Monday, December 22, 2025

মৃত্যু সম্পর্কে এমন এক সত্য, যা আপনাকে বিস্মিত করতে পারে!

 মুম্বাইয়ের KEM মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, প্রফেসর ড. লোপা মেহতার অভিজ্ঞতা

মুম্বাইয়ের KEM মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি ডিপার্টমেন্টের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, প্রফেসর ড. লোপা মেহতা, ৭৮ বছর বয়সে নিজের জন্য একটি Living Will তৈরি করেছিলেন। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে লিখে দিয়েছিলেন—যখন আমার শরীর আর সাড়া দেবে না, যখন ফিরে আসার আর কোনো সম্ভাবনা থাকবে না, তখন আমার কোনো চিকিৎসা যেন না করা হয়। না ভেন্টিলেটর, না টিউব, না হাসপাতালে অপ্রয়োজনীয় দৌড়ঝাঁপ। তিনি চেয়েছিলেন, জীবনের শেষ সময়টা যেন শান্তিতে কাটে—চিকিৎসার জেদ নয়, থাকুক বোধবুদ্ধি।
ড. লোপা শুধু এই নথিই লেখেননি, তিনি একটি গবেষণাপত্রও প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে মৃত্যুকে একটি স্বাভাবিক, সময়নির্ধারিত, জৈবিক প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এখান থেকে অনুগ্রহ করে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
তিনি বলেন, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান কখনোই মৃত্যুকে স্বাধীন একটি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেনি। চিকিৎসাবিদ্যা বরাবরই মনে করেছে, মৃত্যু সবসময় কোনো না কোনো রোগের ফল, আর যদি রোগের চিকিৎসা করা যায়, তবে মৃত্যুকে ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু তিনি বলেন—এই ধারণা ভুল। চিকিৎসাবিজ্ঞান পরে এসেছে, শরীরের বিজ্ঞান তারও আগে। আর এই শরীরের বিজ্ঞান চিকিৎসাবিজ্ঞানের চেয়েও অনেক গভীর।
তার যুক্তি হলো—মানবদেহ কোনো চিরকাল চলা যন্ত্র নয়। এটি একটি সীমাবদ্ধ ব্যবস্থা, যার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট জীবনশক্তি সঞ্চিত থাকে। এই শক্তি আমরা কোনো ট্যাংক বা বাহ্যিক উৎস থেকে পাই না, বরং পাই আমাদের সূক্ষ্ম শরীরের মাধ্যমে। এই সূক্ষ্ম শরীর—যাকে আমরা অনুভব করি, কিন্তু চোখে দেখতে পাই না—মন, বুদ্ধি, স্মৃতি ও চেতনা—এসব মিলিয়েই গঠিত।
এই সূক্ষ্ম শরীরই সেই মাধ্যম, যার দ্বারা জীবনশক্তি আসে এবং সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই শক্তির উপরেই নির্ভর করে আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন, হজমশক্তি, এমনকি চিন্তা করার ক্ষমতাও। কিন্তু এই শক্তি অসীম নয়। প্রত্যেক দেহেই এর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ থাকে। ঠিক যেমন কোনো যন্ত্রে নির্দিষ্ট ক্ষমতার ব্যাটারি থাকে—না বেশি, না কম। যতটুকু ঈশ্বর ভরে দিয়েছেন, ততটুকুই চলবে খেলনার মতো।
ড. লোপা লিখেছেন, যখন শরীরে থাকা এই শক্তির শেষ বিন্দুটুকুও ফুরিয়ে যায়, তখন সূক্ষ্ম শরীর আলাদা হয়ে যায়। সেই মুহূর্তেই দেহ স্থির হয়ে যায়, আর আমরা বলি—“প্রাণ চলে গেল।”
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে কোনো রোগ বা কোনো ভুলের সম্পর্ক নেই। এটি শরীরের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ গতি। এই গতি শুরু হয় গর্ভে থাকাকালীনই, আর যখন এই গতি সম্পূর্ণ হয়, তখনই মৃত্যু ঘটে। এই শক্তির ক্ষয় প্রতি মুহূর্তে হতে থাকে। প্রতিটি কোষ, প্রতিটি অঙ্গ, ধীরে ধীরে নিজের নির্ধারিত আয়ু সম্পূর্ণ করে। আর যখন পুরো শরীরের হিসাব শেষ হয়ে যায়, তখন দেহ শান্ত হয়ে যায়।
মৃত্যুর সময় কোনো ঘড়ির কাঁটার হিসাব নয়, এটি একটি জৈবিক সময়—যা প্রত্যেকের জন্য আলাদা। কারো জীবন শেষ হয় ৩৫ বছরে, কারো ৯০ বছরে—তবুও দু’জনেই নিজেদের সম্পূর্ণ জীবনটাই পূর্ণ করেছেন। কেউই অপূর্ণ মরেন না—যদি আমরা তাকে জোর করে থামিয়ে না রাখি বা হার বলে না মেনে নিই।
ড. লোপা আরও লিখেছেন, আধুনিক চিকিৎসা যখন মৃত্যুকে ঠেকানোর জেদ ধরে, তখন সে শুধু রোগীকে নয়—পুরো পরিবারকে ক্লান্ত করে দেয়। আইসিইউ-তে এক মাসের কৃত্রিম শ্বাস কখনো কখনো পরিবারের সারা জীবনের সঞ্চয় শেষ করে দেয়। আত্মীয়রা বলতে থাকেন—“এখনও আশা আছে”, অথচ রোগীর দেহ বহু আগেই বলে দিয়েছে—“এবার যথেষ্ট হয়েছে।”
এই কারণেই তিনি লিখেছিলেন, যখন আমার সময় আসবে, তখন আমাকে শুধু KEM হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে আমার বিশ্বাস, কোনো অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ হবে না। চিকিৎসার নামে আমাকে টেনে রাখা হবে না। আমার শরীরকে যাওয়ার পথে বাধা দেওয়া হবে না—বরং যেতে দেওয়া হবে।
এখন প্রশ্ন হলো—
আমরা কি কেউ নিজের জন্য এমন কিছু ভেবে রেখেছি?
আমাদের পরিবার কি সেই ইচ্ছার সম্মান করবে?
যে ব্যক্তি এই ইচ্ছার সম্মান করবে, সমাজে কি সে সম্মান পাবে?
আমাদের দেশের হাসপাতালগুলোতে কি এখনও এমন ইচ্ছার মর্যাদা দেওয়া হয়?
না কি এখনো প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে বিল আর প্রতিটি মৃত্যুর সঙ্গে অভিযোগ জুড়ে দেওয়া হবে?
সবকিছু এত সহজ নয়। যুক্তি আর আবেগ—এই দু’টির ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভবত মানুষের জীবনের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি।
যদি আমরা মৃত্যুকে একটি নির্ধারিত, শান্ত এবং শরীরের ভেতর থেকেই স্থির হয়ে যাওয়া প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে শুরু করি, তাহলে হয়তো মৃত্যুভয়ও কিছুটা কমবে, আর ডাক্তারের প্রতি আমাদের আশাও হবে একটু বেশি বাস্তবসম্মত।
আমার মনে হয়, মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা বন্ধ করে তার আগেই বেঁচে থাকার প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। আর যখন সে আসবে, তখন শান্তিতে, মর্যাদার সঙ্গে তাকে যেতে দেওয়া উচিত।
বুদ্ধের ভাষায়—মৃত্যু এক ধরনের প্রমোশন।
কিন্তু আমার নিজের এই চিন্তাভাবনা কি ৭০ বছর পেরোনোর পরও থাকবে? আমি নিজেই জানি না।
আপনার কী মত?


No comments:

Post a Comment