উঠে এলো জীবনের না বলা কথা
Friday, March 29, 2024
সীরাত পাঠ, পাঠ-উপলব্ধি একজন মুসলিম স্মার্ট বানাবে
সীরাতকে নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে পড়বেন
রাসূলুল্লাহর ﷺ একজন স্ত্রী অসিয়ত করে যান- তাঁর সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ যেন একজন ইহুদিকে দেয়া হয়!
তিনি ছিলেন রাসূলের এমন একজন স্ত্রী, যিনি মনেপ্রাণে ইসলাম গ্রহণ করলেও তাঁকে সারাজীবন ‘প্রমাণ’ করতে হয় তিনি ইহুদিদের প্রতি লয়্যাল না। অনেকেই আশঙ্কা করতো- না জানি তিনি রাসূলুল্লাহকে ﷺ হত্যা করেন! কেননা, তাঁর বাবা এবং স্বামীকে হত্যা করা হয়েছিলো।
তিনি ‘ইহুদি’ বলে অনেক খোঁটা শুনতে হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ ﷺ সবসময় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন।
ইন্তেকালের আগে তিনি অসিয়ত করেন- তাঁর সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ যেন তাঁর ভাইপোকে দেয়া হয়।
তিনি রেখে যান ১ লক্ষ দিরহাম।
১ লক্ষ দিরহাম সম্পদ কতো বেশি ছিলো, সেটার একটা উদাহরণ হলো- রাসূলুল্লাহর ﷺ সকল স্ত্রীর মোহরানা একত্রিত করলেও ১ লক্ষ দিরহাম হতো না।
উম্মুল মুমিনীন অসিয়ত করে ইন্তেকাল করলেন।
ওদিকে মদীনার সবাই চিন্তায় পড়ে গেলো। উম্মুল মুমিনীনের ভাইপো ইসলাম গ্রহণ করেনি, সে ইহুদি। অথচ সে উম্মুল মুমিনীনের সম্পদের ভাগ পাবে?
কেউ কেউ এমন অসিয়ত পূরণে আপত্তি জানায়।
শেষমেশ পরামর্শ চাওয়া হয় আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে।
তিনি ছিলেন বিচক্ষণ সাহাবী। তিনি সবাইকে বলেন,
“আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন এবং সাফিয়ার অসিয়ত বাস্তবায়ন করুন।”
অর্থাৎ, এই সম্পদের মালিক তিনি। তাঁর পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেনি। কিন্তু, তিনি যেহেতু অসিয়ত করেছেন, সেই অসিয়ত পূরণ করতে হবে।
শেষে উম্মুল মুমিনীনের সম্পদের এক/তৃতীয়াংশ (৩৩,০০০ দিরহাম) প্রদান করা হয় সাফিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহার ভাইপোকে।
সাফিয়া বিনতে হুয়াই রাদিয়াল্লাহু আনহা নিয়ে অনেক ইন্টারেস্টিং ঘটনা আছে।
একদিন নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর স্ত্রী সাফিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহা) -কে নিয়ে বের হলেন। তাঁকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে মূলত তিনি বের হয়েছেন।
নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন ইতিক্বাফে। সাফিয়া (রা:) তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন।
সাফিয়্যাহর (রা:) ঘর ছিলো উসামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) -এর বাড়িতে।
স্ত্রীকে একা একা যেতে দিতে নবিজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মন সায় দিচ্ছিলো না। তিনি বললেন, "তুমি তাড়াহুড়ো করো না। আমি তোমার সাথে যাবো (এগিয়ে দিতে)।"
রাসূল (সা:) ইতিকাফ থেকে উঠে আসছেন স্ত্রীকে আগিয়ে দেয়ার জন্য... মানে স্বামী হিসেবে তিনি কতোটা দায়িত্বশীল ছিলেন...
আর এই যুগে এসে কিছু লোক রাত ১২টায়ও বউকে একা ছেড়ে দিয়ে... নিজেরা গায়ে হাওয়া বাতাস লাগিয়ে শো অফ করে...
রাস্তায় দুজন সাহাবী নবিজীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন মহিলার সাথে দেখতে পেলেন। তারা দুজন হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন।
কিন্তু, নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদেরকে ডাকলেন- "তোমরা এদিকে এসো।"
সাহাবীদ্বয় কাছে আসার পর নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর স্ত্রীকে দেখিয়ে বললেন, "এতো আমার স্ত্রী সাফিয়া বিনতু হুয়ায়্যী।"
সাহাবী দুজন বেশ লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন, "সুবহানাল্লাহ, ইয়া রাসূলাল্লাহ!" অর্থাৎ, তারা বুঝাতে চাইলেন, তারা কি স্বয়ং নবিজীকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিয়ে কোনো মন্দ ধারণা করতে পারেন?
নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,
"শয়তান মানুষের শরীরে রক্তের মতো চলাচল করে। আমি আশংকা করছিলাম যে, সে তোমাদের মনে কোনো সন্দেহ না ঢুকিয়ে দেয়!" [সহীহ বুখারী: ২০৩৮]
সীরাত পাঠ এজন্যই এতো ভালো লাগে। সেই যুগ, যে যুগকে নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) 'শ্রেষ্ঠ যুগ' বলেছেন, সেই প্রজন্ম, যে প্রজন্মের মানুষকে তিনি 'শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম' বলেছেন; সেই প্রজন্মেও তিনি কতোটা স্মার্ট ছিলেন! সুবহানাল্লাহ!
শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের মানুষের মনেও শয়তান সন্দেহ ঢুকিয়ে দিতে পারে। এজন্য নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সন্দেহ দূরীকরণের জন্য নিজে উদ্যোগী হয়ে সংশয় নিরসন করলেন। গুজব বাতাসের চেয়েও দ্রুত বেগে ছড়ায়। নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সন্দেহবশত গুজব ছড়ানোর রাস্তাটি বন্ধ করে দিলেন।
সাফিয়া (রা) ছিলেন খাটো গড়নের। তাই যখন তিনি বাহনে আরোহণ করতেন তখন রাসূল (সা) তাকে ঢেকে দিতেন। তারপর হাঁটু বিছিয়ে দিতেন। সাফিয়া (রা) সে হাঁটুতে পা দিয়ে বাহনে আরোহণ করতেন। প্রত্যেক স্ত্রীই তাঁর কাছে ছিলেন রাণীর মতো। একজন রাণী রাজার কাছ থেকে যতোটা মর্যাদা পায়, তাঁর স্ত্রীরা তার চেয়েও বেশি সম্মান পেতেন।
একবার সব স্ত্রীদের নিয়ে রাসূল (সা) ভ্রমণে বের হলেন। হঠাৎ করেই সাফিয়া (রা) এর উটটি অসুস্থ হয়ে বসে পড়ল। সাফিয়া (রা) এ অবস্থা দেখে কেঁদে ফেললেন। তখন রাসূল (সা) এসে তার চোখের জল নিজ হাত দিয়ে মুছে দিলেন।
আবার, রূপকথায় যেমন ‘অতঃপর রাজা-রাণী একত্রে সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’- এমন দেখা যায়, তাঁর জীবন তেমনও ছিল না। তাঁর স্ত্রীরা কখনো কখনো রাগ করে তাঁর সাথে সারাদিন কথা বলতেন না। তিনি সহ্য করতেন। একবার তিনিই রাগ করে এক মাস তাঁর স্ত্রীদের সাথে দেখা করেননি। কারো কোন আচরণে কষ্ট পেলে কখনোই উগ্রপন্থা অবলম্বন করতেন না। যে স্ত্রীর প্রতি মনোক্ষুন্ন হতেন, তার সাথে কথা বলা কমিয়ে দিতেন। হাসি-ঠাট্টা করা কমিয়ে দিতেন। একসময় সেই স্ত্রীই নিজের ভুল বুঝতে পারতেন। তাঁর কাছে ক্ষমা চাইতেন।
একদিন ঘরে এসে দেখলেন সাফিয়া (রা) কাঁদছেন। কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন, হাফসা (রা), সাফিয়া (রা)-কে ‘ইহুদীর মেয়ে’ বলেছেন। তিনি সাফিয়া (রা) কে সান্তনা দিয়ে বললেন, “তুমি একজন নবীর (হারুনের) কন্যা, একজন নবী (মূসা) তোমার চাচা, আরেকজন নবী তোমার স্বামী। কীভাবে সে (হাফসা) তোমার থেকে উত্তম হয়?”
একজন মানুষকে দূর থেকে দেখলে অসাধারণ মনে হয়। ভুলের উর্ধ্বে মনে হয়। দূরত্ব যত কমে, মানবীয় দূর্বলতা ততো প্রকাশ পায়। কখনো কখনো ভেতরের কদর্য রূপও প্রকাশ পায়, যেটা হয়তো দূর থেকে আমরা চিন্তাও করতে পারি না। এ কারণেই একজন মানুষের ভেতর ও বাহিরের আসল রূপ সবচেয়ে ভালোভাবে জানতে পারে তার জীবনসঙ্গিনী। রাসূল (সা) তাই বলতেন,
“তোমাদের মধ্যে সেই তো সবচেয়ে উত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম। আমি আমার স্ত্রীদের নিকট সবচেয়ে উত্তম।”
রাসূল (সা) ছিলেন স্বামী হিসেবে পৃথিবীর সকল স্বামীর রোল-মডেল। তাঁর স্ত্রীরাই সে কথার সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন। আয়েশা (রা) তাই তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলতেন,
“কেন আমার মতো একজন নারী, আপনার মতো একজন পুরুষকে নিয়ে আত্নসম্মানবোধ করবে না?”
সাফিয়া (রা) নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন,
“আমি আল্লাহর রাসূলের চেয়ে উত্তম আচরণের কোন ব্যক্তিকে দেখিনি।”
কখনোই কোন নারীকে তিনি প্রহার করেননি। মানুষদেরকে স্ত্রীদের প্রতি সদয় হবার নির্দেশ দিতেন। বলতেন,
“নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে পাজরের বাঁকা হাড় থেকে। যদি একেবারে সোজা করতে চাও, তাহলে কিন্তু ভেঙ্গে ফেলবে।”
বিদায় হজ্জের ভাষণে তিনি পুরুষদেরকে নারীদের প্রতি সদাচারণের নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
রাসূল (সা) এর জীবনাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়েই উমার (রা) এর মতো কঠোর স্বভাবের মানুষ পর্যন্ত বলেছিলেন,
“একজন মানুষের উচিত তার স্ত্রীর সাথে শিশুর মতো খেলা করা। আর যখন প্রয়োজন তখন বাইরে আসল পুরুষের মতো আচরণ করা।”
তথ্যসূত্র:
তাবাকাত ইবনে সা'দ: ৮/৯১, ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদ, আসহাবে রাসূলের জীবনকথা: ৮/৩০০।
All reactions:
2ইসলাম সে তো পরশ মানিক
ইসলাম
সে তো পরশ মানিক-
তরে কে পেয়েছে খুঁজি?
পরশে তাহার সোনা হলো যাঁরা তাদেরই মোরা বুঝি।
এক ব্যক্তি সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠেন না। প্রতিদিন দেরী হয়। ব্যাপারটা নিয়ে তার স্ত্রী বিরক্ত! এতো করে বলার পরও কোনো লাভ হয় না। একপর্যায়ে স্ত্রী হাল ছেড়ে দিলেন।
কিছুদিন পর স্ত্রী দেখতে পেলেন তার স্বামী ভোরে ঘুম থেকে উঠা শুরু করেছেন। রাত ৩ টায় ঘুম থেকে উঠে খাবার খান। কী অদ্ভুত? এই রাতে খাবার খেতে হবে কেনো? আবার সারাদিন তিনি কিছু খান না।
স্বামী জানালেন, “আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি। এই মাস রমজান মাস। রমজান মাসে রোজা রাখতে হয়। রোজার নিয়ম এই এই…।”
স্ত্রী একমাস স্বামীকে পর্যবেক্ষণ করলেন। একটা মানুষ হঠাৎ কীভাবে বদলে গেলো তিনি বুঝতে চেষ্টা করলেন। যে মানুষ অফিসে দেরী করে যেতো, দেরী করার কারণে যার স্যালারি কাটা হতো, স্ত্রীর বকা শুনতে হতো, সেই মানুষ বদলে গেলো? কি ভাবে?
একমাস পর ঈদের দিন। মুসলিম হবার পর লোকটির প্রথম ঈদ। ইসলামের সব নিয়মকানুন এখনো তার জানা হয়নি। পরিবার, সমাজে সেই একমাত্র মুসলিম। ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে হয়। কীভাবে করতে হয় তার জানা নেই।
কিছুক্ষণ পর তার স্ত্রী এসে বললো, “আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি!”
কথাটি শুনে তিনি চমকে গেলেন!
“তুমি? কীভাবে? আমি তো তোমাকে জোর করিনি। তুমি হঠাৎ ইসলাম গ্রহণ করলে কেনো?”
স্ত্রী বললো, “যেই ধর্ম আমার স্বামীকে বদলে দিতে পারে, যেই ধর্মের কারণে আমার স্বামী সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারে, আমি সেই ধর্ম গ্রহণ করতে চাই।”
স্ত্রীর কথা শুনে স্বামীর চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়লো। স্ত্রী এগিয়ে এসে কোমল হাতে স্বামীর চোখটা মুছে দিলো।
[গল্পটি কিউবার এক দম্পতির সত্য ঘটনা অবলম্বনে]
All reactions:
4খিদে, no one can deny.
I am first and last to be felt of the living.
Hunger
I come among the peoples like a shadow.
I sit down by each man's side.
None sees me, but they look on one another,
And know that I am there.
My silence is like the silence of the tide
That buries the playground of children;
Like the deepening of frost in the slow night,
When birds are dead in the morning.
Armies trample, invade, destroy,
With guns roaring from earth and air.
I am more terrible than armies,
I am more feared than the cannon.
Kings and chancellors give commands;
I give no command to any;
But I am listened to more than kings
And more than passionate orators.
I unswear words, and undo deeds.
Naked things know me.
I am first and last to be felt of the living.
I am Hunger
by-Robert-Laurence-Binyon
All reactions:
3পৃথিবীতে কিছুই চিরস্থায়ী নয়!
Nothing is permanent. Not the friends you have, not the person you love, not the life you are living. Neither the happiness nor the sadness.
World is cruel. You have to be emotionally strong to survive.
A Break Up is just a break up. Not the end of your life.
Only your life partner can love you without any limitations. Even, your girlfriend or boyfriend would have his/her limitations.
In the end, it's your family that would always be with you. After all friends too have limitations.
There's nothing like right or wrong. It's just a matter of perception.
God exists, in the hearts of his believers.
Being famous or rich doesn't always bring happiness.
You have to fight your own battles. There are no allies. There are no supporters. In the end, you would be the only one left in the battlefield.
ll reactions:
5বদর যুদ্ধ বা ‘ইয়াওমুল ফুরকান’
১৭ রমজান, বদর দিবস !
বদর যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব
ইসলামের ইতিহাসে প্রথম উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ ছিল বদর। দ্বিতীয় হিজরির রমজান মাসে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এটা ছিল মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। মহানবী (সা.) আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বাধীন একটি বাণিজ্য কাফেলাকে আটক করতে চেয়েছিলেন। তিনি তা করতে চেয়েছিলেন হিজরতের পর মক্কার কুরাইশদের নানামুখী ষড়যন্ত্র, মদিনা থেকে মুসলমানদের বের করে দেওয়ার অন্যায় চাপ, মদিনার উপকণ্ঠে এসে লুটতরাজ ইত্যাদি কারণে। কিন্তু আবু সুফিয়ানের কাফেলা রাস্তা পরিবর্তন করে নিরাপদে মক্কায় পৌঁছে যায়। মক্কার মুশরিকরা এটাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে মদিনায় সামরিক অভিযান চালায়। সহস্রাধিক সেনার কুরাইশি বাহিনীর বিরুদ্ধে ৩১৩ সদস্যের মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। কুরাইশের বহু শীর্ষ নেতা নিহত। মুসলিম বাহিনীর ১৪ জন শহীদ হন। বদর যুদ্ধের বিজয় মদিনায় সার্বভৌম ইসলামী রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে। (মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস : ২/৭১)
বদর যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব
বদর যুদ্ধ ছিল ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে মহিমান্বিত যুদ্ধ। স্বয়ং আল্লাহ এই যুদ্ধকে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) নাম দিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে বদর যুদ্ধের বিজয় ইসলামের দাওয়াত, ইসলামের অগ্রযাত্রা ও মুসলিম উম্মাহকে প্রাথমিক স্তর থেকে পরিণত স্তরে উন্নীত করেছিল। এর ফলে ইসলাম প্রচারের প্রাথমিক বাধাগুলো দূর হয়েছিল। বদর যুদ্ধের ফলাফল সংশ্লিষ্ট নানা শ্রেণিকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করেছিল। ঐতিহাসিকরা মনে করেন ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের প্রভাব অব্যাহত থাকবে। ঐতিহাসিকরা বদর যুদ্ধের নিম্নোক্ত প্রভাবগুলো তুলে ধরেন :
১. ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃত অভ্যুদয় : বদর যুদ্ধের পরই প্রকৃতপক্ষে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রকৃত অভ্যুদয় ঘটেছিল। বদর যুদ্ধ সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর ঈমান, আল্লাহর ওপর আস্থা ও সাহসিকতা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। কেননা তাঁরা বদর যুদ্ধে আল্লাহর প্রত্যক্ষ সাহায্য অবলোকন করেছিলেন। আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস তাঁদের কখনো পিছপা হতে দেয়নি, বরং পরিস্থিতি যতই অনুকূল হোক তাঁরা অসীম সাহসের সঙ্গে নিজেকে আল্লাহর রাস্তায় সঁপে দিয়েছেন।
বদর যুদ্ধের পর আরব উপদ্বীপে ইসলামের পরিচিতি, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রভাব-প্রতিপত্তি ছড়িয়ে পড়ে। বদর যুদ্ধের আগে ইসলামকে তারা মক্কার অভ্যন্তরীণ সমস্যা মনে করত। কিন্তু মদিনায় হিজরত এবং বদর যুদ্ধে মক্কার কোরাইশদের শোচনীয় পরাজয় তাদেরকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। এ সময় তাদের অনেকের হৃদয় ইসলামের জন্য প্রশস্ত হয় এবং জ্ঞানীদের সামনে ইসলামী রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ স্পষ্ট হয়ে যায়।
২. মদিনার অভ্যন্তরে প্রভাব : জায়েদ বিন হারেসা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে মদিনায় পাঠানো হয়েছিল। তখন বদর যুদ্ধের ফলাফল মদিনায় আনন্দের ফল্গুধারা বইয়ে দিয়েছিল। ইসলাম ও মহানবী (সা.)-এর ব্যাপারে যারা দ্বিধাগ্রস্ত ছিল তাদের অনেকে দ্বিধামুক্ত হয়। সবাই মহানবী (সা.)-এর জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। নবীজি (সা.) তিন দিন বদর প্রান্তে অবস্থানের পর ফিরে আসেন। বদর যুদ্ধে যাত্রার সময় অনেকেই ভাবেননি সামরিক সংঘাত হবে। তাই তাঁরা অংশগ্রহণের প্রয়োজন বোধ করেননি। কিন্তু যখন যুদ্ধ হলো এবং আল্লাহ ঐতিহাসিক বিজয় দিলেন, তখন তাঁরা মনে মনে লজ্জিত হলো এবং মহানবী (সা.)-এর কাছে এসে নিজেদের অপারগতা প্রকাশ করতে লাগলেন। যেমন উসাইদ বিন হুদাইর (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহর কসম, আমি ধারণা করিনি যে, আপনি শত্রু বাহিনীর মুখোমুখি হবেন। আমি ধারণা করেছি, আপনি বাণিজ্য কাফেলা আটক করবেন। যদি শত্রু বাহিনীর বিষয়টি ধারণা করতাম, তবে আমি পিছিয়ে থাকতাম না। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে সত্যায়ন করলেন। বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে না পারার আক্ষেপ তাঁদেরকে ওহুদ যুদ্ধে বিপুল উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণে অনুপ্রাণিত করেছিল। এ ছাড়া প্রাপ্ত গনিমত ও মুক্তিপণ মুসলমানদের আর্থিকভাবে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছিল।
৩. মক্কার মুশরিকদের ওপর প্রভাব : বদর যুদ্ধের ফলাফল ছিল কুরাইশদের জন্য বজ্রাঘাত ও মরণক্ষতের মতো, যা কুরাইশ নেতাদের মান-সম্মান ও কথিত আভিজাত্যকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছিল। সমগ্র আরব উপদ্বীপে তাদের যে অপ্রতিরোধ্য প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল তার ক্ষয় শুরু হলো। কেননা এর আগে কোনো যুদ্ধে কুরাইশের এত যোদ্ধা নিহত বা বন্দি হয়নি। এমনকি হাইসামান বিন আবদুল্লাহ খুজায়ি প্রথম পরাজয়ের সংবাদ নিয়ে গেলে তারা তা অবিশ্বাস করল এবং দ্বিতীয় সংবাদবাহকের অপেক্ষা করতে লাগল। অতঃপর যখন আবু সুফিয়ান ইবনে হারিস ইবনে আবদুল মুত্তালিব এসে একই সংবাদ দিল, তখন তারা বিশ্বাস করল। বদর যুদ্ধের পরাজয়ের এক সপ্তাহ পর দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে আবু লাহাব মারা যায়। মক্কার এমন কোনো ঘর ছিল না যার ঘরে শোক পৌঁছেনি। এই পরাজয়ের ফলে মক্কাবাসীর জন্য শাম ও ইয়েমেনে বাণিজ্য করা কঠিন হয়ে যায়। কেননা তারা মদিনার উপকণ্ঠ দিয়ে শাম ও ইয়েমেনে যাতায়াত করত। (শারজানি, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যা, পৃষ্ঠা ৫২৪-৫২৯)
৪. মরণ কামড়ের চেষ্টা : বদর যুদ্ধের পর সবচেয়ে গুরুতর ঘটনা ছিল মহানবী (সা.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র। উমায়ের ইবনে ওয়াহাব জুমহি নামের এক নরাধম এই ষড়যন্ত্রের হোতা ছিল। সে মক্কায় মহানবী (সা.)-কে নানাভাবে কষ্ট দিত। বদর যুদ্ধে তার ছেলে ওয়াহাব ইবনে উমায়ের মুসলমানের হাতে বন্দি হয়। এক দিন কাবার হাতিমে বসে সাফওয়ান ইবনে উমাইয়ার সঙ্গে কথা বলছিল। তারা বদরের যুদ্ধে নিহতদের নিয়ে কথা বলছিল। তখন উমায়ের ইবনে ওয়াহাব আক্ষেপ করে বলল, আমি যদি ঋণগ্রস্ত না হতাম এবং পরিবারের জন্য চিন্তা না থাকত, তবে মদিনায় গিয়ে মুহাম্মদকে শেষ করে দিতাম। তখন সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া বলল, আমি তোমার ঋণ ও পরিবারের দায়িত্ব নিলাম।
চুক্তি অনুসারে উমায়ের তার তরবারিতে বিষ মিশিয়ে মদিনায় গেল। ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) কয়েকজন আনসার সাহাবির সাহায্যে তাকে নবীজি (সা.)-এর সামনে উপস্থিত করলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার কাছে মদিনায় আগমনের উদ্দেশ্য জানতে চাইলেন। উমায়ের প্রথমে ছেলেকে মুক্ত করতে এসেছে দাবি করল। কিন্তু যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের ষড়যন্ত্রের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করলেন, তখন সে কালেমা পাঠ করে মুসলমান হয়ে গেল। সে ইসলাম গ্রহণের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) তার ছেলেকেও মুক্ত করে দেন এবং তাকে কুরআন শেখানোর ব্যবস্থা করেন। মক্কায় ফিরে গিয়ে সে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করল এবং বহু মানুষ তার মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করে। (আর রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা ২৪০)
বদর যুদ্ধের প্রভাব সম্পর্কে আল্লামা শিবলি নোমানি (রহ.) চমৎকার লিখেছেন, ‘বদর যুদ্ধের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল প্রবল ও সুদূরপ্রসারী। প্রকৃতপক্ষে এটাই ছিল ইসলামের প্রথম অগ্রযাত্রা। এই যুদ্ধে কুরাইশ গোত্রের নেতৃত্বের স্তম্ভগুলো ভেঙে পড়েছিল। যে দুর্বলতা তারা আর কখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি।’ (মুখতাসার সিরাতুন্নবী, পৃষ্ঠা ৯২)
আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা গ্রহণের তাওফিক দিন। আমিন।
সোর্স: কালের কন্ঠ
: 

All reactions:
2You and Atowar Khanমাতৃভূমির প্রতি নবীজি (সা.)-এর ভালোবাসা
মহানবী (সা.) মাতৃভূমিতে শত অত্যাচার ও অবিচারের শিকার হওয়ার পরও দেশত্যাগের সময় অশ্রু বিসর্জন করেন। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! তুমি (মক্কা) আল্লাহর গোটা জমিনের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং দুনিয়ার সব ভূমির মধ্যে তুমি আমার কাছে সর্বাধিক প্রিয়। আল্লাহর শপথ! তোমার থেকে আমাকে উচ্ছেদ করা না হলে আমি চলে যেতাম না। (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৩১০৮)
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় মহানবী (সা.) যখন গারেসুর থেকে বের হয় মদিনার পথ ধরেন, তখন বারবার অশ্রুসিক্ত হয়ে মক্কার দিকে তাকাচ্ছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হৃদয়ের ব্যাকুলতা দেখে তাঁকে মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করেন। বলেন, ‘নিশ্চয়ই যিনি আপনার জন্য কোরআনকে বিধান করেছেন তিনি আপনাকে অবশ্যই জন্মভূমিতে ফিরিয়ে আনবেন।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ৮৫)
মহানবী (সা.) মক্কার পাহাড়-পর্বত ও প্রকৃতির সঙ্গেও অন্তপ্রাণ ভালোবাসা পোষণ করতেন। তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই আমি মক্কার একটি পাথরকে চিনি, যেটি নবুয়ত লাভের আগেই আমাকে সালাম দিত। আমি সেটাকে এখনো চিনি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২৭৭)
All reactions:
4
Subscribe to:
Posts (Atom)





