কথাটি বেশ গভীর। এর মূল অর্থ হলো—যে ব্যক্তি ন্যায় বা সত্যের পথে চলে, তার কোনো না কোনো প্রতিবাদী বা শত্রু তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। যার কোনো শত্রু নেই, ধরে নেওয়া হয় সে হয়তো অন্যায় দেখেও চুপ থাকে বা সবার সাথে গা বাঁচিয়ে চলে, যা ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তার অভাব নির্দেশ করে।
বিখ্যাত কিছু উক্তি এই ধারণাকে সমর্থন করে:
হুমায়ূন আহমেদ: "মানুষের কষ্ট দেখাও কষ্টের কাজ। আবার মানুষের আনন্দ দেখাও আনন্দের কাজ। যার শত্রু নেই সে মানুষ হিসেবে পূর্ণ নয়।"
ভিক্টর হুগো: তাঁর মতে, শত্রু থাকা মানে হলো আপনি সমাজের কোনো জড়তা বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন।
পল নিউম্যান: "শত্রুহীন মানুষ আসলে ব্যক্তিত্বহীন মানুষ"
"যে মানুষের শত্রু নেই, সে মানুষের গুণ নেই" এর পেছনে থাকা মূল দর্শন ও যুক্তিগুলোঃ
১. ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তার প্রমাণ
একজন নীতিবান মানুষ যখন কোনো সত্য বা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ান, তখন যারা সেই আদর্শের বিরোধী, তারা স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে। যার কোনো শত্রু নেই, মনে করা হয় তিনি হয়তো কখনোই কোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নেননি বা কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করেননি।
২. সুবিধাবাদ বনাম আদর্শবাদ
সবাইকে খুশি করে চলা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় যদি না তিনি নিজের আদর্শের সাথে আপস করেন। তাই কোনো শত্রু না থাকা অনেক সময় নির্দেশ করে যে ব্যক্তিটি হয়তো "গা বাঁচিয়ে চলা" বা "সুবিধাবাদী" প্রকৃতির।
অন্যদিকে, গুণী মানুষের সুনির্দিষ্ট জীবনদর্শন থাকে, যা স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থে আঘাত হানে এবং শত্রু তৈরি করে।
৩. সাফল্যের পথে অন্তরায়
সাফল্য অর্জন করলে ঈর্ষান্বিত মানুষের সংখ্যা বাড়ে। আপনি যদি জীবনে উল্লেখযোগ্য কিছু করেন, তবে সেই পথে আপনার সমালোচক বা প্রতিপক্ষ তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তাই শত্রু থাকা অনেক সময় ব্যক্তির কর্মক্ষমতা ও সাফল্যেরই পরিচয় দেয় ।
সংক্ষেপে, এই প্রবাদটি আমাদের শেখায় যে—নিন্দুক বা শত্রুর ভয়ে নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়া উচিত নয়। বরং ন্যায়ের পথে চলতে গিয়ে যদি শত্রু তৈরি হয়, তবে সেটি আপনার চারিত্রিক সততারই অলংকার।
তবে আধুনিক প্রেক্ষাপটে এর অর্থ এই নয় যে আপনাকে ঝগড়াটে হতে হবে। বরং এর মানে হলো, নিজের আদর্শ ও সততায় অটল থাকলে স্বার্থান্বেষী মহল স্বাভাবিকভাবেই আপনার বিপক্ষে যাবে। তাই শত্রু থাকা অনেক সময় আপনার চারিত্রিক দৃঢ়তারই প্রমাণ দেয়।
নিন্দুকঃ
নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো,
যুগ জনমের বন্ধু আমার আঁধার ঘরের আলো।
সবাই মোরে ছাড়তে পারে বন্ধু যারা আছে,
নিন্দুক সে ছায়ার মতো থাকবে পাছে পাছে।
বিশ্বজনে নিঃস্ব করে পবিত্রতা আনে।
সাধকজনে বিস্তারিতে তার মতো কে জানে?
বিনামূল্যে কয়লা ধুয়ে করে পরিষ্কার।
বিশ্বমাঝে এমন দয়াল মিলবে কোথা আর?
নিন্দুক সে বেঁচে থাকুক বিশ্বহিতের তরে,
আমার আশা পূর্ণ হবে তাহার কৃপা ভরে।
নিন্দুককে সবাই অপছন্দ করলেও সমাজে নিন্দুকের ভূমিকা একেবারে উপেক্ষার নয়। নিন্দুকের নিন্দার ভয়ে মানুষের ও সমাজের অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি দূর হয়। সে হিসেবে নিন্দুকের মতো উপকারী বন্ধু সমাজে বিরল।
"Criticism is the way to correctness"
এটি মূলত বোঝায় যে, গঠনমূলক সমালোচনা কোনো বাধা নয় বরং উন্নতির একটি অপরিহার্য ধাপ।
এই দর্শনের মূল দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
ভুল সংশোধনের আয়না: আমরা নিজের কাজে সবসময় নিখুঁত হতে পারি না। সমালোচকরা আমাদের সেই "ব্লাইন্ড স্পট" বা ভুলগুলো ধরিয়ে দেন যা আমরা নিজেরা দেখতে পাই না।
উইনস্টন চার্চিলের দর্শন: তিনি সমালোচনাকে শরীরের বেদনার সাথে তুলনা করেছেন। যেমন ব্যথা আমাদের বলে দেয় শরীরে কোথাও সমস্যা আছে, সমালোচনাও তেমনি আমাদের কাজের ত্রুটি নির্দেশ করে যেন আমরা তা ঠিক করে নিতে পারি
অ্যারিস্টটলের চিরন্তন সত্য: তিনি বলেছিলেন, সমালোচনা এড়ানোর মাত্র একটি উপায় আছে— "কিছুই করবেন না, কিছুই বলবেন না এবং আপনি নিজেও কিছুই হবেন না"। অর্থাৎ, আপনি যদি বড় কিছু করতে চান, সমালোচনা আসা অনিবার্য এবং এটিই আপনাকে সঠিক পথে নিয়ে যাবে।
সাফল্যের জ্বালানি: বিখ্যাত মনীষী ও সফল ব্যক্তিরা সমালোচনাকে ভয় না পেয়ে বরং একে উন্নতির সিঁড়ি হিসেবে দেখেন। সমালোচনাহীন জীবন স্থবিরতার লক্ষণ।
No comments:
Post a Comment