবি, তাবেইন ও তাবে তাবেইনসহ মুসলিম মনীষীদের নামে নাম রাখা যায়।
পাঁচ. এগুলো ছাড়াও ইসলাম সুন্দর ও অর্থবোধক যেকোনো নাম রাখার অনুমতি দিয়েছে।
ভালো নাম মানে শুভ সূচনা
ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) এক উটনীর দুধ দোহনের জন্য লোকদের জিজ্ঞেস করেন, এ উটনীকে কে দুধ দোহন করবে? এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়াল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার নাম কী? সে বলল, তার নাম হলো মুররাহ। তিনি বলেন, বসো। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করেন, এ উটনীকে কে দুধ দোহন করবে? অন্য এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়াল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কী? সে বলল, তার নাম হারব। তিনি বললেন, বসে পড়ো। অতঃপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ উটনীকে কে দুধ দোহন করবে? এক ব্যক্তি উঠে দাঁড়াল। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, তোমার নাম কী? সে বলল, তার নাম ইয়ায়িশ। তিনি বলেন, ঠিক আছে, তুমিই দুধ দোহন করো। (জামউল ফাওয়ায়েদ)
প্রথম দুই ব্যক্তিকে দুধ দোহনে বাধা দেওয়ার কারণ হলো, প্রথম দুই নামের ভাবার্থ অপছন্দনীয় এবং সর্বশেষ নামের ভাবার্থ পছন্দনীয়। প্রথম নাম মুররাহ। মুররাহ মানে তিতা বস্তু। আর তিতা নিশ্চয়ই সবার পছন্দনীয় নয়। দ্বিতীয় নাম হারব মানে যুদ্ধ। এটা স্বতঃসিদ্ধ কথা যে যুদ্ধ কোনো পছন্দনীয় কাজ নয়। পক্ষান্তরে ইয়ায়িশ শব্দ জীবন্ত থাকার অর্থবোধক। মহানবী (সা.) এ নাম পছন্দ করেছেন। এর মানে হলো, ইসলাম ব্যক্তি বা বস্তুর সুন্দর নাম চায়। ইসলাম মানুষকে আশাবাদী করতে চায়। সেই আশা জেগে ওঠে সূচনাতেই।