বাঁশের মতো নমনীয় থাকার অর্থ হলো পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া, যা বিপদে ভেঙে না পড়ে টিকে থাকতে সাহায্য করে। বাঁশ যেমন ঝড়-তুফানে বেঁকে যায় কিন্তু ভাঙে না এবং পরে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়, তেমনি জীবনের প্রতিকূলতায় ফ্লেক্সিবল বা নমনীয় হওয়া মানসিক শক্তি ও সহনশীলতার প্রতীক। এটি অহংকার ত্যাগ করে বিনয়ী হওয়ার শিক্ষাও দেয়।
সহনশীলতা ও অভিযোজন: বাঁশ তার নলাকার গঠন ও ফাইবার বিন্যাসের কারণে প্রচণ্ড চাপে বেঁকে গিয়েও টিকে থাকে। মানুষের ক্ষেত্রে, এটি কঠিন সময়ে ধৈর্য ধারণ ও নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বোঝায়।
শক্তি ও দৃঢ়তা: নমনীয় হলেও বাঁশ অত্যন্ত শক্তিশালী, কিছু ক্ষেত্রে যা কংক্রিটের চেয়েও বেশি সংকোচন চাপ সহ্য করতে পারে। অর্থাৎ, নম্রতা বা নমনীয়তা মানে দুর্বলতা নয়, বরং তা অভ্যন্তরীণ শক্তির লক্ষণ।
বিনয়: বাঁশ যত লম্বা ও উঁচু হয়, ততই মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ে। জীবনে সফল হওয়ার পর মানুষকে বিনয়ী থাকার শিক্ষা দেয় এই প্রকৃতি।
গভীরে মূল প্রোথিত রাখা: নমনীয় হওয়ার পাশাপাশি নিজের নীতি ও শিকড়ে অবিচল থাকা প্রয়োজন, যেমন বাঁশঝাড়ের মূল মাটির গভীরে থাকে।
সংক্ষেপে, বাঁশের মতো নমনীয় হওয়া মানে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে পরিবর্তন করা, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব ও নীতিতে অটল থাকা।
কে এম রাকিব লিখেছেনঃ
পূর্ব এশিয়ারে বাঁশের সভ্যতাও বলা হইতো। তাদের দৈনন্দিন জীবনে বাঁশের বহুবিধ ব্যবহার আছে- খালি এই কারণে না। বাঁশের আক্ষরিক ও প্রতীকি গুণাগুণ শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলের ধর্ম ও দর্শনে বলা হইছে। এই অঞ্চলে ধর্ম হিসেবে তাওবাদ বেশি প্রচলিত। তাওবাদী ধর্ম ও দর্শনে বাঁশের অনেক গুরুত্ব বর্ণনা করা হইছে, উদযাপিত হইছে।
শিখতে গেলে আমাদেরকে যাবতীয় সংস্কার থেকে প্রথমে মুক্ত করতে হবে। ভরা কাপকে আপনি কিভাবে পূর্ণ করবেন। বাঁশের ফাঁপা অংশটা আমাদেরকে মনে করায়ে দেয় বেশিরভাগ সময় আমরা নিজেরে নিয়াই, নিজেদের ধ্যান-ধারণা নিয়াই আচ্ছন্ন থাকি। নতুন কিছুর জন্যে জায়গা নাই। মানুষ ও প্রকৃতির কাছ থেকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা লাভ করতে চাইলে নতুন ও ভিন্ন বিষয়ের ক্ষেত্রে ওপেন থাকতে হবে। যাবতীয় ধ্যান-ধারণা, কুসংস্কার, সত্যি বিষয়ক অনুমান, অহংকার ও ভীতি থেকে মুক্ত হইলেই আপনি নানারকম সম্ভাবনায় নিজেরে উন্মুক্ত হইলেন৷ গাছের কান্ড যেইখানে ভেতরে সলিড, সেইখানে বাশের ভেতরটা শূণ্য। তাওবাদী দর্শন অনুযায়ী, ভেতরের এই শূন্যতাই বাঁশের দৃঢ়তার উৎস।
নিজের চোখে বাঁশবাগান দেখে থাকলে- মেটাফরিকাল অর্থে না, আক্ষরিক- আপনি অবাক না হয়ে পারবেন না যে হালকা বাতাসেও বাঁশগুলা কেমন নুইয়া যায়, কখনও বা একদম মাটিতেও শুইয়া পড়ে, তারপর আবার প্রতিস্পর্ধী মাথা তুলে দাড়ায়। এই নমনীয়তা তাওবাদী দর্শনে অহংকারহীনতার প্রতীক। বেঁকে যাবেন কিন্তু ভাঙবেন না। নমনীয় হবেন কিন্তু শেকড় থাকবে গভীরে প্রোথিত।
অবাক করা ব্যাপার হইতেছে বাঁশরে শ্রেণিবিন্যস্ত করা হইছে, ঘাসজাতীয় উদ্ভিদের সাথে। অথচ বাঁশ কিন্তু বড়সর গাছের মতো লম্বা আর শক্ত। তাওবাদী দর্শন ও ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা, বিখ্যাত টেক্সট 'তাও তে চিং' এর রচয়িতা দার্শনিক লাও ঝু বলেন, 'আমাদের উচিৎ বাঁশের মতো হওয়া।'
তাওবাদী কবি, চিত্রশিল্পী ও দার্শনিক ঝেং শিয়ে বাঁশের, বাঁঁশবাগানের ছবি আঁকছেন ৮০০'রও বেশি। এই বাঁশ আর বাঁশবাগানরে ঝেং শিয়ে দেখছেন জ্ঞানী ব্যক্তির পারফেক্ট মডেল হিসাবে। পেন আর ইংকে অজস্র বাঁশ আঁকার ফাকে ফাকে তিনি লিখছেন:
পাহাড়ের দিকে মুখ কইরা থাকো,
ভঙ্গুর মাটিতেই শিকড় গজাও
ঝড়-ঝাপটার পরে হয়া ওঠো আরও শক্তিশালী
আর সব দিক থেকে আগত বাতাস থেকে নিজেরে সামলাও।
এই কথাগুলা ঝিং শিয়ে বলছেন বাঁশেরে লক্ষ্য করে, তবে উপদেশটা দিছেন মানুষরেই।
যেহেতু সোনার বাংলায় জন্মাইছেন, জীবনে অনেক রকম বাঁশ- মোটা ও চিকন বাঁশ- আপনারে খাইতে হবে। এই ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশমাত্র নাই। বাঁশ খাওয়া অত্র অঞ্চলে এক অনিবার্য বাস্তবতা। এই কারণেই আমার বাঁশের চার আর্য সত্য প্রস্তাব করা।
লেখার শেষে একটা কথাই বলবো: অন্যেরে বাঁশ দেয়া থেকে বিরত থাকেন, কিন্তু নিজে হয়ে ওঠেন বাঁশের মতো।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায়ঃ
বংশে যদি বংশী শুধু বাজে
বংশ তবে ধংস হবে লাজে
বংশ নিঃস্ব নহে বিশ্ব মাঝে
যেহেতু তা লাগে সবার কাজে।
অথবা
লাঠি হোক কাঠি হোক
হয় হোক বাঁশী
দাদা কন জেনো ঠিক
বাঁশ তবু ঘাসই।
No comments:
Post a Comment